আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৫ ১১:১৭ এএম
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ১৭:১৭ পিএম
প্রবা গ্রাফিক্স
দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল, যা এখন কিছুটা কমছে। এর বড় প্রভাব পড়েছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। ২০২৪ অর্থবছরের শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়। তবে গত ডিসেম্বরে এসে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এরপর আবার কমে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, খেলাপি ও আস্থাহীনতার ধকল কাটিয়ে আবার স্কুল ব্যাংকিংয়ে আস্থা ফিরছে। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে হিসাব ও আমানত বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন স্কুল ব্যাংকিংয়ে আমানত বেড়েছে ৬ হাজার ৭৮ কোটি ৮০ লাখ টাকার।
ব্যাংকাররা বলছেন, জুন ছিল অর্থবছরের শেষ মাস। এই সময়ে সাধারণত সবাই ব্যাংকে টাকা জমা রাখে। মূল্যস্ফীতি আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্কুল ব্যাংকিংয়ের ওপর। তা ছাড়া বর্তমানে ব্যাংক খাতে আগের চেয়ে আস্থা ফিরেছে। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এ খাত।
২০১০ সালে শিক্ষার্থীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য টাকা জমার সুযোগ আসে ২০১১ সালে। ২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক এই কার্যক্রমের জন্য পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করে। উদ্দেশ্য ছিলÑ ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতের জন্য তাদের আর্থিকভাবে সচেতন করে তোলা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালের জুন শেষে স্কুলশিক্ষার্থীদের নামে খোলা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখ ৬ হাজার ৬৩৪টি। এ সময় এসব অ্যাকাউন্টে জমা ছিল ২ হাজার ১৩৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতেও অ্যাকাউন্ট সংখ্যা ছিল ৪৩ লাখ ৭৩ হাজার ৩৯৯ এবং আমানত ছিল ২ হাজার ৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ পাঁচ মাসে হিসাব বেড়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ২৩৫টি। একই সময়ে আমানত বেড়েছে ১৩৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জুন শেষে স্কুলশিক্ষার্থীদের নামে সবচেয়ে বেশি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে গ্রামে। গ্রামের ব্যাংকগুলোতে স্কুল শিক্ষার্থীদের নামে হিসাব খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৯১ হাজার ৭৭৪টি। অপরদিকে শহরের ব্যাংকগুলোতে হিসাব খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ১৫ হাজার ১৬০টি। এ ছাড়া গ্রামের তুলনায় স্কুলশিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবে আমানত বেশি শহরের শাখাগুলোতে। গত মে মাস শেষে গ্রামের শাখাগুলোতে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৭১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অপরদিকে শহরের ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এতদিন উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা তলানিতে ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। স্কুলের বেতন, খাতা-কলমসহ নানা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক অভিভাবক শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নিয়েছেন। পাশাপাশি গত সরকারের সময় ব্যাংক খাতে যে অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এতে কয়েকটি ব্যাংকের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়, যা প্রভাব পড়েছিল স্কুল ব্যাংকিংয়ের ওপর। এখন মূল্যস্ফীতি কমছে। ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা বেড়েছে। ফলে স্কুল ব্যাংকিংয়ে হিসাব ও আমানত বেড়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, স্কুল ব্যাংকিংয়ে ছেলেরা অ্যাকাউন্ট খোলায় এগিয়ে। বর্তমানে মোট হিসাবের ৫১ শতাংশ ছেলেদের নামে, যা ২২ লাখ ৯৬ হাজার ৮১৬টি। এর মধ্যে শহরে ছেলেদের নামে হিসাব সংখ্যার পরিমাণ ১১ লাখ ৬৮ হাজার ৫৮৩টি। ছেলেদের নামে গ্রামের ব্যাংকগুলোতে হিসাব সংখ্যার পরিমাণ ১১ লাখ ২৮ হাজার ২৩৩টি। আমানতের পরিমাণেও ছেলেরা এগিয়ে। এদিকে স্কুল ব্যাংকিংয়ে মোট হিসাবের ৪৯ শতাংশ মেয়েদের নামে, যা ২২ লাখ ১০ হাজার ১১৮টি। এর মধ্যে গ্রামে মেয়েদের নামে হিসাব সংখ্যার পরিমাণ ১২ লাখ ৬৩ হাজার ৫৪১টি।
জানা গেছে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে স্কুলপড়ুয়াদের ব্যাংকসেবা ও আধুনিক ব্যাংকিং প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে ২০১০ সালে স্কুল ব্যাংকিং কর্মসূচি চালু করা হয়। তবে শিক্ষার্থীরা টাকা জমা রাখার সুযোগ পায় ২০১১ সাল থেকে। স্কুলপড়ুয়ারা মা-বাবা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উৎসব এবং পার্বণে উপহার বা নগদ অর্থ পায়। নিয়মিতভাবে দুপুরের টিফিন বাবদ অর্থ পেয়ে থাকে। এসব থেকে কিছু বাঁচিয়ে সঞ্চয়ের মনোভাব গড়ে তুলতেই স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। এখানে ১১ থেকে ১৭ বছরের তরুণ-তরুণী ও ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুল ব্যাংকিংয়ের জন্য নির্ধারণ করা হয়।
বর্তমানে দেশের ৫৯ ব্যাংকে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব চালু রয়েছে। এক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। ব্যাংক হিসাব চালাতে গ্রাহককে কোনো চার্জ দিতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে এ হিসাব চালাতে শিক্ষার্থীদের কোনো খরচ দিতে হয় না, চেক বই নিতে গুনতে হয় না মাশুল। জমা বই, ডেবিট কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিংসহ অন্যসব সুবিধাও রয়েছে স্কুল ব্যাংকিংয়ে। লেনদেন করা যায় যত খুশি তত। মাত্র ১০০ টাকা আমানত রেখেই এ ধরনের অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের জন্য স্কুল ব্যাংকিংয়ের আমানত মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী আমানত, যা স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগযোগ্য।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে আমাদের ব্যাংক খাতের ওপর এক ধরনের আস্থাহীনতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। যদিও সেটা ধীরে ধীরে কেটে উঠেছে। এর একটা প্রভাব স্কুল ব্যাংকিংয়েও পড়েছিল। এখন ব্যাংকগুলোকে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করতে হবে।’