প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২১:৫০ পিএম
নগদ অর্থের ব্যবহার কমাতে ব্যবসায়ীদের জন্য ‘বাংলা কিউআর কোড’ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি বছর নগদের চাহিদা ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে, যার ফলে ব্যাংক খাতের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা এবং সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। ডিজিটাল ব্যাংক চালুর প্রস্তুতি চলছে। এবার গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় পরীক্ষিত প্লাটফর্ম ‘মোজালুপ’ ব্যবহার করে আইআইপিএস বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) বাংলাদেশ ও গেটস ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, শিগগির দেশে চালু হতে যাচ্ছে ইনক্লুসিভ ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেম (আইআইপিএস)। এর মাধ্যমে মোবাইল ওয়ালেট, ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে একক নেটওয়ার্কে যুক্ত করে দ্রুত, সহজ ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল লেনদেন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
গভর্নর জানান, দেশে এখনও প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে। কেবল সেবার কভারেজ নয়, বরং মানুষকে গভীরভাবে আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করাই প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি। এজন্য মাইক্রোক্রেডিট খাতকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।
বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে, তবে ঋণ বিতরণে আরও সক্রিয় হতে হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ক্রেডিট কার্ডের সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়ায় ব্যাংকগুলো আরও বেশি কার্ড ইস্যু করতে পারবে, যা গ্রাহকের সুবিধা ও রাজস্ব আয় বাড়াবে।
তিনি জানান, বাংলাদেশে নগদ টাকার চাহিদা প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। কয়েক বছর ধরেই হারটি একই রকম। এই প্রবণতা ভাঙতে ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও স্বচ্ছ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একীভূত তাৎক্ষণিক পেমেন্ট সিস্টেম চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল ব্যাংক এই একক প্লাটফর্মে যুক্ত হবে
আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে বর্তমানে ২০ কোটির বেশি এমএফএস অ্যাকাউন্ট থাকলেও অর্ধেকেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক এখনও আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার বাইরে। গ্রামীণ-শহর বৈষম্য, লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধান ও সেবা প্রদানকারীর সীমিত আন্তঃসংযোগ বড় বাধা হয়ে আছে।
তারা তানজানিয়া, পাকিস্তান ও রুয়ান্ডার উদাহরণ টেনে জানান, এসব দেশে আন্তঃসংযোগযোগ্য পেমেন্ট সিস্টেম চালুর ফলে খরচ কমেছে, দক্ষতা বেড়েছে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও বেড়েছে।
শেষে চারটি অগ্রাধিকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়Ñ বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা, বাংলাদেশের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক প্লাটফর্মে ঐকমত্য গঠন, ন্যায্য প্রতিযোগিতার জন্য নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালীকরণ, আইআইপিএস বাস্তবায়নের রোডম্যাপ প্রণয়ন। এই উদ্যোগ শুধু আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াবে না, বরং জি-২০ আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট রোডম্যাপ ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে বলে জানান তারা।
নারীদের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করে গভর্নর বলেন, এখন থেকে অন্তত ৫০ শতাংশ এজেন্ট নারী হতে হবে। নারীরা ঘরে ঘরে প্রবেশ করে গৃহিণী, কন্যা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দিতে পারবেন।
এ ছাড়া ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে পূর্বের সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন থেকে ব্যাংকগুলো আরও বেশি ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করতে পারবে। এটি শুধু গ্রাহকদের সুবিধাই দেবে না, বরং আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতার মাধ্যমে সরকারের রাজস্বও বাড়াবে।
মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রসঙ্গে তিনি জানান, ন্যানো লোনের সীমা ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে এবং তা আরও বাড়ানো হবে। ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে একটি সমন্বিত তাৎক্ষণিক পেমেন্ট সিস্টেমের আওতায় আনার পরিকল্পনা চলছে। পূর্বের ব্যর্থ অভিজ্ঞতা কাটিয়ে এবার গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় পরীক্ষিত মডেল ‘মোজালুপ’ ব্যবহার করে এ উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
এ ছাড়া গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় তৈরি ওপেন-সোর্স প্লাটফর্ম মোজালুপ নিয়েও আলোচনা হয়, যা প্রতারণা প্রতিরোধ, পরিচয় যাচাই ও সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সহজে বাস্তবায়নে সহায়তা করে।