শিল্প ও বাণিজ্য
আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৫ এএম
ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্কারোপের কারণে দেশটির সরবরাহকারীদের দেওয়া তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ স্থগিত করতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় খুচরা বিক্রেতা ব্র্যান্ড। ফলে পোশাক রপ্তানিতে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে দেশটি। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিধি বিস্তৃতির নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের কারখানাগুলোয় তৈরি পোশাকের বাড়তি ক্রয়াদেশ দিতে দরকষাকষি করছে অনেক মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইতোমধ্যে চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছে এবং ভারতীয় অনেক কোম্পানি বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চাইছে।
এ ছাড়া চীনা কোম্পানি হান্ডা (বাংলাদেশ) গার্মেন্টস কোম্পানি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে তৈরি পোশাক কারখানা স্থাপনের জন্য প্রায় চার কোটি ডলারের বিনিয়োগ করবে। এজন্য গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) সঙ্গে জমি ইজার চুক্তি করেছে হান্ডা।
এ বিষয়ে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘চীনা বিনিয়োগ আসা খুবই ইতিবাচক। কারণ তারা বিনিয়োগ করার পাশাপাশি ক্রেতাও নিয়ে আসবে। তাতে আমাদের রপ্তানি বাড়বে। প্রতিযোগী দেশের তুলনায় শুল্ক কম হওয়ায় আমরা সুবিধাজনক অবস্থান রয়েছি। তবে বাড়তি ক্রয়াদেশ নিতে হলে ব্যাংকের সহযোগিতা, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ ও কাস্টমসের সহযোগিতা লাগবে।’
জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ৩৪টি চীনা বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে বিনিয়োগ প্রস্তাব পেয়েছে বেপজা। গত জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত আটটি চীনা প্রতিষ্ঠান শিল্প স্থাপনের লক্ষ্যে বেপজার সঙ্গে চুক্তি করেছে। তাদের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ১৫ কোটি ডলার। এসব কোম্পানি তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ব্যাগ, হালকা প্রকৌশল পণ্য ইত্যাদি উৎপাদন করবে।
প্রতিযোগী দেশের তুলনায় আরও বেশি ক্রয়াদেশ পাওয়ার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এখনই পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ ব্যবসায়ীদের। সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে নানামুখী সংকটে এ সুযোগ হাতছাড়ার শঙ্কাও রয়েছে তাদের।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘যেসব মার্কিন ক্রেতা ভারতে কাজ করে, তবে বাংলাদেশে করে না, সেসব ক্রেতার ক্রয়াদেশ নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কারণ নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড তার মোট উৎপাদনের নির্দিষ্ট অংশ একটি দেশে উৎপাদন করে। ফলে সাময়িকভাবে ক্রয়াদেশ এলেও ভবিষ্যতে না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
উচ্চ শুল্কের কারণে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৩০-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ কারণে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রয়াদেশ ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তাতে কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতির শঙ্কা করছেন ভারতের রপ্তানিকারকেরা। ভারতের ওয়েলস্পান লিভিং, গোকলদাস এক্সপোর্টস, ইন্দো কাউন্ট ও ট্রাইডেন্টের মতো বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের মোট রপ্তানির ৪০-৭০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে করে থাকে। ভারতের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রের সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ বাজারে ভারত চতুর্থ শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। গত বছর ভারত ৪৬৯ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। এ বাজারে ভারতের মূল প্রতিযোগী দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম। ফলে উচ্চ শুল্কের কারণে ভারত থেকে স্থানান্তরিত ক্রয়াদেশ এই দেশ দুটিতে যেতে পারে। তার কারণ, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের ওপর ২০ শতাংশ করে পাল্টা শুল্ক বসিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের ওপর যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন, যার মধ্যে গত ৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে ২৫ শতাংশ। বাকি ২৫ শতাংশ ২৮ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে।
বাংলাদেশি তৈরি পোশাক রপ্তানিতে একক বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, মার্কিন ক্রেতাসহ আগের স্থগিত হওয়া ক্রয়াদেশও ফিরতে শুরু করেছে। এতে অগ্রাধিকার পাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে যারা মার্কিন ক্রেতাদের কাজ করছেন।
ভারত ও চীনে উচ্চ শুল্কের কারণে ক্রয়াদেশ সরিয়ে আনতে চায় এসব ক্রেতা। অন্যদিকে মার্কিন ক্রয়াদেশ ধরে রাখার কৌশল হিসেবে ভারতের বড় রপ্তানিকারকেরা তৈরি পোশাক উৎপাদনে বাংলাদেশের শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘লো ভেল্যু গার্মেন্টস সেগমেন্ট থেকে তারা এক্সিট করে যাচ্ছে। যেখানে ১ বা ২ শতাংশ দাম বৃদ্ধি পেলে ব্যবসার ক্ষতি হয় সেখান থেকে তারা কিন্তু সরে আসবে এবং সরে আসার ক্ষেত্রে যে দেশগুলোতে তারা যেতে পারে তার সর্বাগ্রে আছে বাংলাদেশ।’