অরুপ রতন, বগুড়া
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৫ ১০:০৯ এএম
দেশে মসলার চাহিদা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে মসলার চাষ। দেশে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার মসলা আমদানি হয়। সেই আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে মসলার উৎপাদন বাড়াতে বগুড়া জেলার শিবগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয় মসলা গবেষণা কেন্দ্র। দেশের এই মসলা গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণা ফল মাঠে প্রয়োগের মাধ্যমে মসলা চাষে ঘটছে নীরব বিপ্লব। সেই সঙ্গে খুলে দিয়েছে কৃষি অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।
বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মসলা উৎপাদনের উর্বর ক্ষেত্র বাংলাদেশ। এ সম্ভাবনা কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলে দেশ মসলা উৎপাদনে স্বনির্ভর হতে পারে। এতে আর্থিকভাবে ভোক্তা, কৃষক উভয়ই লাভবান হবে বলেও তারা মনে করেন।
দেশে মসলার আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, মসলার উৎপাদন বৃদ্ধি, জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও সংরক্ষণ তথা মসলাজাতীয় ফসলের গবেষণা জোরদারকরণের লক্ষ্যে সরকার ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অধীনে এই মসলা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করে। এর পরের বছর থেকেই চালু হয় পূর্ণাঙ্গ গবেষণা কার্যক্রম। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৮ কিমি উত্তরে ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের পাশে শিবগঞ্জ উপজেলার রায়নগর ইউনিয়নে ২৭ দশমিক ৬৯ হেক্টর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত দেশের একমাত্র মসলা গবেষণা কেন্দ্রটি।
জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে মসলা গবেষণা কেন্দ্রে প্রায় ৪৭টি দেশি-বিদেশি মসলা ফসলের ওপর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। মসলা গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক ২৭টি মসলাজাতীয় ফসলের ওপর এ পর্যন্ত সর্বমোট ৫৭টি জাত এবং বিভিন্ন ধরনের টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পেঁয়াজের ৭টি জাত, মরিচ, রসুন, আদা, হলুদ, ধনিয়া, কালোজিরা, মেথি, মৌরি, ফিরিঙ্গি, দারুচিনি, চুইঝাল, আলুবোখারা, লবঙ্গসহ আরও অনেক মূল্যবান মসলা।
প্রথমবারের মতো দেশে ভেনিলা চাষেও সফলতা এসেছে এখানেই। বস্তায় আদা চাষ, বাণিজ্যিকভাবে জাফরান, কালো এলাচ, গোলমরিচ উৎপাদনের সম্ভাবনাও জাগিয়ে তুলেছে কেন্দ্রটি। আরও যেসব মসলা নিয়ে গবেষণা চলছে তার মধ্যে রয়েছেÑ লেমনগ্রাস, একাঙ্গী, পোলাও পাতা, অলস্পাইস, চিভস, কাবাবচিনি, পেস্তা, জয়ফল, আমআদা, পানবিলাস, কারিপাতা প্রভৃতি।
শুধু জাত উদ্ভাবনই নয়, মাঠপর্যায়ে চাষ সহজ করতে আধুনিক প্রযুক্তিও উদ্ভাবন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন পর্যন্ত ১৫৬টি উন্নত কৃষি প্রযুক্তি তারা তৈরি করেছে। যার মধ্যে আছেÑ উৎপাদন কৌশল, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, পানি ব্যবস্থাপনা, পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন, পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণ (পোস্ট হারভেস্ট) প্রযুক্তি। পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, আদা ও রসুনের গুঁড়া তৈরির প্রযুক্তিও এখান থেকেই এসেছে।
অত্র কেন্দ্রের গবেষণা ফলাফল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কৃষকের হাতে উন্নত জাত পৌঁছে দিয়ে, আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করে এবং বীজ থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পরামর্শ দিয়ে দেশের একমাত্র এই প্রতিষ্ঠান মসলার জগতে এনেছে বড় পরিবর্তন।
একসময় দেশে বছরে ৩ লাখ মেট্রিক টনের মতো মসলার উৎপাদন হতো। জমি ছিল মাত্র দেড় লাখ হেক্টরের মতো। এখন দেশে বছরে উৎপাদন হচ্ছে ৫১ লাখ টনের বেশি, আর জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ হেক্টরে। উৎপাদনের এই পরিবর্তনের পেছনেও বড় অবদান রেখেছে মসলা গবেষণা কেন্দ্র।
শিবগঞ্জের কৃষক রেজাউল করিম বলেন, ‘গবেষণা কেন্দ্র থেকে সহজে উন্নত মানের বীজ পাচ্ছি। সেই বীজ মাঠে লাগিয়ে ভালো ফলন আসছে। এখন আমরা নিজেরাও বীজ সংরক্ষণ করি, ছড়িয়ে দিই।’
কৃষি উদ্যোক্তা সামিউল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর জিরা চাষে ভালো ফলন হয়েছিল। নিজের জন্য বীজ রেখে আশপাশের কৃষকদেরও দিয়েছি। এখন তারা আগ্রহ নিয়ে চাষ করছে।’
গবেষণা কেন্দ্রের সরেজমিন গবেষণা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. মাহমুদুল হাসান সুজা বলেন, ‘আমরা শুধু বীজ দিয়ে থেমে থাকি না। সার, কীটনাশক, চাষ পদ্ধতিÑ সব বিষয়ে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। তারা যেন নিজেরাই আত্মনির্ভর হতে পারেন, সেটাই লক্ষ্য।’
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জুলফিকার হায়দার প্রধান বলেন, ‘আগে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে মসলা আমদানি করতে হতো। এখন যেসব জাত আমরা চাষে এনেছি, সেগুলোর কারণে উৎপাদন অনেক বেড়েছে। আমদানির খরচ অর্ধেকে নেমে এসেছে। চাষ আরও বাড়লে আমরা পুরোপুরি স্বনির্ভর হতে পারব।’
তবে মসলার আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদনমুখী করতে এবং মাঠ পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে কৃষক পর্যায়ে প্রচারণার ওপরও জোর দেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে উৎপাদন বাড়াতে সরকারের মনোযোগের পাশাপাশি প্রয়োজন কৃষককে প্রণোদনার মাধ্যমে উৎসাহিত করা।