সাক্ষাৎকারে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি
আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৫ ২২:২৯ পিএম
বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ঋণ দেওয়া হতো। ফলে বেড়েছে খেলাপির পরিমাণ, যা এখন ব্যাংক খাতের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই খেলাপি কমানোর জন্য অগ্রণী ব্যাংকের বোর্ড থেকে শুরু করে সর্বস্তরের কর্মীরা কাজের মাধ্যমে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা জানিয়েছেন অগ্রণী ব্যাংকের এমডি ও সিইও মো. আনোয়ারুল ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রশ্ন : অগ্রণী ব্যাংক কি আবার আগের রূপে ফিরতে পারবে?
উত্তর : আমরা অগ্রণী ব্যাংককে শীর্ষ ব্যাংক হিসেবে দেখতে
চাই। যেহেতু অগ্রণী ব্যাংক দেশ সৃষ্টির আগের হাবিব ব্যাংক ও কমার্স ব্যাংকের সমন্বয়ে
গঠিত। তখন হাবিব ব্যাংকের বেশ সুনাম ছিল। হাবিব ব্যাংক যেভাবে গ্রাহকদের মূল্যায়ন করতÑ
আমরা সেভাবে করতে চাই। কারণ হাবিব ব্যাংক ঐতিহ্যবাহী একটা ব্যাংক ছিল। এ ব্যাংকে গ্রাহক
সংখ্যাও অন্যান্য ব্যাংক থেকে বেশি ছিল। অগ্রণী ব্যাংক ইতোমধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছেÑ বিশেষ
করে ৫ আগস্টের পর। এর আগে ১৫ বছর ধরে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।
খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য অগ্রণী ব্যাংকের সকল স্তরের মানুষ কাজ করছে। যারা এর সঙ্গে জড়িত,
তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং অগ্রণী ব্যাংক খেলাপি আদায়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিচ্ছে।
তাছাড়া ঋণ আদায়ের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের চাপ আছে। ঋণ ক্ল্যাসিফিকেশন কমাতে হবে।
ঋণ ক্ল্যাসিফিকেশন মিনিমান লেভেলে আনতে হবে। যেন আইএমএফের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি বা
উদ্বেগ না থাকে।
প্রশ্ন: এর ফলে গ্রাহক কিংবা উদ্যোক্তারা কী সুবিধা পাবেন?
উত্তর : উদ্যোক্তাদের ব্যাংক থেকে সুবিধা পাওয়ার কথা।
কোভিডকালীন যে সুবিধা সরকার থেকে দেওয়া হয়েছিল, সেটা আমরা দিয়েছি। এক্সপোর্টের ক্ষেত্রে
সরকার থেকে যে ইনসেনটিভ পায় তা দেওয়া হয়। তাছাড়া প্রবাসীদেরও যে ইনসেনটিভ পাওয়ার কথাÑ
তা-ও দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক থেকে যত প্রকার উদ্যোক্তাদের আগ্রহী করার জন্য সুযোগ-সুবিধা
দেওয়া প্রয়োজন বা সরকার কর্তৃক নির্ধারিতÑ তার সবই দেওয়া হচ্ছে। মানে প্রোপারলি ডিস্ট্রিবিউশন
করা হচ্ছে। আমরা ধারণা করছি, তারা অগ্রণী ব্যাংকের প্রতি সন্তুষ্ট।
প্রশ্ন : নতুন গ্রাহক টানতে কী ধরনের উদ্ভাবনী পণ্যে গুরুত্ব দিচ্ছেন?
উত্তর : আমরা নতুন গ্রাহক টানতে মূলত সিএসএমই খাতে বেশি
উৎসাহিত করছি। কারণ আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে, বড় ঋণ দিলে ঋণের সদ্ব্যবহার
হয় না। ঋণের অপব্যবহারের মাত্রাই বেশি। যে কারণে ক্ষুদ্র ঋণ দিলে ঋণ সঠিক ইউটিলাইজ
হয়, যা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এটা প্রমাণিত বিষয়। আমরা গ্রামে দেখেছি
সিএসএমই খাতের ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের জীবনধারার পরিবর্তন হয়েছে। এজন্য আমরা মনে
করি, এ খাতটাকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। এজন্য এ খাতে ঋণের প্রবাহ অবারিত রেখেছি এবং তা-ও
বিতরণ করে যাচ্ছি। এতে আমাদের কোনো টার্গেট নেই। এ খাতে আমরা ঋণ দিয়েই যাব। টোটাল টার্গেটের
৬০ শতাংশ ঋণ দেওয়ার কথা এই খাতে। সে লক্ষ্যে আমরা এগোচ্ছি।
প্রশ্ন : বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অগ্রণী ব্যাংকের সামর্থ্য-দুর্বলতাকে
ব্যাখ্যা করবেন?
উত্তর : বেসরকারি ব্যাংককে একসময় আমরা খুব বেশি আমলে
রাখতাম না। সম্প্রতি প্রাইভেট ব্যাংকের সরকারি ব্যাংক থেকে পজিশন অনেক ভালো। কিন্তু
প্রাইভেট ব্যাংক লিমিটেড সার্ভিস। কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তারা সার্ভিস দিয়ে থাকে।
কিন্তু সরকারি ব্যাংকগুলোর এমন কোনো কাজ নেই যা তাদের দ্বারা সংগঠিত হয় না। যেমন দুস্থ
ভাতা, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, নারী অগ্রণী, নারীদের স্বাবলম্বী করার ঋণ এবং কুটির
শিল্প ঋণÑ সব ক্ষেত্রে ঋণ দিয়ে থাকে সরকারি ব্যাংক। সোশ্যাল সেফটি খাতে যে বিষয়গুলো
পড়ে, সেগুলো বেসরকারি ব্যাংক করে না। তারা তো করপোরেট কাস্টমার নিয়েই ডিল করে। কিন্তু
আমরা তো সব শ্রেণির কাস্টমার নিয়ে ডিল করি। যেমন কৃষক, কামার-কুমার থেকে শুরু করে বড়
শিল্পপতি পর্যন্ত ঋণসুবিধা দিয়ে থাকি। বেসরকারি ব্যাংক তো আর সমাজের নিম্ন স্তরে যারা
বসবাস করে তারা কোনো সুযোগ-সুবিধা পায় না। সেখানে তারা যেতেও পারে না, তাই তারা সে
কাজও করে না। আমরা তো তাদের নিয়ে কাজ করে থাকি।
প্রশ্ন: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক রেমিট্যান্স আহরণে
শীর্ষে। এটা কীভাবে সম্ভব?
উত্তর : অনেকদিন ধরেই রাষ্ট্রাত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে
রেমিট্যান্স আহরণে আমরা শীর্ষস্থানে আছি। আমাদের ৯৭৯টা শাখায় ইন্সট্রাকশন দেওয়া আছে
যাতে কোনো কাস্টমার বিড়ম্বনা-হয়রানির মুখোমুখি না হন। আমার শাখা ফিল্ড লেভেলে বেশি।
৪৫০ শাখা শহরে, আর বাকি ৫০০-এর ওপরে শাখা গ্রামে। যারা রেমিট্যান্স পাঠান, তারা বেশিরভাগই
গ্রামের। গ্রামগঞ্জে যারা থাকেন, তারাই বেশি বিদেশে যায় কাজ করার জন্য। যে কারণে আমাদের
রেমিট্যান্স বেশি আসে। তাছাড়া আমাদের রেমিট্যান্স আনার সার্ভিস অনেক ভালো। মালয়েশিয়া,
সিঙ্গাপুরে এক্সচেঞ্জ হাউস আছে। সেখানে আমাদের একটায় ৫টা শাখা আছে, আরেকটায় ৬টা। তাদের
কাজ রেমিট্যান্স সংগ্রহ করা ও পাঠানো। আমাদের ৮৬টা এজেন্সি অ্যারেজমেন্ট আছে। যেমন
সৌদিতে আমাদের শাখা নেই, কিন্তু এজেন্সি অ্যারেজমেন্ট আছে। আবুধাবি, দুবাই, ইতালি,
যক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রোলিয়াসহ প্রায় সব দেশেই এজেন্সি অ্যারেজমেন্ট আছে। এই এজেন্সির
মাধ্যমে আমাদের রেমিট্যান্স আসে। যে কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ অন্যান্য সরকারি ব্যাংক
থেকে সর্বোচ্চ এবং ৬১টা ব্যাংকের মধ্যে আমাদের অবস্থান দ্বিতীয়।
প্রশ্ন : প্রবাসীদের আপনারা কোনো সুযোগ-সুবিধা প্রদান বা নার্সিং
করেন কি না?
উত্তর : প্রবাসীদের নার্সিং বলতে আমরা ইনসেনটিভ দিয়ে
থাকি। এবার সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলাম। সেখানে আমরা টি-শার্ট ও ইনসেনটিভসহ কিছু প্রণোদনামূলক
গিফট আইটেম দিয়েছিলাম। যারা রেমিট্যান্স প্রেরণ করে থাকেন, তাদের সেভাবে মূল্যায়নও
করা হয়। তাদের আমরা সম্মানের সঙ্গে দেখি।
প্রশ্ন : ব্যাংক খাতে তারল্য সংকটের কথা শোনা যায়, এক্ষেত্রে অগ্রণী
ব্যাংকের পরিস্থিতি কেমন?
উত্তর : অগ্রণী ব্যাংকে তারল্য সংকট ছিল বলে আমার মনে
পড়ে না। গত বছরের ৫ আগস্টের পর কখনও তারল্য সংকট দেখিনি। আমি এই দায়িত্বে এসেছি ৩ নভেম্বর।
তবে এই ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। কখনও কোনো তারল্য সংকট দেখিনি। আমাদের ১১টা
সার্কেল আছে বিভাগীয় শহরে। খবর নিয়ে দেখেছি, তাদের কাছ থেকে তারল্য সংকটের কোনো সংবাদ
পাইনি। আমাদের তারল্য সংকট নেই।
প্রশ্ন : অগ্রণী ব্যাংকে দুর্নীতি বা স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে
সেটা কীভাবে দেখা হয়?
উত্তর : অগ্রণী ব্যাংকে যদি স্বচ্ছতার অভাব দেখা যায়,
সেক্ষেত্রে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে থাকি। অত্যন্ত ক্লিয়ারভাবে বলতে চাই।
ব্যাংক হলো একটা বিশ্বস্ততার জায়গা। বিশ্বস্ততা যদি না থাকে তাহলে মানুষ কোন আশায় আমাদের
এখানে টাকা জমা রাখবে। আরও তো অনেক ব্যাংক আছে। ৬১টা ব্যাংক আছে, সেখানে না রেখে অগ্রণী
ব্যাংকে কেন রাখবে? নিরাপত্তার হুমকি দেখা দিলে আস্থা হারিয়ে যাবে। আর ব্যাংক পুরোটাই
আস্থা এবং বিশ্বাসের জায়গা। আমাদের ওপর আস্থা আছে বলেই ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার ডিপোজিট
এসেছে। তার মধ্য থেকে আমরা ৭৯ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। এখান থেকে যে লাভ আসে,
সেটা দিয়েই তো ব্যাংক চলে। সরকার আমাকে দিয়েছে ২ হাজার ৭২ কোটি টাকা। বাদবাকি সবই পাবলিক
ফান্ডÑ মানে গ্রাহকের টাকা, জনগণের টাকা। তাদের টাকা নিয়ে আমরা ব্যবসা করি। কাজেই এখানে
নিরাপত্তা যদি না দিতে পারি, তাহলে আমার দায়িত্ব পালন করা হবে না। ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত
হবে। আমরা কখনও চাই না এবং চাইবও না। স্বচ্ছতার নীতি আমাদের আছে। দুর্নীতির ক্ষেত্রে
আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে আছি।
প্রশ্ন : আগামী পাঁচ বছরে অগ্রণী ব্যাংককে কোথায় দেখতে চান?