× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ট্রাম্পের শুল্কারোপ, বড় চ্যালেঞ্জে রপ্তানি খাত

আরমান হেকিম

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৫ ১৫:৪৩ পিএম

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৫ ১৫:৪৪ পিএম

ট্রাম্পের শুল্কারোপ, বড় চ্যালেঞ্জে রপ্তানি খাত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ৩৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে দেশের অর্থনীতি বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে পড়বে। এতে তৈরি পোশাক রপ্তানি মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা শুধু বাণিজ্যিক ক্ষতিই নয়- বেকারত্ব বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা এবং খুচরা বাজারে অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকরা, কমে যেতে পারে বিদেশি বিনিয়োগ। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি এখনই বিকল্প বাজার ও সমঝোতার পথ খোঁজা না হয়, তাহলে শুল্কের প্রভাব অর্থনীতির ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে।

ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর নতুন শুল্কারোপ করা হবে। এর মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, কাজাখস্তান ও তিউনিসিয়ার জন্য ২৫ শতাংশ। দক্ষিণ আফ্রিকা, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জন্য ৩০ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়া ৩২ শতাংশ, বাংলাদেশ ও সার্বিয়া ৩৫ শতাংশ, কাম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড ৩৬ শতাংশ এবং মায়ানমার ও লাওসের জন্য ৪০ শতাংশ শুল্কারোপের ঘোষণা দেওয়া হয়। ট্রাম্প দাবি করেছেন, এসব দেশ ‘ন্যায্য বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করছে না’। যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন রক্ষার অংশ হিসেবে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আগামী ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে ট্রাম্পের এই চড়া শুল্ক। তবে বাংলাদেশ সরকার এখনও আশাবাদী, আলোচনার মাধ্যমে ভালো কিছু বয়ে আনতে পারবে। আজ বুধবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের (ইউএসটিআর) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিদের বৈঠক হবে। বৈঠকে নেতৃত্ব দিবেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। তবে এই বিষয়ে ব‍্যবসায়ীদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ। এবং তিন মাসে যেখানে ভালো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি সেখানে তিন সপ্তাহের সুফল নিয়ে আসতে পারবে কি না- তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের মতো পোশাক রপ্তানি করা হয়। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অন‍্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম। দেশটি বাংলাদেশের একধাপ নিচে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তারা সফলভাবে বাণিজ্য চুক্তি করতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্রে তারা ২০ শতাংশ শুল্কে পণ‍্য পাঠাতে পারবেন। মানে বাংলাদেশের চেয়ে তাদের পণ‍্য ১৫ শতাংশ কম মূল‍্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুবিধা পাবে। এর ফলে প্রতিরোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়তে পারে।

বর্তমানে পোশাক খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে না পারলে অনেক কারখানার অর্ডার কমে যাবে বা বাতিল হবে। এতে কারখানা বন্ধ এবং শ্রমিক ছাঁটাই অনিবার্য হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

এ বিষয়ে সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ বড় ধরনের অর্থনৈতিক আঘাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য। আগে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ, এখন তা দ্বিগুণের বেশি। এই হঠাৎ ও ব্যাপক শুল্ক বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। শুধু ২০২৪ সালেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৮৫০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এ শুল্ক বৃদ্ধির বোঝা সরাসরি পোশাক উৎপাদকদের ওপর পড়বে। সেই সঙ্গে প্রভাব পড়বে লাখ লাখ শ্রমিকের ওপর, যাদের বেশিরভাগই নারী। ফলে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, কর্মসংস্থান হ্রাস ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হবে। এসব সমস্যা কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করবে।’

আশা দেখছে সরকার

বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত শুল্ক চূড়ান্ত নয় বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘ওয়ান টু ওয়ান নিগোসিয়েশনের মাধ্যমে এটা ঠিক হবে। এ লক্ষ্যে আগামীকাল (আজ) ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের (ইউএসটিআর) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিদের বৈঠক হবে।’

তিনি বলেন, ‘ওখানে (যুক্তরাষ্ট্রে) আমাদের বাণিজ্য উপদেষ্টা আছেন। উনি তিন দিন আগে গেছেন। আজকেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দল যাচ্ছে। ৮ তারিখে মিটিং। ওদের ৮ তারিখ মানে আগামীকাল বুধবার খুব ভোরবেলা। মিটিংয়ের পর আমরা বুঝতে পারব।’ 

তিনি বলেন, ‘ইউএসটিআরের সঙ্গে আলাপ করবেন উনি (বাণিজ্য উপদেষ্টা)। এরপর আপনারা বুঝতে পারবেন।’

ভিয়েতনাম কমাতে পারলে বাংলাদেশ কেন সেভাবে কমাতে পারল নাÑ এই প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘এটা ঠিক যে আমাদের ঘাটতি মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলার। ভিয়েতনামের ১২৫ বিলিয়ন ডলার। ওখানে কিন্তু ওরা মোটামুটি ছাড় দিতে পারে। কিন্তু আমাদের এত কম বাণিজ্য ঘাটতি, তাই এত শুল্ক দেওয়ার তো ন্যায্যতা থাকে না।’

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে গম, সয়াবিন, এয়ারক্রাফটসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ আরও বোয়িং বিমান কিনবে, তুলা আমদানি আরও বাড়াবে, সরকারিভাবে খাদ্যপণ্য, অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রেও গুরুত্ব পাবে যুক্তরাষ্ট্র। এসব বিষয়ে ছাড় দিতে বা মেনে নিতে বাধা নেই।

তিনি বলেন, ভিয়েতনাম ২৬ ভাগ শুল্ক আরোপ কমাতে পেরেছে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে। বাংলাদেশ কেন পারেনি? এর জবাব আমাদেরও চেষ্টার কমতি ছিল না। শেষ পর্যন্ত যদি শুল্ক না কমায় তাহলে কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে। তবে আলোচনার পথ খোলা আছে এখনও, আশা করি ভালো কিছু হবে।

পাল্টা শুল্ক নিয়ে বাংলাদেশ সিরিয়াস না

বিদেশি ক্রেতারা অভিযোগ করে বলছেন, পাল্টা শুল্ক নিয়ে আমরা সিরিয়াস নইÑ এমনটাই জানিয়েছেন বিজিএমইর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের একক বড় বাজার। সেজন্য আমরা শুরু থেকে সরকারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির অনুরোধ জানিয়েছি। এজন্য আমরা আমাদের তরফ থেকে সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়ার জন্যও প্রস্তুত ছিলাম। তবে পাল্টা শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষি নিয়ে ব্যবসায়ীদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে আমাদের শুধু আশ্বাস দিয়ে বলা হয়েছে, ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ আমরা জিজ্ঞাসা করেছি, দেশের কোন স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার কথা বলা হচ্ছে। তবে সে বিষয়ে কোনো উত্তর আমাদের দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের কথা জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এটি জানার পর আমরা ব্যবসায়ীমহল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করছি। কারণ, এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির জন্য তিন সপ্তাহ সময় আছে। আমরা চাই, দর-কষাকষির প্রক্রিয়ায় একটি লবিস্ট নিয়োগ করা হোক। পাশাপাশি এ প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদেরও যুক্ত করা হোক। আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়গুলো আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে বলতে চাই।

তিনি আরও বলেন, ৩৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হলে রপ্তানি খাতে যে বিপর্যয় নেমে আসবে তা মোকাবিলায় চিন্তাভাবনা কী, সেটাও আমরা ব্যবসায়ীরা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে জানতে চাইব। বিদেশি ক্রেতারা অভিযোগ করে বলছেন, পাল্টা শুল্ক নিয়ে আমরা সিরিয়াস নই। এখন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে বিদেশি ক্রেতাদের একধরনের বার্তাও দেওয়া যাবে।

পাল্টা শুল্ক আরোপ দর-কষাকষির ব্যর্থতা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে চলমান আলোচনাকে ‘দর-কষাকষির ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখছেন তৈরি পোশাক খাতের নেতা ও বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক। তার ভাষায়, ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত পাল্টা শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়।

তিনি বলেন, ‘এটা ভালো কোনো বার্তা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্র এখন চূড়ান্তভাবে আরেক দফা চাপ প্রয়োগ করছে, যেন বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত তাদের দাবিগুলো মেনে নেয়।’

ফজলুল হকের অভিযোগ, শুল্ক নিয়ে এত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বেসরকারি খাতকে একেবারেই উপেক্ষা করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও সেখানে কোনো বেসরকারি প্রতিনিধি নেই, এমনকি অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক বিশেষজ্ঞও নেই।’

তার মতে, তিন মাস ধরে আলোচনার পর মাত্র ২ শতাংশ শুল্ক হ্রাস পাওয়া চরম হতাশাজনক। তিনি বলেন, ‘ভিয়েতনাম ইতোমধ্যেই ২০ শতাংশে শুল্ক নামিয়ে এনেছে, অর্থাৎ তারা এখন আমাদের চেয়ে ১৫ শতাংশ এগিয়ে। ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়, তবে আমরা অনেকটা পেছনে পড়ে গেছি।’

ফজলুল হক মনে করেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশকে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখাতে হবে, নইলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যদি এই শুল্ক অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে এটি দেশের জন্য বড় দুঃসংবাদ হয়ে থাকবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা