× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে দেশীয় জাহাজ খাত

হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৫ ১০:০৬ এএম

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৫ ১৭:১৬ পিএম

প্রবা ফটো

প্রবা ফটো

রমরমা অবস্থায় থাকা দেশের সামুদ্রিক জাহাজ পরিবহন খাত এখন পার করছে সংকটময় সময়। কর ছাড়সহ ভ্যাট মওকুফের কারণে গত ৫ বছর ধরে যেই খাতে বছর বছর বেড়েছে বিনিয়োগ, এসব সুযোগ-সুবিধা বাতিল করার পর এ খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এতে কমতে শুরু করেছে দেশীয় পতাকাবাহী সামুদ্রিক জাহাজের সংখ্যা। গত বছর যেখানে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজ ছিল ১০২টি, সেখানে এখন আছে ১০০টি। নতুন বিনিয়োগ না আসায় এখন বেড়ে যাওয়ার পরিবর্তে উল্টো কমছে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজ।

সামুদ্রিক বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনার সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, সরকার কর অব্যাহতি সুবিধা বাতিল করার কারণেই দেশে সামুদ্রিক বাণিজ্যিক জাহাজ রেজিস্ট্রেশন কমেছেবিশেষ করে, সাড়েশতাংশ ভ্যাট আরোপ করায় দেশীয় উদ্যোক্তারা নতুন বাণিজ্যিক জাহাজ ক্রয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন নাদেশি কোম্পানিগুলো জাহাজ কেনা বন্ধ রাখায়

বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের বহর বাড়ছে না, উল্টো কমছে। ২০২৪ সালে যেখানে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা ছিল ১০২টি, সেখানে চলতি বছর সেটি নেমে এসেছে ১০০টিতে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের দুটি জাহাজ স্ক্র্যাপ করায় ১০২টি থেকে নেমে এখন দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০০টি। নতুন জাহাজ যুক্ত না হলে এই সংখ্যাটা দিন দিন আরও কমবে বলে জানিয়েছেন তারা।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিনার অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, 'সামুদ্রিক জাহাজের রেজিস্ট্রেশন কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এই খাতে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করেছেন। যে কারণে জাহাজ ক্রয়ে খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ খাতের উদ্যোক্তারা এখন জাহাজ কিনছেন না। তাই রেজিস্ট্রেশনও হচ্ছে না।'

তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের আমদানি-রপ্তানি যেই ভলিউম তার মাত্র ১১ শতাংশ নিজেদের জাহাজে পরিবহন করতে পারি। বাকি ৮৯ শতাংশ আমরা বিদেশি জাহাজ দিয়ে পরিবহন করি। আমদানি-রপ্তানির শতভাগ যদি আমরা আমাদের দেশের জাহাজ দিয়ে পরিবহন করতে চাই, তাহলে আমাদের ৯০০'র মতো জাহাজ প্রয়োজন। সেখানে আমাদের আছে ১০০টি। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা যাতে এই খাতে এগিয়ে আসে সেজন্য সরকারকে সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। সুযোগ-সুবিধা না বাড়ালে সামনে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা আরও কমে যাবে।

সমুদ্রগামী জাহাজ পরিবহন শিল্পে দেশি উদ্যোক্তাদের আগ্রহী করে তুলতে ২০১৯ সালে এই শিল্পে ২০৩০ সাল পর্যন্ত আয়কর ছাড়ের সুবিধা ঘোষণা করেছিল সরকার। একই সময় সমুদ্রগামী জাহাজ পরিবহন শিল্পে ভ্যাট মওকুফ করা হয়। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে সমুদ্রগামী জাহাজ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে থাকেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। এতে দেশে বছর বছর বাড়তে থাকে নিজস্ব পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা। ২০১৮ সালে দেশে সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা যেখানে ছিল ৩৭টি। আয়কর ছাড়ের সুবিধা এবং ভ্যাট মওকুফ করার পর ৫ বছরের ব্যবধানে ২০২৪ সালে সেটি ছেড়ে যায় ১০০টি।

কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বর্তমান সরকার সেই সুবিধা বাতিল করে দেওয়ায় এখন আবারও পিছিয়ে পড়ছে দেশের সমুদ্রগামী জাহাজ পরিবহন শিল্প। গত ১৫ ডিসেম্বর জারি করা আরেক আদেশে শিল্পটিতে সাড়ে ৭ শতাংশ মূসক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সময়ে এক এসআরও জারির মাধ্যমে আয়কর ছাড়ের সুবিধা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এতে শিল্পটিতে আয়কর দাঁড়িয়েছে সাড়ে ২৭ শতাংশে। তাতে নতুন জাহাজ কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। চলতি বছরের গত ৭ মাসে একটি জাহাজও কেনেনি কেউ।

নৌ বাণিজ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে একটি জাহাজও রেজিস্ট্রেশন নেয়নি। উল্টো স্ক্র্যাপ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন বাংলার জ্যোতি ও বাংলার সৌরভ জাহাজ দুটি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ এর আগে ২০১৯ সালে ভ্যাট মওকুফ এবং অগ্রিম কর কমিয়ে আনার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে দেশে ৬৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ রেজিস্ট্রেশন নেয়। এর মধ্যে ২০২০ সালে রেজিস্ট্রেশন নেয় ১৪টি জাহাজ। পরের বছর কিছুটা কমে ২০২১ সালে রেজিস্ট্রেশন নেয় ১০টি জাহাজ। এরপর ২০২২ সালে রেজিস্ট্রেশন নেয় ১৬টি জাহাজ। ২০২৩ সালে কিছুটা কমে ওই বছর রেজিস্ট্রেশন নেয় ১১টি জাহাজ। সর্বশেষ ২০২৪ সালে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে ১৪টি জাহাজ।


সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশীয় পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ আছে ১০০টি। এর মধ্যে মাত্র ৫টি জাহাজ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের। বাকি ৯৫টি জাহাজের মালিকানায় রয়েছে দেশের ১৬টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ২৮টি জাহাজ সবার শীর্ষে রয়েছে কেএসআরএম গ্রুপ। তাদের পরে দ্বিতীয় শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে মেঘনা গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির জাহাজ আছে ২৫টি। ১০টি জাহাজ নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে আকিজ গ্রুপ। চতুর্থ স্থানে আছে এইচআর লাইনস। তাদের জাহাজ আছে ৮টি। ৭টি জাহাজ নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ভ্যানগার্ড। বাকি ১১টি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন রয়েছে ১৬টি জাহাজ। ১১টি প্রতিষ্ঠানই সামুদ্রিক জাহাজ পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত হয় সরকার এই খাতে আয়কর ছাড় এবং ভ্যাট মওকুফ করার পর।

এর মধ্যে ২০১৮ সালে ওমেরা লিগ্যাসি নামে একটি অয়েল ট্যাংকার জাহাজ কেনার মধ্যদিয়ে প্রথমবারের মতো জাহাজ ব্যবসায় নাম লেখায় এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেড। একই বছর অরিয়ন এক্সপ্রেস নামে একটি জাহাজ কেনার মধ্যদিয়ে সামুদ্রিক জাহাজ ব্যবসায় নাম লেখায় অরিয়ন অয়েল অ্যান্ড শিপিং লিমিটেড। পরের বছর ২০১৯ সালে স্টার রয়েল নামে একটি জাহাজ কেনার মধ্যদিয়ে প্রথমবারের মতো জাহাজ ব্যবসায় নাম লেখায় ভ্যানগার্ড মেরিটাইম। সেঁজুতি নামে একটি জাহাজ কিনে

একই বছর প্রথমবারের মতো জাহাজ ব্যবসায় নাম লেখায় অ্যাডভান্স শিপিং। পরের বছর ২০২০ সালে এইচআর সাহারে নামের একটি কন্টেইনার জাহাজ কিনে প্রথমবারের মতো জাহাজ ব্যবসায় আসে কর্ণফুলী লিমিটেড শিপিং। ওই বছর জাহাজ ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পর ২০২২ সাল পর্যন্ত তিন বছরে আরও সাতটি কন্টেইনার জাহাজ যুক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে কর্ণফুলী লিমিটেডের মালিকানায় রয়েছে দেশের পতাকাবাহী ৮টি কন্টেইনার জাহাজ।

পরের বছর ২০২১ সালে সুপার রয়েল নামের একটি জাহাজ কেনার মধ্যদিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ ব্যবসায় নাম লেখায় বিএসএ শিপিং লিমিটেড। এর পরের বছর ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো জাহাজ ব্যবসায় যুক্ত হয় চারটি গ্রুপ। এর মধ্যে জারার হানিফ, রুবাইয়াত হানিফ নামে দুটি বাল্ক কেরিয়ার জাহাজ কেনার মধ্যদিয়ে প্রথমবারের মতো জাহাজ ব্যবসায় নাম লেখায় হানিফ মেরিটাইম লিমিটেড, অপরাজিতা নামের একটি জাহাজ কেনার মধ্যদিয়ে পিএনএন শিপিং, প্রাইড অব ইয়াসনা নামের একটি বাল্ক কেরিয়ার জাহাজ কেনার মধ্যদিয়ে সানশাইন নেভিগেশন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এবং সাফিনাহ নামের একটি বাল্ক কেরিয়ার জাহাজ কেনার মধ্যদিয়ে জাহাজ ব্যবসায় প্রথমবারের মতো যুক্ত হয় পিএইচ নেভিগেশন। এর পরের বছর ২০২৩ সালে লেডি অব দরিয়া এবং কুইন অব দরিয়া নামের দুটি অয়েল ট্যাংকার জাহাজ কেনার মধ্যদিয়ে জাহাজ ব্যবসায় প্রথমবারের মতো যুক্ত হয় দরিয়া শিপিং লিমিটেডসর্বশেষ ২০২৪ সালে সামুদা নামে একটি অয়েল ট্যাংকার কেনার মধ্যদিয়ে জাহাজ ব্যবসায় আসে সামুদা শিপিং লিমিটেড

নতুন নতুন এসব প্রতিষ্ঠান সামুদ্রিক জাহাজ পরিবহন ব্যবসায় আসার কারণে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা ধারণা করেছিলেন ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের পতাকাবাহী জাহাজ ২০০ ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু ভ্যাট আরোপের কারণে সেটি থেমে গেল। তাই দেশের সামুদ্রিক জাহাজ পরিবহনকে এগিয়ে নিতে আয়কর ছাড়সহ ভ্যাট মওকুফের দাবি জানিয়েছেন এই খাতের উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, শুধু সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপের কারণেই এখন একটি জাহাজ কেনায় ৫০ কোটি টাকার বেশি খরচ বেড়ে গেছে। তাই এই খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা