আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২২:২১ পিএম
আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২২:২১ পিএম
কৃষিঋণ পাওয়া নিয়ে কৃষকের অভিযোগ পুরনো। সিন্ডিকেট চক্রের কারণে ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে কৃষিঋণ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের করা কৃষিঋণ বিতরণের নীতিমালা বাস্তবায়নে হলে কৃষকদের ঋণ পাওয়া নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।বিশেষ করে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) তথ্য যাচাই ছাড়াই মাইক্রো ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটগুলো (এমএফআই) সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণের সুযোগ পাওয়ায় এ বিতর্ক ঘনীভূত হয়েছে।
খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নতুন নীতিমালায় কৃষকরা বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সিন্ডিকেট চক্রের দৌরাত্ম্য বাড়তে পারে। এ ছাড়া সংঘবদ্ধ খেলাপিদের ঋণ হাতিয়ে নেওয়ার শঙ্কা উঁকি দিচ্ছে। ফলে একই সঙ্গে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হতে পারেন এবং ঋণ আদায় প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি ঋণের অর্থ পাচার হওয়ারও ঝুঁকি রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি কৃষিঋণ নীতিমালা ঘোষণা করে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এমএফআইয়ের মাধ্যমে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ বিতরণ করা যাবে, যেখানে সিআইবির তথ্য যাচাই ছাড়াইয়ের দরকার হবে না। ব্যাংকগুলো ন্যূনতম ৫০ শতাংশ ঋণ বিতরণ করবে। আর বাকি অংশ বিতরণ করবে এমএফআই। কিন্তু সিআইবির ডাটাবেসে এমএফআইয়ের তথ্য নেই। ফলে খেলাপিরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একাধিকবার ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে প্রকৃত কৃষক ঋণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, আর ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রিতা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৯ হাজার কোটি টাকার কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তথ্য যাচাই ছাড়া ঋণ দেওয়াকে সতর্ক সংকেত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, বন্যা ও খরায় অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন তাদের ঋণ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কৃষি খাতে ব্যাংক বিশেষ নজর না দিলে খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে। ছোট হয়ে আসবে খাদ্যপণ্য সরবরাহ। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে। এতে কৃষকরা কৃষি ছেড়ে শহরে চলে যেতে বাধ্য হবেন, যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক।
কৃষিঋণ ঘোষণার সময় গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, কৃষিঋণের সবটাই কৃষকের কাছে পৌঁছায় কি না, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমরা এটি পর্যালোচনা করছি। আমরা চাই, শতভাগ কৃষিঋণ কৃষকের কাছে যাক। দালালের কাছে যেন না যায়। এটি পর্যালোচনা করছি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদারকি করবে।
তিনি বলেন, কৃষকদের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে দালালমুক্ত ব্যবস্থার বিকল্প নেই। দেশের অধিকাংশ কৃষকের ঋণে প্রবেশাধিকার সীমিত। ফলে ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা কৃষিঋণ কতটা প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছায়, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সামগ্রিক অর্থনীতিতে কৃষির অবদান সাড়ে ১৩ শতাংশের মতো। কিন্তু কৃষিভিত্তিক খাতে কর্মসংস্থান ৪০ শতাংশের মতো। যেটি আমাদের জন্য একটি ব্যর্থতা। কারণ আমরা এখনও গ্রামের মানুষকে শিল্পায়ন ও সেবা খাতে নিতে পারিনি। এ কারণে গ্রামীণ পর্যায়ে কৃষিনির্ভরতা এখনও রয়ে গেছে। তবে গ্রামীণ অর্থনীতি এখন আর কৃষিনির্ভর নয়।
অতীতেও আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত কৃষি ও পল্লীঋণে সিআইবি যাচাই শিথিল করা হয়েছিল। তবে গত ২৩ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে কৃষিঋণে সিআইবি রিপোর্ট বাধ্যতামূলক করে।
এমআরএর তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ২ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকার ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ হয়েছে, যার কোনোটিই সিআইবি রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এতে অনেক খেলাপি নতুন ঋণ নিয়েছেন এবং অনেকেই তা পাচার করেছেন।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, সিআইবি ডাটাবেজ চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনও তা হয়নি। ডিসেম্বরের মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, ট্রানজিশনাল সময়ে খেলাপিরা ঋণ নিলেও তা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে এমএফআইগুলো নিজেদের মতো করে ঋণ মনিটরিং করার চেষ্টা করছে যাতে অর্থ অন্য কাজে বা পাচারে ব্যবহৃত না হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, সিআইবি রিপোর্ট যাচাই ছাড়া ঋণ দেওয়া হলে কোনো গ্রাহক একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিলেও তা ধরা সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা যাতে সহজেই ঋণ সুবিধা পায় এবং এর পরিমাণ বাড়াতেই আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণে সিআইবি চার্জ শিথিল করা হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপনার যে শঙ্কা করছেন সেটার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক। সিন্ডিকেট বা দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে এবং চলবে। এমআরএর সিআইবি ডাটাবেজ না থাকায় খেলাপিদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে এমএফআইগুলোর আরও সতর্কভাবে ঋণ বিতরণ করা উচিত।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, কৃষিঋণ বিতরণ কমছে। বন্যায় অনেক ক্ষতির শিকার হয়েছে কৃষকরা। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য আরও বেশি ঋণের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু ব্যাংকগুলো কৃষিঋণের প্রতি আন্তরিক না থাকায় ঋণের প্রবাহ কমেছে। আর এতেই বোঝা যাচ্ছে এখানে সবকিছু নিয়মমাফিক কাজ করছে না। এ খাতে যে সিন্ডিকেট রয়েছে সেটা ভাঙতে পারলেই কৃষিঋণ বিতরণ বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।