আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৫৪ এএম
গত জুনে ৫২০ কোটি টাকার নতুন ডিজাইনের নোট বাজারে ছাড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর নোট নিয়ে শুরু হয় নানা বিড়ম্বনা। 'অপরিচিত' নোট নিয়ে বেকায়দায় পড়ে সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচারণার অভাবে গ্রাম-গঞ্জের মানুষের কাছে অপরিচিতই রয়ে গেছে। এ ছাড়া এটিএম ও সিআরএম মেশিনও চিনতে পারছে না নতুন ডিজাইনের এই নোট। এদিকে তিন মাস বাজারে ছাড়লেও খোঁজ নেই নতুন নোটের! আশপাশে কারও কাছেই মিলছে না নতুন নোট। নতুন নোট বাজারে কম থাকায় তা নিয়ে নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, 'চাহিদার তুলনায় অনেক কম নতুন নোট বাজারে ছাড়া হয়েছে। এতো অল্প সময়ে নতুন নোট ছাপা সম্ভব নয়। আমরা যতটুকু পেরেছি, তা ছেড়েছি। নতুন নোট আরও বাজারে আসতে সময় লাগবে। আমরা মাত্র ৪টা নোট বাজারে ছেড়েছি। বাকিগুলো নিয়েও কাজ চলছে, আশা করি শিগগিরই ছাড়া যাবে।'
তিনি বলেন, '২০০ টাকার নোটের কাগজটা পেতে একটু সময় লাগছে। কাগজটা খুবই রেয়ার-সময়মতো পাওয়া যায়নি। তাই এই নোটটা বাজারে আসতে সময় লাগবে। তবে অন্যান্য নোট আসতে বেশি সময় লাগবে না।'
নতুন নোট পেলে মানুষ এখনও দ্বন্দ্বে পড়ে। এটা আসলেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কি না- তা নিয়ে সন্দেহের শেষ নেই। এটিএম বুথগুলো বা ব্যাংকগুলোতে এখনও সেই পুরনো ছেঁড়া-ফাটা নোট দেওয়া হচ্ছে। মানুষের হাতে থাকা নোটের বেশিরভাগই ছেড়া বা ফাটা। অথচ তিন মাস আগে বাজারে ছাড়া হয়েছে নতুন নোট। তা সত্ত্বেও এ নোট বাজারে সহজলভ্য হচ্ছে না। ভল্টে থাকা পুরনো নকশার হাজার হাজার কোটি টাকার নোট বাজারে ছাড়া হচ্ছে না। এগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নতুন করে যদি ব্যাপক হারে নোট ছাপানো হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, 'বর্তমানে টাকা ছাপিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে কোনো ঋণ দিচ্ছে না। ফলে বিপুল পরিমাণে নোট বাজারে আসছে না। তাছাড়া এভাবে বেশি নোট বাজারে ছাড়লে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। যেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, সে কারণে হিসাব করে নতুন নোট বাজারে ছাড়া হচ্ছে।
শুধু মানুষের হাতেই পুরনো নোট নেই ব্যাংকগুলোও পুরনো নোট দিচ্ছে ও নিচ্ছে। এমনকি এটিএম বুথ থেকে বের হচ্ছে পুরনো নোট। এসব কারণে পুরনো নোটে সয়লাব বাজার। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে ছেঁড়া-ফাটা ও পুরনো ময়লা নোট বিনিময়ের সুযোগ রয়েছে। সেখানে এর আগে পুরনো নোটের বদলে নতুন নোট দেওয়া হলে এবার বেশি পুরনো নোটের বদলে কম পুরনো নোট বিনিময় করা হচ্ছে।
জাহিদ হাসান নামের সোনালী ব্যাংকের এক গ্রাহক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বাজারে নতুন নোট ছাড়া হয়েছে। অথচও আমি এখনও নতুন নোট দেখিনি। এত নতুন নোট গেল কই? নতুন নোট ব্যাংক থেকে নিতে চাইলেও ব্যাংক নাকি চাহিদা বেশি থাকার কারণে দিতে পারছে না। তাহলে এই নোট গেল কই? গত তিন মাসে একটাও নতুন ডিজাইনের নোট আমি দেখিনি। তাহলেও এই নোটের খোঁজ নেই কেন?
