ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি
আরমান হেকিম
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ১৩:৫৭ পিএম
আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ১৪:০১ পিএম
ফাইল ফটো
অর্থনৈতিক বঞ্চনা থেকে তারুণ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। এর পেছনে অন্যতম কারণ ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি। অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক বঞ্চনার শিকার হয়ে শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বহু দেশেই শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটেছে। যেমনÑ ১৮ শতকের ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লব, ১৯ শতকের ইউরোপে শিল্প বিপ্লব-পরবর্তী শ্রমিক আন্দোলন কিংবা আরব বসন্ত। বেকারত্ব, দুর্নীতি ও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় ছিল এসব বিপ্লবের নেপথ্যের কারণ।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও বেকারত্বকেই ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লবের মূল কারণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘গত বছরের ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লবের প্রধান কারণ ছিল বেকারত্ব। আমরা এটি নিয়ে কাজ করছি। আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ৬৩ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের কম। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগাতে হবে।’
জানতে চাইলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি প্রফেসরিয়াল ফেলো ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহও একই সুরে বলেন, ‘সাধারণত একটি সরকারের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে আন্দোলন শুরু হয় অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের কারণে। তবে অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটা খুব দ্রুত সামাজিক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দাবিতে পরিণত হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি এই আন্দোলনের আগে গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ একটি চ্যালেঞ্জিং সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে। এই সময়ে মানুষের রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। এর বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধনী ও গরিবের আয় বৈষম্য বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে সুযোগের অভাব, লাগামহীন দুর্নীতি ও সীমাহীন লুটপাটের মধ্যে। এসব কিছুর প্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া মানুষের সম্মিলিত ক্ষোভের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হলো এবারের ছাত্র-জনতার বিপ্লব। এই বিপ্লব সমাজ ও রাজনীতির পরিবর্তনের দাবির পাশাপাশি গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে।’
অর্থনৈতিক চাপে বিধ্বস্ত ছিল জনজীবন
২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে থাকে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১ সালের প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৩ সালের শেষ দিকে নেমে আসে ২০ বিলিয়নের নিচে। ফলে ডলারের বিনিময় হার দ্রুত বাড়তে থাকে, টাকার অবমূল্যায়ন ঘটে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় এবং কাঁচামাল, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, অভ্যুত্থানের আগের ১৮ মাস ধরে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ১২ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করে। একই সময়ে সাধারণ মুদ্রাস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে থাকে। চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, ডিম, সবজি থেকে শুরু করে লবণ-প্রতিটি পণ্যের দাম ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছে যায়। নগরের নিম্নমধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী পরিবারগুলো মাসের মাঝেই খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছিল।
বৈশ্বিক মন্দা, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ডলার ঘাটতি এবং জ্বালানি সংকট উৎপাদন ব্যাহত করে। খাবি খাচ্ছিল দেশের রপ্তানির বড় খাত পোশাক শিল্প। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্থপ্রদানে বিলম্ব ও নতুন অর্ডার হ্রাস পাওয়ায় কারখানাগুলোতে নতুন নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। উচ্চশিক্ষিত তরুণেরা চাকরি না পেয়ে দীর্ঘদিন বেকার থাকেন। যুব বেকারত্বের হার ১৬ শতাংশে পৌঁছায়, যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে, গ্রামাঞ্চলে বেকারত্বের হার বেশি, যা শহরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই বেকারত্বের হার দেশের অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রবাসী আয়ের বাস্তবতা
প্রবাসী আয়ে ওঠানামা গ্রামীণ অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীলতা দিলেও মুদ্রাস্ফীতির কারণে সেই আয়ের প্রকৃত মূল্য কমে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রেমিট্যান্স আয় আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেড়েছিল, কিন্তু একই সময়ে খাদ্য ও জ্বালানির দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ায় গ্রামের মানুষের হাতে অবশিষ্ট অর্থ কমে যায়। কৃষি খাতেও চাপ বাড়ে। সারের দাম ২০২৩ সালে দুই দফা বাড়ানো হয়, বীজ ও কীটনাশকের দামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে সেচ ব্যয় বেড়ে যায়, যা ধান ও সবজির উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। কৃষকের লাভ কমে গিয়ে অনেকেই উৎপাদন কমিয়ে দেন।
অর্থ পাচার ও পরিসংখানে কারসাজি
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়। সেই হিসাবে গত ১৫ বছরে পাচার হয়েছে ২৪০ বিলিয়ন বা দুই লাখ ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘বিগত সময়ে স্বপ্ন দেখিয়ে রূপকল্প ঘোষণা করেছিল শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার। নানা কথামালার ফুলঝুরি আর পরিসংখ্যান জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থনীতির নানা সূচককে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করবেÑ এমন প্রচার-প্রোপাগান্ডা ছিল তুঙ্গে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু হাসিনার সরকার অপ্রয়োজনীয় নানা প্রকল্পে উদারহস্তে ঋণগ্রহণ করে ১০৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণের ভার এ দেশের সাধারণ জনগণের কাঁধে চাপিয়ে গেছে।
অন্যদিকে অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থনীতির সমৃদ্ধি নিয়ে যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল ছিল না। সোনালি দিনের কথা বলে মিথ্যাচার করা হয়েছে। তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে প্রবৃদ্ধি বেশি দেখানো হয়েছিল। ব্যাংক খাত দুর্দশায় নিপতিত হয়েছিল। যখনই সংকটের মাত্রা বেড়েছে, তখনই মিথ্যাচার করে সংকটকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বৈদেশিক ঋণ ও অর্থ পাচারের ফলে বিগত হাসিনার শাসনামলে দেশের অর্থনীতি দেউলিয়া হওয়ার দিকে যাচ্ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সহিংসতা ও তাৎক্ষণিক ক্ষতি
অভ্যুত্থানের সময়কার সহিংসতা ও দমন অভিযান অর্থনীতিতে নতুন করে ধাক্কা দেয়। দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়, কারফিউ জারি হয় এবং সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। বিজিএমইএর হিসাবে, রপ্তানি বিলম্ব ও বাতিল অর্ডারের কারণে তৈরি পোশাক শিল্পে দৈনিক গড়ে ১৫ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। সড়ক অবরোধ ও পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় কৃষি পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারেনি। ফল, সবজি ও দুগ্ধপণ্যের বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়, যার ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা।
দেশের জুলাই অভ্যুত্থান অর্থনৈতিক চাপ থেকে জন্ম নেওয়া আন্দোলনের একটি উদাহরণ হলেও ইতিহাসে এমন আরও ঘটনা রয়েছে। ১৮৩০ সালের ফ্রান্সের জুলাই বিপ্লবে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ও রাজতান্ত্রিক দমননীতি প্যারিসে তিন দিনের গণঅভ্যুত্থান ডেকে আনে। ইউরোপে শিল্প বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কম মজুরি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ শ্রমিকদের বিদ্রোহে প্ররোচিত করে। রাশিয়ার ১৯০৫ সালের বিপ্লবে অর্থনৈতিক কষ্ট ও খাদ্যসংকটের সঙ্গে রাজনৈতিক দমননীতি মিলে শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ গড়ে ওঠে। সাম্প্রতিক আরব বসন্তে বেকারত্ব, দুর্নীতি ও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে শাসন পরিবর্তনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালায়। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বেকারত্ব যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন তা রাজনৈতিক আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গে রূপ নেয়, যেমনটি বাংলাদেশে ঘটেছে।
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। কিন্তু এই আন্দোলনে দ্রুত যোগ দেয় বেকার তরুণ, কম আয়ের চাকরিজীবী, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কোটা ইস্যুটি হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক ক্ষোভ প্রকাশের প্লাটফর্ম। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীর বাজারে ব্যবসায়ীরা জানান, তখন বিক্রি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় ও পরিবহন ভাড়ার চাপ বাড়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো খরচ মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছিল।
রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ভোগান্তি মানুষের ক্ষোভকে আরও উস্কে দেয়। ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন দ্রুত দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সরকার পতনের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের অঙ্গীকার করলেও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও কর্মসংস্থান সংকট এখনও কাটেনি।
প্রবৃদ্ধি হ্রাস ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অভ্যুত্থানের আগে সতর্ক করেছিল, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতিগত সংস্কারের বিলম্বে প্রবৃদ্ধি ৫.৭ শতাংশ থেকে কমে ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বাস্তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি এক শতাংশে এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ৪ শতাংশে নেমে আসে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশের কাছাকাছি এবং সাধারণ মুদ্রাস্ফীতি ১১ শতাংশের ওপরে ছিল। যুব বেকারত্ব কমানোর উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়।