আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২২:১৩ পিএম
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে। চলতি বছরের আগস্ট শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা। যা বিতরণ করা মোট ঋণের তিন ভাগের এক ভাগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হালনাগাদ বিবরণীতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মোট ঋণের তিন ভাগের এক ভাগ এখন খেলাপি ঋণ। আগের সরকারের আমলে নানা অনিয়ম করে রাঘব-বোয়ালদের ঋণ দেওয়ার কারণে ব্যাংক খাতে বাড়ছে খেলাপি। আগে গোপন করে রাখা হতো- এখন খেলাপি গোপন করা হচ্ছে না বলেই বাড়ছে ঋণ খেলাপির পরিমাণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি হয়েছে ৫ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৩ শতাংশ। গত জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। দুই মাস ব্যবধানে বা জুনের তুলনায় আগস্টে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা। আর এক বছরের হিসাবে বেড়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা এবং গত মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ।
ব্যাংকাররা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনিয়মের মাধ্যমে তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের যেসব ঋণ দেওয়া হয়েছিল তা এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সম্প্রতি খেলাপি ঋণের নিয়মে বড় পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগে যেখানে একটি ঋণ ৯ মাস অনাদায়ী থাকলে খেলাপি হতো, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেটি তিন মাস অনাদায়ী থাকলে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। যা পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের মার্চে দাঁড়ায় এক লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। একই বছর জুন মাসে খেলাপি বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। এবং ডিসেম্বর শেষে খেলাপির ঋণ ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের মার্চ ও জুন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি ও ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের যে অস্বাভাবিক তথ্য দেখা যাচ্ছে এটা দীর্ঘদিনের অনিয়ম-লুটপাটের ফসল। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণদাতা সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে পড়েও কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এসব সিদ্ধান্ত ব্যবসা-বাণিজ্যকে স্থবির করে তুলছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা চলছে, এটাও হঠাৎ খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণ হতে পারে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংককে নীতির পরিবর্তন করে বিনিয়োগবান্ধব সহায়ক নীতিতে আসতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মেয়াদি ঋণখেলাপির সময় পুনর্নির্ধারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে কিছু বড় অঙ্কের ঋণ বিরূপমানে শ্রেণিকৃত হওয়ায় এভাবে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এছাড়া গ্রাহকের চলতি ঋণ নবায়ন না হওয়া, পুনঃতফসিল করা ঋণের কিস্তি যথাসময়ে পরিশোধ না হওয়া এবং বিদ্যমান খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে সুদ যোগ হয়ে বেড়েছে খেলাপি।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে, তখন মোট খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এরপর থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অর্থনীতিবিদরা অনেক দিন ধরেই অভিযোগ করছেন, তৎকালীন সরকারের ছত্রছায়ায় ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট হয়েছে, যার একটা বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়েছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বের হতে শুরু করে। সাবেক সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে প্রভাবশালীদের বড় অঙ্কের ঋণ দিয়ে নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কাগজে-কলমে কম দেখাতে নেওয়া হয়েছিল একের পর এক নীতি। সরকার পরিবর্তনের পর সেই নীতি থেকে সরে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ব্যাংক খাতের অনৈতিক চর্চার বিরুদ্ধে কঠোরতা দেখিয়ে আসছেন। খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখার সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে খেলাপি ঋণের আসল চিত্র বের করে আনা হচ্ছে। কোনো ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি রেখে এবার লভ্যাংশ দিতে দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে এবার ২০টি ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারেনি। আগামী বছর কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি হলে যত মুনাফাই হোক, লভ্যাংশ দিতে পারবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক ঋণের বড় অংশই মেয়াদি। গত সরকারের সময় মেয়াদি ঋণ খেলাপি করার ক্ষেত্রে কারচুপি ছিল। আগে ঋণ পরিশোধের সময় পার হওয়ার পরদিন থেকে সব সময় মেয়াদোত্তীর্ণ বিবেচনা করা হতো। তবে আ হ ম মুস্তফা কামাল অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৯ সালে এক নির্দেশনার মাধ্যমে ছয় মাস পর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ধরা হয়। আবার করোনার পর ২০২০ সালে কেউ এক টাকা না দিলেও আর খেলাপি করা হয়নি। ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালেও কিস্তির সামান্য অংশ দিয়ে নিয়মিত দেখানো গেছে। এসবের পাশাপাশি কখনও বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতপশিল, পুনর্গঠনের মতো নানা সুবিধা দিয়ে খারাপ ঋণ নিয়মিত দেখানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এখন এসব সুবিধা বন্ধ।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিগত সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে চলতে পারেনি। সুবিধাভোগীরা রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণখেলাপি বাড়িয়েছে। ওই সময় ঋণ পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুফসহ নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে একটা ভঙ্গুর ব্যাংক ব্যবস্থা দেখতে পাচ্ছি।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিলÑ যেসব কারণে ব্যাংকগুলোর ভঙ্গুর অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাদের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেবে, যাতে ব্যাংকগুলো ঋণখেলাপির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সে ধরনের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বরং আগের মতোই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ে উদ্যোগ নিচ্ছে না। ফলে খেলাপি ঋণ আরো বেড়ে যাচ্ছে।