প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:২২ পিএম
দেশে ব্যয়ের তুলনায় আয়ের দিক থেকে মানুষ আরও বেশি দরিদ্র হয়ে পড়ছে। প্রতিবছর এই দারিদ্র্যের হার বাড়ছে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ দরিদ্র না হলেও দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরেই অবস্থান করছে। তাদের জীবনযাত্রা টেকসই নয়, তাই যেকোনো সামান্য ধাক্কায় তারা দারিদ্র্যের গভীরে নেমে যেতে পারেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে বলেন, অনেকেই নাক বরাবর পানিতে দাঁড়িয়ে আছেন। সামান্য ঢেউ এলেই তারা তলিয়ে যাবেন। তাদের অবস্থা কেবল জীবনধারণে সীমাবদ্ধ, উন্নতির কোনো পথ নেই। সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স অন সোশ্যাল প্রটেকশন ২০২৫’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘ন্যায্যতাভিত্তিক সমাজে চরম দারিদ্র্য থাকার কোনো সুযোগ নেই। কোনো দেশ এত গরিব হতে পারে না যে, তার জনগণের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব নয়। এখন আর কোনো অজুহাত দেখানোর অবকাশ নেই। তাই দারিদ্র্য দূরীকরণকে শুধু সামাজিক উদ্দেশ্য নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবেও গ্রহণ করতে হবে।’
তিনি সামাজিক সুরক্ষা ভাতার বাস্তবতায় বড় ধরনের ত্রুটির কথা তুলে ধরে বলেন, ‘বর্তমানে যারা সামাজিক ভাতা পাচ্ছেন, তাদের অর্ধেকই প্রকৃত যোগ্য নন। তারা হয় ভুতুড়ে, নয় রাজনৈতিক বিবেচনায় অন্তর্ভুক্ত। জাতীয়ভাবে সমন্বিত তালিকা প্রণয়ন ও মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি করলে প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা সহজ হবে।’
পরিকল্পনা উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থাকলেও যদি মানুষের জীবিকা নির্বাহের ন্যূনতম উপায় না থাকে, তবে সেগুলো তাদের কোনো কাজে আসে না। তাই মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার সঙ্গে শিক্ষা-স্বাস্থ্যকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।’
তিনি মনে করিয়ে দেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং গত বছরের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মূল্যবোধ ছিল সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠন। আয় সমান না-ও হতে পারে, তবে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের দারিদ্র্যঘন এলাকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রংপুর একসময় মৌসুমি ক্ষুধার কারণে মঙ্গাপীড়িত এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। গণমাধ্যমের চাপের কারণে সরকার এ সমস্যা স্বীকার করে এবং বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়। ফলে এখন সেখানে মৌসুমি ক্ষুধা অনেকটা কমেছে, তবে দারিদ্র্য রয়ে গেছে। একইভাবে নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালীর মতো জেলায় নতুন দারিদ্র্যঘন অঞ্চল তৈরি হয়েছে। এসব এলাকায় বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার কয়েক মাসের জন্য থাকলেও একটি সুনির্দিষ্ট পথনকশা তৈরি করতে চায়। সেটি ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকারের জন্য কার্যকর হবে।
দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির দুর্বলতা কাটাতে সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি করা জরুরি।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য মনজুর হোসেন জানান, গত এক দশকে জিডিপিতে গড়ে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর পেছনে সুশাসনের অভাব, আর্থিক খাতে অনিয়ম, প্রতিষ্ঠান দুর্বলতা ও ন্যায়বিচারের ঘাটতি কাজ করেছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষা খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তা পর্যাপ্ত নয়। এ খাতকে সম্প্রসারণ করতে বন্ড ও বীমার মতো নতুন উৎস যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে।
অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোখলেস উর রহমান, মন্ত্রিপরিষদের সমন্বয় ও সংস্কার বিভাগের সচিব জাহেদা পারভীন, ইউএনডিপি বাংলাদেশের প্রতিনিধি স্টেফেন লিলার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান মিচেল ক্রেৎজা ও ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ার ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিনটন পপকি বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অতিরিক্ত সচিব মো. খালেদ হাসান।
খালেদ হাসান বলেন, দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকা বিপুল সংখ্যক মানুষই দেশের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী। তাদের বিষয়ে এখনই গভীর চিন্তাভাবনা জরুরি।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। তবে দারিদ্র্য ও বৈষম্য মোকাবিলায় এ বরাদ্দ যথেষ্ট নয় বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।