আরমান হেকিম
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৫ ১২:০০ পিএম
আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৫ ১৬:০২ পিএম
গ্রাফিক্স : প্রবা
বাংলাদেশের বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে বছরের পর বছর বিলম্ব এখন এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। শুরুতে যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়, বাস্তবে তার একাধিক গুণ বেশি সময় লাগছে। ফলে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ, কিন্তু প্রত্যাশিত সুফল আসছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিলম্বের মূল কারণ দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের ঘাটতি। প্রকল্প প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন ও সমাপ্তি—সব ধাপেই নানা ধরনের দুর্বলতা প্রকল্পকে ঝুলিয়ে রাখে।
সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের কর্মসভায় বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বড় প্রকল্পে বিলম্বের মূল কারণ হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণ, বিদ্যুৎ-গ্যাস-টেলিযোগাযোগের স্থাপনা স্থানান্তরে জটিলতা এবং অভিজ্ঞ প্রকল্প পরিচালকের অভাবকে চিহ্নিত করেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন শাখা সুপারিশ করেছে—এসব কাজকে আলাদা প্রকল্প হিসেবে আগে সম্পন্ন করা হোক, যাতে মূল অবকাঠামো নির্মাণে গতি আসে।
প্রকল্প পরিচালনায় দুর্বলতা
আইএমইডির সচিব মো. কামাল উদ্দিন সভায় বলেন, পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগের নিয়ম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে একজন কর্মকর্তাকে একসঙ্গে একাধিক প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে কোনো প্রকল্পই সঠিকভাবে অগ্রসর হয় না। অনেক সময় অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে বসানো হয়, আবার ঘন ঘন বদলির কারণে ধারাবাহিকতাও নষ্ট হয়।
তিনি জানান, এসব দুর্বলতা কাটাতে হলে অভিজ্ঞ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ “পিডি পুল” তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালকদের অর্থ ব্যবস্থাপনা, ক্রয়নীতি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
দীর্ঘসূত্রতার চক্র
কর্মসূচিতে উপস্থাপিত আইএমইডির প্রবন্ধে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ২৫টি প্রধান সমস্যা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে প্রণয়ন পর্যায়ে রয়েছে দুর্বল সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশার অসম্পূর্ণতা, ব্যয় অনুমানে ত্রুটি, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করা এবং পরামর্শকদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা।
বাস্তবায়ন ধাপে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে আইএমইডির পরিদর্শন প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে গড়িমসি, প্রকল্প মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবে বিলম্ব, বাস্তবায়নকারী ও সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, এবং বিদেশি অর্থায়নে উন্নয়ন সহযোগীদের অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা।
প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও নানা দুর্বলতা রয়ে যায়। যেমন—সমাপ্তির প্রতিবেদন দাখিলে দেরি, অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ না হওয়া এবং ব্যবহৃত গাড়ি পরিবহন পুলে জমা না দেওয়া।
ব্যয় বাড়ে, সুফল মেলে না
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা শুধু সময়ই নয়, ব্যয়ও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। যেমন—ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রথম পর্যায়ের জন্য নির্ধারিত ব্যয় ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পে বিলম্ব ও নকশা পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। একইভাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, পদ্মা রেল সংযোগের মতো প্রকল্পেও অতিরিক্ত ব্যয় এবং সময় বৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছে।
অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তাফা কে মুজেরি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে এসব সমস্যা বহু দশক ধরে চলছে। “প্রত্যেকবার সমস্যা চিহ্নিত হয়, সুপারিশ দেওয়া হয়, কিন্তু কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ তা কার্যকর করে না। আইএমইডির নিজস্ব ক্ষমতা নেই, ফলে তাদের সুপারিশ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।”
বিদেশি সহযোগীদের আস্থাহানি
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিদেশি অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোতে দুর্বল ব্যবস্থাপনা আরও জটিল প্রভাব ফেলে। উন্নয়ন সহযোগীরা যখন দেখেন প্রকল্পে সমন্বয়ের অভাব বা বারবার সময় ও ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে, তখন তারা নতুন অর্থায়নে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন। এতে ভবিষ্যতের বিনিয়োগও ব্যাহত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে বড় প্রকল্প বিলম্বিত হলে শুধু উন্নয়ন নয়, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক বিনিয়োগও পিছিয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে তাঁরা দেখান—ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পে বিলম্বের কারণে এক দশক ধরে দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক করিডরের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।
টেকশই উন্নয়নের লক্ষ্য হুমকিতে
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, এ ধরনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা চলতে থাকলে সরকারের ঘোষিত ২০৪১ সালের উন্নয়ন রূপরেখা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ সেই রূপরেখার মূল ভরকেন্দ্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
তাদের মতে, সমন্বয়হীনতা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছর এডিপি বাস্তবায়নের গড় হার ৮০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। অথচ পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন হার ৯৫ শতাংশ না হলে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।
সমাধানের সুপারিশ
আইএমইডি ও বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ বলছেন, প্রকল্প প্রণয়ন পর্যায় থেকেই শক্তিশালী নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প পরিচালকের নিয়োগে কঠোরতা, আলাদা ভূমি অধিগ্রহণ প্রকল্প, এবং সেবাপ্রতিষ্ঠানের কাজ আগে শেষ করার মতো কাঠামোগত সংস্কার আনতে হবে। একই সঙ্গে বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে সময়সীমা কঠোরভাবে মানতে হবে এবং আইএমইডিকে সুপারিশ কার্যকর করার ক্ষমতা দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সংস্কার। নাহলে দুর্বল ব্যবস্থাপনায় ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলো শুধু ব্যয় বাড়াবে, উন্নয়ন লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না।