তিনি বলেন, গত ১২ আগস্ট ১০০ টাকার নতুন বাজারে আনা হয়েছে। তার আগে ২০, ৫০ ও ১০০০ টাকার নোট বাজারে এসেছিল। তখন আমি ব্যাংক থেকে টাকা নিতে চাইলে তারা দিতে পারেনি। কিন্তু বাজারেও তো নোট নেই, তাহলে এই নোট কোথায় গেল। আমাদের হাতে যে নোট আছে তা সব পুরনো। ছিঁড়ে যায় যায় অবস্থা। এসব নোট এখন বহন করাও রিস্ক। এদিকে অনেকের অভিযোগ বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন ডিজাইনের টাকা বাজারে ছেড়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। এই টাকা মানুষের কাছে পরিচিত করতে কোনো উদ্যোগ গ্রাহণ করেনি বাংলাদেশ বাংক। ফলে কেউ নতুন নোট লেনদেন নিতে চাইছেন না। তা ছাড়া নতুন নোটের নকশা তৈরি করে সেটি বাজারে আনতে এক বছর পার হয়ে গেছে। তারপরও বাজারে নতুন নোট সহজলভ্য হয়নি।
নাজমুল হাসান নামের এক গ্রাহক বলেন, আমি ঈদে কিছু নতুন নোট নিয়েছিলাম। গ্রামের দোকানগুলোতে কোনো কিছু কিনতে গেলে তা নিতে অস্বীকার জানায় তারা। এই নোটের সঙ্গে পরিচিত নয় বলে তারা লেনদেন করতে ইচ্ছুক নয় বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এই নতুন নকশার নোটের বিজ্ঞাপন দিতে পারত। কিন্তু তারা তা কিছু করেনি। বাজারে ছেড়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেছেন। ফলে সাধারণ মানুষ এই নোটের সঙ্গে পরিচিত নয়। যেহেতু এই নোট দিয়ে লেনদেন হচ্ছে না। তাই অনেকে এই টাকা নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছে। বাজারে এই নোট সর্বজনীন হলে আবার তারাও লেনদেন করবে। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় ব্যর্থতা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
নতুন নোটের প্রচার প্রসার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আপনারাই (সাংবাদিক) আমাদের প্রচার-প্রচারণার একমাত্র মাধ্যম। আপনারা দেশের স্বার্থে প্রচার করুন। আমরা প্রচারের জন্য অন্য কারও কাছেই যাইনি। বাংলাদেশ ব্যাংক বিজ্ঞাপন দেওয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ওদিকে যাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তাছাড়া এটিএম ও সিআরএম মেশিনকে টাকা চিনানোর দায়িত্ব ব্যাংকগুলোর, বাংলাদেশ ব্যাংকের না।'
উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে প্রথমবারের মতো ১, ৫, ১০ ও ১০০ টাকার নোট বাজারে ছাড়া হয়। এসব নোটে শেখ মুজিবের ছবি ছিল। তবে পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের সময়ে নতুন নতুন নোট প্রচলনের পাশাপাশি পুরনো নোটগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে শেখ মুজিবের প্রতিকৃতি সংবলিত ১০০ ও ৫০০ টাকার নোট ছাপে। আর ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ মুজিবের ছবিযুক্ত ১, ২ ও ৫ টাকার কয়েন চালু করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সব
কাগুজে নোটেই বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ছাপানোর প্রক্রিয়া শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে ২০১১ সালের ১১ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত ২, ৫, ১০, ২০, ৫০, ১০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকা মূল্যমানের নোট চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।