আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৫ ১০:৩২ এএম
আপডেট : ২২ জুন ২০২৫ ১০:৪২ এএম
ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ব অর্থনীতিতে নেমে এসেছে গভীর অনিশ্চয়তার ছায়া। তেলের বাজারে অস্থিরতা, শেয়ারবাজারে ধস এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চরম অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই সংঘাত কেবল ভূরাজনৈতিক নয়, বিশ্বজুড়ে আর্থিক খাতের জন্যও অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। ইরান ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের কারণে দেশের পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি গতকাল গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদরাও এই শঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যেও এই যুদ্ধ পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ছে জ্বালানি পণ্যে। যুদ্ধের ফলে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে জ্বালানি পণ্য আমদানির গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল হরমুজ প্রণালী। ফলে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজারে জটিলতা তৈরি হলে অনেক প্রবাসী চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। আমদানি-রপ্তানি চেইন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বাণিজ্য উপদেষ্টার কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে। এর জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ইরান ও ইসরায়েল চলমান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যদিও প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুবার জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে সরকার।
নিত্যপণ্যের বাজারে অনেকদিন ধরে স্বস্তি বিরাজ করছে উল্লেখ করে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন দাবি করেছেন, ‘বাজার ব্যবস্থায় বৈচিত্র্যের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। চালের দাম একটু বাড়তি, এটা ঠিক। এটা সাময়িক, ঠিক হয়ে যাবে। এবার বোরো ধানের ভালো ফলন হয়েছে।’
পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পেঁয়াজের কেজি ৫৫-৬০ টাকা না হলে কৃষক বাঁচবে না। ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা পাল্টা শুল্ক নিয়ে দরকষাকষিতে সর্বশেষ অবস্থান কী, বাংলাদেশ কি আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছেÑ এই প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেছেন, আগামী সোমবার এ বিষয়ে তারা প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টির সমাধান হবে বলে তারা আশাবাদী। দেশের শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান বাণিজ্য উপদেষ্টা।
গবেষণা ও নীতিসহায়ক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হচ্ছে রেমিট্যান্স। আর আমাদের প্রবাসীদের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে। প্রবাসী আয় সবচেয়ে বেশি আসেও মধ্যপ্রাচ্য থেকেই। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধাবস্থায় রেমিট্যান্সের যে ফ্লো তা স্লথ হলে আমরা অবশ্যই ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়ব।’
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের প্রভাবে রিজার্ভ ঘাটতিতে পড়বে দেশ। এছাড়া আমাদের বাজেটে ১৫ শতাংশ বৈদেশিক ঋণের কথা রয়েছে। এখানেও তার প্রভাব পড়বে। আবার অনেককে চাকরি হারিয়ে চলে আসতে হবে। আমদানি-রপ্তানি খাতেও এর প্রভাব পড়বে। আমাদের শিপিং কস্ট বেড়ে যাবে। রুট পরিবর্তন করতে হবে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য ডেলিভারিতে ব্যাঘাত ঘটবে। এতে বাজার হারানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। এয়ার ট্রাভেলেও খরচ বাড়বে।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাংলাদেশ জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তাই যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যুদ্ধ হলে বিশ্বজুড়েই জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়। এর প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ে। দ্বিতীয় বিষয় হলো শ্রমবাজার। এখানে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’
তিনি বলেন, ‘তেল ও এনার্জি হচ্ছে এমন কাঁচামাল, যা সব ধরনের পণ্যের সরাসরি খরচ বাড়িয়ে দেয়। আর এর বহুমাত্রিক প্রভাবও রয়েছে। আমাদের বৈশ্বিক এনার্জি লাইফলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তার অ্যাফেক্ট (প্রভাব) বাংলাদেশের ওপরও সরাসরি পড়বে। সবকিছুর দাম বেড়ে যাবে। এছাড়া আমরা যেসব পণ্য আমদানি করি, তারও দাম বেড়ে যাবে। চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এরা সরাই মিলে ৭০ শতাংশ এলএনজি নিয়ে আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে।’
তেলের বাজারে অস্থিরতা
ইরান ও ইসরায়েল উভয় দেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান তেল সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইরান বিশ্বের অন্যতম তেল রপ্তানিকারক দেশ এবং পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশাল পরিমাণ জ্বালানি পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এমনকি এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়েছে ১০-১৫ ডলার।
বাংলাদেশ বছরে গড়ে ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের তেল ও গ্যাস আমদানি করে থাকে। এই জ্বালানি ব্যয় মূলত নির্ভর করে বিশ্ববাজারের দামের ওপর। দাম বেড়ে গেলে সরকারের ভর্তুকি বাড়ে কিংবা ঘাটতি সামলাতে জ্বালানি সরবরাহে কৃচ্ছ্রসাধন করতে হয়। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন খরচ এবং শিল্প উৎপাদনে, যা সমগ্র অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি ও খরচের চাপ তৈরি করে।
রেমিট্যান্স প্রবাহে সম্ভাব্য ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। প্রতিবছর গড়ে ২০-২২ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসে, যার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমানÑ এসব দেশে লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ যদি বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে গোটা মধ্যপ্রাচ্যেই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান হ্রাস, শ্রমিক ফেরত আসা কিংবা রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়বে, যা টাকার মান এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলবে।
আমদানি ও বৈদেশিক বাণিজ্য চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ পুরোটাই আমদানিনির্ভর। আমদানি হয় নাÑ এমন পণ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। খাদ্যশস্য, জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, সার, ভোগ্যপণ্যÑ এর বেশিরভাগই আমদানি করতে হয়। যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ চেইন ব্যাহত হলে এসব পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচলে বিলম্ব ও খরচ বৃদ্ধি হতে পারে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগর ঘিরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে। এই পরিস্থিতিতে আমদানির খরচ বাড়বে, কাঁচামালের সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে এবং দেশের ভোক্তাবাজারে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। ইতোমধ্যে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে, যার ফলে আমদানি পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তৈরি পোশাক শিল্পে অনিশ্চয়তা
দেশের অর্থনীতির প্রধান রপ্তানি খাত হলো তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি), যা বছরে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে দেয়। এই খাতও আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরশীলÑ বিশেষ করে কাঁচামাল, রঞ্জক, যন্ত্রপাতি ও যাতায়াত খরচের দিক থেকে।
যুদ্ধের ফলে যদি আন্তর্জাতিক শিপিং খাতে ব্যয় ও সময় বাড়ে, তাহলে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা হয়তো সময়মতো পণ্য না পেলে অন্য দেশের দিকে ঝুঁকবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে অর্ডার কমে যাওয়ার শঙ্কাও থেকে যায়।
বাড়তে পারে নিত্যপণ্যের দাম
জ্বালানি, খাদ্য, পরিবহন সবকিছুর দাম বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর। বর্তমানেও দেশে চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, চিনিÑ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে আমদানি ব্যয় ও বাজার অনিশ্চয়তার কারণে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়বে।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুধু দুটি দেশের রাজনৈতিক বিবাদ নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার এক সূচনা। বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিকভাবে সংবেদনশীল, বৈদেশিক নির্ভরশীল দেশে এই প্রভাব বহুস্তরে পড়বে। জ্বালানি সংকট, রেমিট্যান্স ঝুঁকি, রপ্তানি হুমকি এবং মূল্যস্ফীতিÑ সব মিলিয়ে দেশ এখন এক কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখে।