× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ক্ষমা চেয়েও আতঙ্কে এনবিআর কর্মকর্তারা

আরমান হেকিম

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৫ ০৯:৪২ এএম

ক্ষমা চেয়েও আতঙ্কে এনবিআর কর্মকর্তারা

আন্দোলনের দায় স্বীকার করে তিন শতাধিক কর্মকর্তা দাপ্তরিকভাবে ক্ষমা চাইলেও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত ও প্রশাসনিক নজরদারি থেকে এখনও রেহাই মেলেনি। ফলে ভয়, আশঙ্কা আর অনিশ্চয়তা কাটছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনেক কর্মকর্তার। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দুই সদস্য, দুই কমিশনারসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। এ ছাড়া অর্ধ-শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। তারা যেন ব‍্যাংক থেকে টাকা তুলতে না পারে এবং নিজে বা পরিবারের কেউ যেন বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারে এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিআইডির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

চলমান সংকট নিয়ে জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান কিছুটা কৌশলী জবাব দেন। তিনি বলেন, ‘কর্মকর্তাদের অভয় দেওয়ার জন্য কাস্টমস পরিদর্শন করেছি, তাদের কাছে চলে এলাম। প্রত্যেকে যদি দায়িত্বশীল আচরণ করেন, তাদের যে কাজকর্ম সেগুলো যদি তারা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেন; তাহলে আমি মনে করি না তাদের ভয়ের কোনো কারণ আছে।’

তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ বড় আকারের সীমা লঙ্ঘন করেছেন। সেটা হয়তো ভিন্নভাবে দেখা হবে। তবে সাধারণভাবে আমার মনে হয় না কারও ভয়ের কোনো কারণ আছে।’

গতকাল বুধবার আগারগাঁও রাজস্ব ভবনে চেয়ারম্যানের দপ্তরে পৃথকভাবে দুই দফায় চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শতাধিক কর্মকর্তা ক্ষমা চান এবং দুঃখ প্রকাশ করেন। 

নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন আরও ৫০ কর্মকর্তা 

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকাল ৯টার দিকে আয়কর ক্যাডারের বিভিন্ন ব্যাচের প্রায় ৫০ কর্মকর্তা চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর সোয়া ৯টার দিকে কাস্টমস ও ভ্যাট ক্যাডারের আরও প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তা দেখা করে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। 

এর আগে মঙ্গলবার প্রায় দুইশর মতো আয়কর ক্যাডার কর্মকর্তা এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে ব্যাচভিত্তিক ক্ষমা চেয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪০, ৩৮, ৩৩, ৩১, ৩০, ২৯, ২৮ ব্যাচের কর্মকর্তা বেশি।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, কর্মকর্তারা ক্ষমা চাইতে গেলে চেয়ারম্যান তাদের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করেন। ভয়ভীতিতে না থেকে দেশের স্বার্থে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজস্ব আদায়ে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। 

ওই সময়ে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা জানান, আয়কর বিভাগের প্রায় ৬০ জন কর্মকর্তা ব্যাচভিত্তিকভাবে চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তখন চেয়ারম্যান তাদের বলেছেন, ‘আমার পক্ষে ক্ষমা করতে সমস্যা নেই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বিষয়ে ক্ষমা করা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আন্দোলনের নামে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়েছে এবং দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছিল, যা সরকারি চাকরির বিধি লঙ্ঘনের শামিল। এজন্য জবাবদিহি জরুরি, নয়তো ভবিষ্যতে প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।’

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগুলো যেন যথাযথ আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মেনে হয় এবং নৈতিক শক্তি অক্ষুণ্ন থাকে।’

সূত্র জানায়, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে ইতোমধ্যে দুদকের নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট ছাড়াও সিআইডি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। খোদ এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), ভ্যাট নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের নিরীক্ষা শাখা থেকেও তথ্য নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণ হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সম্পদ ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের মতো কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হবে। প্রয়োজনে গ্রেপ্তারও করতে পারে দুদক। 

অভিযোগের ভিত্তিতে এসব ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। দুদকসহ সরকরি বিভিন্ন দপ্তর তাদের আয়-ব্যয় ও অর্জিত সম্পদের উৎস জানার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। তাদের অর্থ-সম্পদের তথ্য জানতে বাংলাদেশ ব্যাংক, ভূমি অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে চিঠি পাঠানো হয়েছে। 

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সম্পদের হিসাব চেয়ে বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে এনবিআরের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী চিঠি হাতে পেয়েছেন। চিঠিতে সম্পদের হিসাব দাখিলের জন্য ১৫ কর্মদিবস বেঁধে দেওয়া হয়েছে। 


ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ হতে পারে

এদিকে দুদকের তৎপরতায় ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ ও স্থাবর সম্পদ ক্রোক হতে পারেÑ এমন আশঙ্কায় এরই মধ্যে এনবিআরের বর্তমান ও সাবেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে নিয়েছেন। কেউ কেউ ধাপে ধাপে টাকা তুলেছেন। এনবিআর সংশ্লিষ্ট কারা ঘন ঘন এবং বেশি পরিমাণে অর্থ উত্তোলন করছেন, সেসবেরও খোঁজ নিচ্ছে দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিআইডি। এসব টাকা হুন্ডিতে পাচার হচ্ছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রায় দুই মাসের আন্দোলনের ইতি টেনে গত ২৯ জুন এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ কমপ্লিট শাটডাউন ও মার্চ টু এনবিআর কর্মসূচি প্রত্যাহার করে। ৩০ জুন এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান নিজ দপ্তরে ফিরে আসেন। ওইদিন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, যা কিছু হয়েছে সব কিছু ভুলে গিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে, দেশের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে এনবিআরকে আর এমন সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে না।

এনবিআর বিলুপ্তির অধ্যাদেশ সংশোধন ও এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণসহ চার দাবিতে ঐক্য পরিষদের ব্যানারে আন্দোলনে নামেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে শুরুর দিকে এনবিআর বিলুপ্তির অধ্যাদেশ সংশোধনসহ কয়েকটি দাবিতে তারা সোচ্চার থাকলেও শেষ পর্যায়ে এসে ‘চেয়ারম্যানের অপসারণের’ এক দফা দাবিতে তীব্র আন্দোলন শুরু করেন তারা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে আন্দোলনে অনড় থাকলে সরকার কঠোর হতে শুরু করে। 

গত ২৯ জুন ৬ জন কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। ওইদিন রাতেই ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করে। 

এদিকে আন্দোলনের নামে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র ছিলÑ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমন তথ্য সরবরাহ করে সরকারকে। জয়েন্ট প্লাটফর্ম হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ৮৪৫ পৃষ্ঠার মেসেজ আদান-প্রদানের বিশদ তথ্য এখন গোয়েন্দা সংস্থার হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে। এরপর গত কয়েকদিনে এখন পর্যন্ত আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ১৬ জন কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এ ছাড়া আন্দোলনে উস্কানি দেওয়ার তথ্য-প্রমাণ পাওয়ায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে এনবিআরের তিনজন সদস্য ও একজন কমিশনারকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কাস্টম হাউস বন্ধ রেখে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত ও রাজস্ব আহরণে ব্যাঘাত ঘটানোর দায়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বিভিন্ন স্তরের কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা