প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৫ ২০:৫৪ পিএম
নিষিদ্ধ কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে দেশে খাদ্য সংরক্ষণ, কৃষিপণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্যে ২০২১ সালে ‘পেস্টিসাইড রিস্ক রিডাকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প নেয় বিগত সরকার। শুরুতে প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৭০ কোটি ৯ হাজার টাকা। তবে দুই দফায় খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১ কোটি ৫৬ লাখ টাকায়। কিন্তু ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা এবং বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
সম্প্রতি কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের বিশেষ প্রকল্প
মূল্যায়ন কমিটি (এসপিইসি) সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন
সচিব ড. নেয়ামত উল্ল্যা ভূঁইয়া। সেখানে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির খাতও খতিয়ে দেখা হয়।
বিশেষ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরামর্শক খাতে দ্বিতীয় সংশোধনে ব্যয়ের অঙ্ক উল্লেখের
প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হলেও মাঠপর্যায়ের অফিস
পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ২৪ মাস বাড়িয়ে মোট ৫৭ মাসে উন্নীত করা হয়েছে। এ বিষয়ে
বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। একই সঙ্গে পরামর্শক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির
অঙ্কও সন্দেহজনক বলে উল্লেখ করা হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পরামর্শক
খাতে ব্যয় বেড়েছে ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা ব্যয় বৃদ্ধির ১০২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। তবে পরিকল্পনা
কমিশনের মতে এটি বাস্তবসম্মত নয়। কমিশন পরামর্শ দিয়েছে, যেহেতু প্রকল্প প্রায় সমাপ্তির
পথে, তাই পরামর্শক খাতে বরাদ্দ কমিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ, বিপজ্জনক কীটনাশক ব্যবস্থাপনা,
পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের মতো খাতে অর্থ ব্যয় করা যেতে
পারে।
তথ্য অনুযায়ী, মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিজ কনসালট্যান্ট,
ন্যাশনাল গ্রুপ প্রোডাকশন স্পেশালিস্ট, কমিউনিকেশন অ্যান্ড লার্নিং এক্সপার্ট, ন্যাশনাল
এমঅ্যান্ডই অ্যান্ড রিপোর্টিং অফিসার ও ন্যাশনাল প্রকিউরমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্টের জনমাস
১২ মাসের বেশি বাড়ানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, এই অতিরিক্ত সময়ের যৌক্তিকতা এবং
প্রত্যেক অঙ্গের জন্য জনবল ও সময়সীমার বিস্তারিত হিসাব উপস্থাপন জরুরি।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে পরিবেশ অধিদপ্তর। গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট
ফ্যাসিলিটির অর্থায়ন এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার কারিগরি সহায়তায় সারা দেশে
কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। শুরুতে মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত, যা দুই দফায় বাড়িয়ে
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। খরচও একইভাবে লাফিয়ে বেড়েছে ৭০ কোটি থেকে ৮১
কোটি টাকায়।
উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম সাব-ডিপোতে
দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা ৫০০ টন নিষিদ্ধ ডিডিটি কীটনাশক আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী
প্যাকেজিং, পরিবহন, জাহাজীকরণ ও নিষ্ক্রিয়করণের মাধ্যমে নিরাপদে অপসারণ করা। পাশাপাশি
খাদ্য সংরক্ষণ, কৃষি উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে নিষিদ্ধ কীটনাশকের বিকল্প ব্যবস্থা
গড়ে তোলা।
এ ছাড়া প্রকল্পে গবেষণাগার আধুনিকায়ন, শুঁটকি উৎপাদনে জৈব পেস্টিসাইড
ব্যবহার নিশ্চিত, কীটনাশকের খালি বোতল পুনর্ব্যবহার ও ধ্বংসের আইনগত কাঠামো শক্তিশালী
করা এবং পয়জন সার্ভিল্যান্স কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে অগ্রগতি তুলনামূলক ধীর। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের
বাস্তব অগ্রগতি ৬৪ শতাংশ, ব্যয় হয়েছে ৪৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৫৮ দশমিক
৫১ শতাংশ। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা, কিন্তু সেপ্টেম্বর
পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৬ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের মাত্র ১০ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মেয়াদ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ডলারের
দামের পরিবর্তনের ফলে বাড়তি অর্থ পাওয়া যাচ্ছে, যা দিয়ে অতিরিক্ত কার্যক্রম হাতে নেওয়া
হয়েছে। চারটি গবেষণাগার স্থাপন, জনবল প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং পাঁচটি ‘লেটার
অব অ্যাগ্রিমেন্ট’ বাস্তবায়ন শেষ করতেই সময় বাড়ানোর দাবি করা হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, ডিডিটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির
কারণ। খাদ্য, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করলে ক্যানসার, প্রজনন অক্ষমতা
এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ে। ২০০১ সালে বাংলাদেশ স্টকহোম কনভেনশন অন
পারসিস্ট্যান্ট অর্গানিক পলুট্যান্টসে স্বাক্ষর করার পর থেকে সরকার এই রাসায়নিক অপসারণের
প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কিন্তু ব্যয় ও সময়সীমা যেভাবে বাড়ছে, তাতে প্রকল্পের গতি নিয়ে প্রশ্ন
থেকেই যাচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ব্যয়ের গতি লাফিয়ে বাড়লেও কাজের
অগ্রগতি সেই হারে এগোচ্ছে না।