প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৫ ১৭:২০ পিএম
আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৫ ১৭:২৩ পিএম
প্রবা ফটো।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সুশাসন, ভোক্তাবান্ধব নীতি, এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ জ্বালানি রূপান্তর নীতি-২০২৪ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এ লক্ষ্যে জনসচেতনতা তৈরির অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
বুধবার (২০ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত এ সভায় বক্তারা বলেন, লুণ্ঠনমূলক ব্যয়, অযৌক্তিক মুনাফা, বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতিই বাংলাদেশের জ্বালানি খাত উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। ক্যাব প্রস্তাবিত নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন হলে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণ-নিয়ন্ত্রিত জ্বালানি খাত গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
আলোচনাসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শতাধিক শিক্ষার্থী ক্যাব প্রস্তাবিত নীতিমালার আলোকে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। নাজিফা তাজনুর উপস্থাপন করেন জ্বালানি সরবরাহে লুন্ঠনমূলক ব্যয় ও লুন্ঠনমূলক মুনাফা প্রবন্ধটি। সাবাত মোস্তফা প্রথুন উপস্থাপন করেন মূল্যহার নির্ধারণে ভোক্তা ও বিইআরসি। অরিত্র রোদ্দুর ধর উপস্থাপন করেন জ্বালানি নিরাপত্তা সংরক্ষণে বিনিয়োগ ও মূল্যহার। মেহবুবা আফরোজ বলেন জ্বালানি খাত উন্নয়নে সুবিচার সংকট। মো. সাদমান সাকিব উপস্থাপন করেন জ্বালানি ইউটিলিটি সমূহের সেবানীতি ও পরিচালনা পদ্ধতি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিল (বিইপিআরসি)-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন এনডিসি। তিনি বলেন, আমরা যখন জ্বালানির অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভর্তুকি দিই, দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রেই প্রান্তিক মানুষ সুবিধা পায় না। সুবিধাবাদীরাই তা ভোগ করে নেয়। জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে নাগরিক সমাজকে সবসময় সজাগ থাকতে হবে। কারণ জনগণ কোনো কিছু চাইলে সরকার বাধ্য হয় তা করতে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি খাতের অবিচার দূর করতে ক্যাব ইতিমধ্যেই হাইকোর্টে অন্তত ১৫টি মামলা করেছে। লুণ্ঠনকারীরা অত্যন্ত ক্ষমতাধর হলেও আমরা তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। তরুণ শিক্ষার্থীরাও যদি এ আন্দোলনে যুক্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরে জনস্বার্থ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
আলোচনা সভায় ইউজিসির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিমউদ্দীন খান বলেন, আমাদের জ্বালানি কাঠামো ফসিল ফুয়েল নির্ভর এবং বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। এই নিয়ন্ত্রণ ভাঙা না গেলে জ্বালানি নিরাপত্তা আসবে না। দেশীয় ও বিদেশি গোষ্ঠীর মিলে তৈরি করা লুণ্ঠনমূলক ব্যয় দূরীকরণে এখনো সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। দুর্নীতি ও লুণ্ঠনকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
সভাপতির বক্তব্যে ক্যাবের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মঞ্জুর-ই-খোদা তরফদার বলেন, গোটা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশও জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। তবে এ রূপান্তর হতে হবে ভোক্তাবান্ধব, সাশ্রয়ী, অর্থবহ এবং পরিবেশ সুরক্ষাকারী। আমাদের কাংখিত লক্ষ্য হলো জনগণকেন্দ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বড় অন্তরায় হলো লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও অযৌক্তিক মুনাফা অর্জনের কাঠামো। এটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং নৈতিকতা ও ন্যায্যতারও প্রশ্ন। এ খাতের দুর্নীতি দূর না হলে প্যারিস চুক্তি ২০১৫ অনুযায়ী পরিবেশবান্ধব জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও অসম্ভব হয়ে পড়বে। ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতি-২০২৪-এ উল্লেখ করা হয়েছে, জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক নয়, সেবা খাত হিসেবে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় পুনর্বহাল করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-কে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আলোচনায় আরও বলা হয়, জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণের দায়িত্বে থাকা বিইআরসি বর্তমানে সীমিত জনসম্পৃক্ততায় পরিচালিত হচ্ছে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ। যদি কমিশনের কাঠামোতে সংস্কার এনে ভোক্তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে জ্বালানি খাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় শুধু অবকাঠামোগত বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়। দরকার সুবিচারভিত্তিক ট্যারিফ, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, দুর্নীতি দমন ও স্বচ্ছতা। অন্যথায় বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।
প্রস্তাবিত নীতিতে বিচার বিভাগকে জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বক্তারা বলেন, জ্বালানি অধিকার রক্ষা ও আইনগত সুরক্ষার জন্য বিচার বিভাগ, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সংস্কার এখন সময়ের দাবি। বক্তাদের মতে, ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতি-২০২৪ বাস্তবায়িত হলে দেশ একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে। আর এ প্রক্রিয়ায় তরুণ শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা হলে ভবিষ্যৎ জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।