হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:১২ এএম
পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে একটি বিদেশি জাহাজ যখন বাংলাদেশে পণ্য নিয়ে আসে তখন ওই পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে জাহাজটি যেই পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশের আমদানিকারকদের কাছ থেকে আদায় করেন সেই আয়ের ওপর সরকারকে আয়কর দিতে হয় জাহাজ কর্তৃপক্ষকে। ঠিক একইভাবে একটি বিদেশি জাহাজ বাংলাদেশ থেকে কোনো রপ্তানি পণ্য নিয়ে গেলে ওই পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে ওই জাহাজটি যেই পরিমাণ অর্থ আয় করেন, সেটির ওপরও কর দিতে হয় সরকারকে।
অনিবাসী শিপিং ব্যবসা থেকে আয়কর আদায়ে বাংলাদেশে পণ্য নিয়ে আসা বৈদেশিক জাহাজগুলো একটি বড় মাধ্যম হলেও এ খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ আয়কর আদায় হচ্ছে না। দুই বছর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে এ খাত থেকে আয়কর আদায় হয়েছিল ৬১৯ কোটি ৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা, সেখানে গেল অর্থবছর (২০২৪-২৫) এ খাত থেকে আয়কর আদায় হয়েছে ৫৬৭ কোটি ৫৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় গেল বছর এ খাত থেকে আয় কমলেও দেশে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ এবং চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য নিয়ে আসা জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বছর বছর দেশে আমদানি-রপ্তানির পণ্যের পরিমাণ বাড়ছে। বন্দরে পণ্য নিয়ে আসা জাহাজের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দরে জাহাজ হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১০৬টি। আগের অর্থবছর জাহাজ হ্যান্ডলিং হয় ৩ হাজার ৯৭৭টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হ্যান্ডলিং হয়েছে ৪ হাজার ৭৭টি। এটি প্রমাণ করে আগের বছরের তুলনায় গেল অর্থবছর দেশে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট আয়কর কর্মকর্তারা বলছেন, আমদানি-রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ বাড়লেও জাহাজে পণ্য পরিবহন ভাড়া কমে যাওয়ার কারণে আগের তুলনায় এখন এ খাত থেকে আয় কমছে। তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় বাড়ছে বলে তারা জানান। শিপিং ব্যবসার সঙ্গে জড়িতের সঙ্গে কথা বলে জানায়, জাহাজে পণ্য পরিবহন ভাড়া কমে যাওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। তারা জানিয়েছেন, করোনা মহামারির পর জাহাজ ভাড়া কিছুটা কমলেও পরে ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ, লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাকে কেন্দ্র করে গত দুই বছর ধরে জাহাজ ভাড়া বেড়েছে।
আয়কর আইন ২০২৩-এর ২৫৯ ধারা অনুযায়ী, ‘এই আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, যে ক্ষেত্রে কোনো অনিবাসী স্বত্বাধিকারী বা ভাড়াকারী হিসেবে, অতঃপর এই ধারায় প্রিন্সিপাল হিসেবে উল্লিখিত, জাহাজ চলাচলের ব্যবসা পরিচালনা করে, সেক্ষেত্রে এই ধারার বিধানাবলি অনুসারে এইরূপ ব্যবসার জন্য কর আরোপ ও আদায় করা হইবে। এক্ষেত্রে (উপ ধারা-২) কোনো জাহাজ বাংলাদেশের যেকোনো বন্দর ত্যাগের পূর্বে উক্ত জাহাজের মাস্টার নিম্নবর্ণিত তথ্যাদিসহ রিটার্ন প্রস্তুত করিবেন এবং উপকর কমিশনারের নিকট তাহা দাখিল করিবেন। জাহাজটি বন্দরে সর্বশেষ আগমনের পর হইতে জাহাজে আরোহিত যাত্রী, গবাদিপশু, ডাক বা মালামাল পরিবহন বাবদ প্রিন্সিপাল বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বা বাহিরে পরিশোধিত বা প্রদেয় অর্থের পরিমাণ এবং বাংলাদেশের বাহিরে যেকোনো বন্দরে জাহাজে