অর্থনীতি
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ১২:৪৫ পিএম
গত সরকারের সময়ে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার উদ্দ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় নগদকে লাইসেন্স দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সরকার পতনের পর আবারও ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সংস্থাটি। সে লক্ষ্যে আগামী ১ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য আবেদনপত্র গ্রহণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে এবার লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর মানদণ্ড আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যেখানে গুরুত্ব পাবে আবেদনকারীর আর্থিক এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। সেই লক্ষ্যে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধনের সীমা ১২৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক খাতে বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আর্থিক সেবা প্রদানের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থার আওতা আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে এর ভূমিকার ওপরও জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুযোগকে কাজে লাগানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ক্ষুদ্র, কুটির ও ছোট উদ্যোক্তাদের (সিএমএসই) উন্নয়ন অপরিহার্য।
আর এক্ষেত্রে সহজ ঋণপ্রাপ্তি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তা প্রদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে দেখা হচ্ছে এই ডিজিটাল ব্যাংক ব্যবস্থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, উপযুক্ত আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী নীতিগতভাবে লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যোগ্য স্পনসরদের সিলগালা করা আবেদনপত্রের সঙ্গে (অ-ফেরতযোগ্য) ৫ লাখ টাকা (প্রায় ৪ হাজার ৪০০ পাউন্ড) প্রসেসিং ফি এবং সমস্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে হবে। অসম্পূর্ণ আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে। আবেদনপত্র সরাসরি জমা দেওয়ার পাশাপাশি ই-মেইলের মাধ্যমে সমস্ত নথি জমা দিতে হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
নগদ ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স স্থগিত ও ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনার পর এ সিদ্ধান্তের কথা জানাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫২টি আবেদন গ্রহণ করে, যারমধ্যে ৮টি প্রাথমিক অনুমোদন পায় এবং দুটি প্রতিষ্ঠানকে সম্মতিপত্র (লেটার অব কনসেন্ট) দেওয়া হয়।
বিশ্বব্যাংক অবশ্য আগেই বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স প্রদানে স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। ২০২৩ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ: কান্ট্রি প্রাইভেট সেক্টর ডায়াগনস্টিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) ও বহুপাক্ষিক বিনিয়োগ গ্যারান্টি সংস্থা (মিগা) উল্লেখ করে-দুর্নীতি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অস্পষ্টতা এবং লাইসেন্স বণ্টনে অসঙ্গতি বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধির প্রধান অন্তরায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু আবেদনকারীকে ভবিষ্যতে লাইসেন্স দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও অন্যরা এ ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা পায়নি, ফলে তারা অনিশ্চয়তায় রয়ে গেছে।
বিশ্বব্যাপী শাখাবিহীন ব্যাংকিংয়ের দিকে অগ্রযাত্রার অংশ হলো ডিজিটাল ব্যাংক ব্যবস্থা। পার্শ্ববর্তী ভারত ও পাকিস্তান ২০২২ সালেই এ ব্যবস্থা চালু করেছে। বর্তমানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারীরা সরাসরি ক্ষুদ্র ঋণ (ন্যানো লোন) দিতে না পারলেও ডিজিটাল ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বা আলাদা লাইসেন্সের মাধ্যমে তা দিতে পারে।
বর্তমানে ঋণের সর্বোচ্চ সীমা ৫০ হাজার টাকা নির্ধারত রয়েছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত কার্যক্রম ও আর্থিক সক্ষমতা দেখাতে পারলে এ সীমা বাড়ানো হতে পারে।
ডিজিটাল ব্যাংকের মাধ্যমে আর্থিক সেবা খাতে এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে আরও টেকসই করে দেশের সব স্থানে দরকারি আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে সম্পূর্ণ অফিসবিহীন ও অনলাইন-নির্ভর ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদনের পথে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এমন এক সময়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে যখন প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের দিকে ঝুঁকছে।
গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) খাত ডিজিটাল লেনদেনে যেই বিপ্লব ঘটিয়েছে, ডিজিটাল ব্যাংক সেই ক্যাশলেস অর্থনীতির যাত্রাকে আরও সামনে এগিয়ে নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সাধারণ ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি সঞ্চয়, ঋণ গ্রহণ, প্রবাসী আয় গ্রহণসহ সব ধরনের আর্থিক সেবা প্রাপ্তি আরও সহজ হয়ে যাবে। দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনো মৌলিক ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়ে গেছে। ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো ভৌগোলিক সীমা না থাকায় এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে পারবে, যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের জুনে ডিজিটাল ব্যাংকের নীতিমালা করে। সেই নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ছিল ১২৫ কোটি টাকা, যদিও প্রচলিত ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন প্রয়োজন হয় ৫০০ কোটি টাকা।
এদিকে, শাখা এবং জনবল সংক্রান্ত উচ্চ পরিচালন ব্যয়ের কারণে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেশের অনেক অঞ্চলে, বিশেষ করে দুর্গম গ্রামীণ এলাকায় সেবা পৌঁছে দিতে সমস্যার সম্মুখীন হয়। যদিও এমএফএস খাত দেশে ডিজিটাল লেনদেনে বিপ্লব ঘটিয়েছে, কিন্তু তাদের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এমএফএস সরাসরি গ্রাহকের আমানত গ্রহণ বা ঋণ প্রদান করতে পারে না, ডিজিটাল ব্যাংক এই গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতাই পূরণ করবে।
এছাড়াও, ডিজিটাল ব্যাংক ক্ষুদ্র ব্যবসায় অর্থায়নের দিকেও মনোযোগ দিতে পারে, কারণ প্রচলিত ব্যাংকগুলো প্রায়ই বড় গ্রাহকদের উপর বেশি মনোযোগ দেয়, যার ফলে অনেক সময় ছোট গ্রাহকরা পিছিয়ে পড়েন। এমএফএস-এর মতো, ডিজিটাল ব্যাংকও ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা এবং কম ব্যাংকিং সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর মৌলিক ব্যাংকিং চাহিদা পূরণের সুযোগ নিতে পারে।
পুরোপুরি চালু হলে, ডিজিটাল ব্যাংকগুলো ২৪/৭ ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করবে, যা ক্যাশলেস লেনদেনকে উৎসাহিত করবে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রসার ঘটাবে। উন্নত এনক্রিপশন, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন এবং বায়োমেট্রিক যাচাইকরণের মতো তাদের উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ডিজিটাল ব্যাংকিংকে আরও সুরক্ষিত ও স্বচ্ছ করে তুলবে, যা জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করবে।