যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কারোপ
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৫ ১৫:৫৩ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কারোপ
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর রপ্তানিকারকদের ওপর বহুমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। মার্কিন ক্রেতারা শুধু নতুন অর্ডার স্থগিতই করেনি, বরং যেসব পণ্য ইতিমধ্যে উৎপাদনের শেষ পর্যায়ে রয়েছে বা রওনা দেওয়ার প্রস্তুতিতে আছে, সেগুলোর অতিরিক্ত শুল্কের বোঝাও এখন ভাগ করে নিতে বলছে দেশীয় সরবরাহকারীদের।
নতুন এই শুল্ক ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। ফলে ১৬ শতাংশ বিদ্যমান শুল্কের সঙ্গে নতুন ৩৫ শতাংশ যোগ হয়ে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মোট শুল্ক দাঁড়াবে প্রায় ৫১ শতাংশে। এই মাত্রার শুল্ক আরোপ বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক মূল্যকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলবে বলে মনে করছেন শিল্পখাতের নেতারা।
বিশেষত, তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। কারণ বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির উল্লেখযোগ্য অংশ বা প্রায় ২০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রমুখী। অথচ এখনই মার্কিন ক্রেতারা অর্ডার চূড়ান্ত করতে পিছপা হচ্ছে। আবার আগে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেগুলোর মূল্য পুনর্বিন্যাসে চাপ দিচ্ছে তারা।
‘ট্যারিফের কিছু অংশ আপনাদের বহন করতে হবে’
অনন্ত গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইনামুল হক খান বাবলু বলেন, ‘বুধবার আমাদের একটি বড় মার্কিন ক্রেতার সঙ্গে বৈঠক হয়। তারা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে-পাইপলাইনে থাকা অর্ডারগুলোর বাড়তি শুল্কের একটা অংশ আমাদের বহন করতে হবে। অর্থাৎ তারা চুক্তি অনুযায়ী দাম দেবে না।’
তিনি বলেন, ‘এখন যেসব অর্ডার তৈরি হয়ে গেছে কিংবা শিপমেন্টের অপেক্ষায়, সেগুলোয় কীভাবে শুল্কের এ বোঝা ভাগাভাগি করব, সেটা নিয়ে আমরা বড় সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছি।’
বাবলু জানান, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য যেসব অর্ডার তৈরি হচ্ছে, তার মূল্যমান প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। এসব অর্ডারের মধ্যে শুল্ক জটিলতায় অনেক রপ্তানি অনিশ্চয়তার মুখে।
ভিয়েতনামের প্রসঙ্গ টানছে ক্রেতারা
শীর্ষস্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্নোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম খালেদ বলেন, ‘মার্কিন ক্রেতারা সরাসরি প্রশ্ন তুলছে: বাংলাদেশে যদি ভিয়েতনামের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি শুল্ক পড়ে, তাহলে তারা কেন বাংলাদেশে অর্ডার দেবে?’
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর চূড়ান্ত শুল্কহার ২০ শতাংশ নির্ধারিত হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা দাঁড়াবে প্রায় ৫১ শতাংশে। অর্থাৎ বাংলাদেশি পণ্য মার্কিন বাজারে পৌঁছতে গেলে প্রতি ১০০ ডলারে ৫১ ডলার শুল্ক দিতে হবে।
এস এম খালেদ বলেন, ‘এই বাড়তি খরচ ক্রেতারা এখন আর পুরোপুরি বহন করতে চায় না। তারা বলছে, অন্তত ১০ শতাংশ তোমরা দাও, না হলে অর্ডার কমিয়ে দেব।’
বেশিরভাগ অর্ডারই ঝুলে গেছে
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পোশাক রপ্তানিকারক বলেন, ‘যেসব মার্কিন ক্রেতা অর্ডার দেওয়ার কথা বলছিল, তারা এখন নীরব। আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি, কিন্তু তারা কোনো মূল্য আলোচনায় আসছে না। এর মানে হচ্ছে তারা সরকারি সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত রূপ দেখতে চায়।’
তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু অর্ডার যেগুলোতে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল, সেগুলোতেও এখন রিভিউ চলছে-বলা হচ্ছে দামে ছাড় দিতে হবে, না হলে অর্ডার বাতিল।’
বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি কাজী ইফতেখার হোসেন বলেন, ‘১০ জুলাইর পর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে যদি কোনো পণ্য রওনা দেয়, তাহলে সেটি আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে। এর মানে হচ্ছে, ওই চালান নতুন ৩৫ শতাংশ শুল্কের আওতায় পড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশি পণ্যে যদি ১৫ শতাংশ বেশি শুল্ক পড়ে, তাহলে এর অন্তত ১০ শতাংশ চাপ সরবরাহকারীর ওপর মার্কিন ক্রেতারা দেবে, এটা একরকম স্বাভাবিকই ধরে নিচ্ছে তারা। কিন্তু এতে সরবরাহকারী মানে আমাদেরই লোকসান বাড়বে।’
ইউরোপের বাজারেও চাপ আসবে
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার, যেখানে ২০২৪ সালে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। সেই বাজারে প্রতিযোগিতা হারালে শুধু মার্কিন অর্ডারই নয়, ইউরোপ বা অন্যান্য বিকল্প বাজারেও চাহিদা ও দর কমে যেতে পারে। কারণ বিশ্ববাজারে দামের ভারসাম্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়ায়।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক কমানোর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে শুধু বাজার নয়, পুরো শিল্প খাতেই সংকট দেখা দেবে।
একজন রপ্তানিকারক বলেন, ‘চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক যুদ্ধের সময় এমন পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। এবার সেই চাপ আমাদের ঘাড়ে আসছে। সময় মতো না সামলালে এই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।’