আরোহিত যাত্রী, গবাদিপশু, ডাক বা মালামাল পরিবহন বাবদ প্রিন্সিপাল কর্তৃক বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গৃহীত বা গৃহীত হইবে বলিয়া বিবেচিত, অর্থের পরিমাণ। রিটার্ন প্রাপ্তির পর উপকর কমিশনার উপ-ধারা (২) এ উল্লিখিত অর্থের সমষ্টি নির্ধারণ করিবেন এবং এতদুদ্দেশ্যে তিনি যেইরূপ প্রয়োজন বিবেচনা করিবেন, সেইরূপ বিবরণাদি, হিসাব বা দলিলাদি তলব করিতে পারিবেন এবং উল্লিখিত অর্থের নিরূপিত সমষ্টি প্রিন্সিপাল কর্তৃক উক্ত ব্যবসা হইতে বাংলাদেশে অর্জিত আয় হিসাবে বিবেচিত হইবে যাহা এই আইনের অধীন তাহার ‘ব্যবসা হইতে আয়’ খাতে করযোগ্য হইবে এবং এইরূপ আয়ের ওপর ৮% (আট শতাংশ) হারে কর আরোপিত হইবে।’
আয়কর আইনের এই ধারা অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দরে আসা বৈদেশিক জাহাজ থেকে আয়কর আদায় করে আসছে কর অঞ্চল-২ চট্টগ্রাম। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই খাত থেকে ৬১৯ কোটি ৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা আয়কর আদায় করা হয়। ১৯১ কোটি ১৮ লাখ টাকা কমে এর পরের বছর (২০২৩-২৪ অর্থবছর) এই খাত থেকে আয়কর আদায় করা হয় ৪২৭ কোটি ৮৯ লাখ ৫২ হাজার টাকা। এর গেল অর্থবছর এই খাত থেকে আয় অবারও বেড়েছে। আগের অর্থ বছরের তুলনায় ১৩৯ কোটি ৬৭ লাখ বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাত থেকে আয়কর আদায় হয়েছে ৫৬৭ কোটি ৫৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় গত দুই বছর এই খাত থেকে আয়কর আদায় কমলেও বন্দরের কন্টেইনার এবং কার্গো (খোলা পণ্য) হ্যান্ডলিং তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত তিন অর্থ বছরে ধারাবাহিকভাবে কন্টেইনার এবং কার্গো হ্যান্ডলিং বাড়ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছর কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয় ৩০ লাখ ৭ হাজার ৩৭৫ টিইইউস। ২০২৩-২৪ অর্থবছর কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয় ৩১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৯০ টিইইউস। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৭ একক। একই সময়ে বন্দরে ধারাবাহিকভাবে কার্গো (খোলা পণ্য) হ্যান্ডলিং বাড়ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর কার্গো হ্যান্ডলিং হয় ১১ কোটি ৮২ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪৩ মেট্রিক টন। এরপর আরও বেড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছর কার্গো হ্যান্ডলিং হয় ১২ কোটি ৩২ লাখ ৪২ হাজার ৭৪৮ মেট্রিক টন। সর্বশেষ সদ্য বিদায়ি অর্থবছর কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ কোটি ৭ লাখ ২৪ হাজার ৭৮৩ মেট্রিক টন।
দেশে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধির পরও অনাবাসী শিপিং ব্যবসা থেকে কাঙ্ক্ষিত কর আদায় না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাহাজের ভাড়া বেশি হলে তখন আয় বাড়ে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাহাজ ভাড়া বেশি ছিল, যে কারণে ওই বছর এই খাত থেকে আয় বেড়েছে। সেই অনুযায়ী এখন জাহাজ ভাড়া কম তাই এখন আয় কিছুটা কমছে। কারণ আমরা তো জাহাজ মালিকের আয় যেই পরিমাণ হয়, তার ওপর নির্ধারিত হারে কর আদায় করি। এখন জাহাজ মালিকের আয় কম হলে এই খাত থেকে আমাদেরও কর আদায় কম হয়। তবে খোঁজ নিয়ে পাওয়া যায় ভিন্ন তথ্য। আয়কর আদায়ে কর্মকর্তাদের জাহাজ মাস্টারের দাখিল করা রিটার্নের তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয় বলেই কাঙ্ক্ষিত আয় হচ্ছে না। কারণ অনেক ক্ষেত্রে রিটার্নে আয় কম দেখালে সেটি চ্যালেঞ্জ করার মতো তথ্য আয়কর কর্মকর্তাদের কাছে থাকে না।