হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৫ ১০:৪০ এএম
আপডেট : ০২ জুন ২০২৫ ১০:৪০ এএম
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৪২ হাজার কেজি স্যাচুরেটেড পলিয়েস্টার প্রিমিয়ার রেজিন আমদানি করে মেসার্স বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড। বিল অব এন্ট্রিতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রতি কেজি রেজিনের মূল্য ঘোষণা দেয় ১ দশমিক ৫৬ ডলার। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এই মূল্য ঘোষণা দিলেও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস প্রতি কেজি রেজিন শুল্কায়ন করে ২ দশমিক ৪৫ ডলার দামে।
ঘোষিত মূল্যের বেশি দামে শুল্কায়ন করায় এটি চ্যালেঞ্জ করে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট (আপিল) কমিশনারেট কার্যালয়ে আপিল করে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটি। এক বছর আগে শুল্কায়ন মূল্যের বিরোধ নিয়ে আপিল করলেও সেটি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। শুধু এই আপিলটি নয়, বর্তমানে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট (আপিল) কমিশনারেট কার্যালয়ে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটির ৬৭টি আপিল চলমান। যার প্রায় প্রত্যেকটি আপিল বেশি দামে শুল্কায়ন নিয়ে।
বিষয়টিকে অযৌক্তিক দাবি করেছেন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেসার্স বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি হিসেবে আমরা সবসময় আমদানি মূল্য হিসেবে বিল অব এন্ট্রিতে প্রকৃত মূল্যটাই দিই। কিন্তু সেটি ভেরিফাই না করেই কাস্টম হাউস নিজেদের মতো করে অ্যাসেসমেন্ট করে একটি মূল্য নির্ধারণ করে। এই কারণে আমাদের আপিলে যেতে হচ্ছে।’
পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে যে-ই দামে কেনে, বিল অব এন্ট্রিতে ওই দামই ঘোষণা দিতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী, ওই দামেই পণ্য চালানটি শুল্কায়ন করার কথা। যদি ওই দাম ঠিক না থাকে তাহলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আন্ডার ইনভয়েস অথবা ওভার ইনভয়েস করছে কি না সেটি খতিয়ে দেখতে হয়। যদি আন্ডার ইনভয়েস করা হয়, তাহলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কাস্টম হাউস। কিন্তু আপিলে আসা মামলাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পণ্যের চালানগুলোতে আন্ডার ইনভয়েস করা হয়েছেÑ এমন অভিযোগ আনা হয়নি। এরপরও আমদানিকারকের ঘোষিত মূল্যের বেশি দামে শুল্কায়ন করছে কাস্টম হাউস। যে কারণে কাস্টম হাউসের এই শুল্কায়নের বিরুদ্ধে আপিল করছেন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।
জানা যায়, কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট (আপিল) কমিশনারেট কার্যালয়ে বর্তমানে অন্তত ৪১৭টি আপিল চলমান। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের তুলনায় এখন শুল্কায়ন মূল্য সংক্রান্ত আপিল প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কিছু কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের একশর বেশি আপিল বর্তমানে চলমান বলে তারা জানান।
বর্তমানে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট (আপিল) কমিশনারেট কার্যালয়ে ১১৪ আপিল চলমান রয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষ ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের।
জানতে চাইলে বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যে দামে আমরা পণ্য আমদানি করি, বিল অব এন্ট্রিতে সেই রিয়েল দামটাই উল্লেখ করি। কিন্তু কাস্টমস সেটি না মেনে সবসময় বেশি মূল্যে পণ্য শুল্কায়ন করে। যে কারণে বাধ্য হয়ে আমাদের আপিল করতে হয়। আমরা যে মূল্য ঘোষণা দিই, ওইটা সঠিক না মনে করার মানে হচ্ছে আমাদেরকে চোর বলা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমরা যে-ই দামে পণ্য কিনি, ওই দামটাই ঘোষণা দিই। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের যদি সন্দেহ হয়, তারা সেটি যাছাই করতে পারে। কারণ এখন সঠিক মূল্য অ্যাসেসমেন্ট করার অনেক মাধ্যম রয়েছে। আমরা যে দেশ থেকে পণ্য আমদানি করি, সেই দেশের কাস্টমস থেকেও যাছাই করতে পারে। কিন্তু তারা সেটি না করে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য মনগড়া একটি দাম নির্ধারণ করে ওই মূল্যে শুল্কায়ন করে। যে কারণে আমরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের অধিকাংশ আপিল হচ্ছে অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু নিয়ে। এই আপিলের কারণে আমরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। একদিকে আপিলের কারণে পণ্য আটকে থাকলে তখন বন্দরের বাড়তি ডেমারেজ চার্জ পরিশোধ করতে হয়। আবার পণ্য ছাড় করিয়ে আপিল করা হলে সরকারি ফান্ডে টাকা অলস ফেলে রাখতে হয়। আবার পণ্যের আমদানি মূল্যের ওপর নির্ভর করে উৎপাদন কস্ট হিসাব করে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করি। কিন্তু যখন শুল্কায়নে মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া রাজস্ব বেশি আদায় করা হয়। তখন আমরা আর ওই দামে পণ্য বিক্রি করতে পারি না। ওই দামে বিক্রি করলে আমাদের লোকসান গুনতে হয়।’
কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট (আপিল) কমিশনারেট কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ওই কার্যালয়ে ৪৫টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ৪১৭টি অনিষ্পন্ন কাস্টমস মামলা (আপিল) রয়েছে। এই আপিলগুলো দায়ের হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, অনিষ্পন্ন ৪১৭টি আপিলের মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানের একের অধিক আপিল বর্তমানে চলমান রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বহুজাতিক কোম্পানি মেসার্স বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের আপিল আছে ৬৭টি, মেসার্স নেসলে বাংলাদেশ পিএলসির আপিল আছে ১৭টি, মেসার্স মন্ডিলেজ বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের ৩৫টি, মেসার্স বিএসআরএম স্টিল লিমিটেডের ১১৪টি, মেসার্স কল্লোল লিমিটেডের ২২টি, মেসার্স কল্লোল ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের ৭টি, মেসার্স জেটি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ লিমিটেডের ৭টি, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেডের ৬টি, মেসার্স আম্বার বোর্ড মিলস লিমিটেডের ৭টি, মেসার্স জিএসকে বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের ৮টি, মেসার্স মোশারফ অ্যান্ড ব্রাদার্সের ১২টি, মেসার্স সুপিরিয়র রেডিমিক্স কংক্রিট লিমিটেডের ১০টি, জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের ৩টি, মেসার্স আইমন ট্রেডের ১১টি, মেসার্স ড্যানিশ কনডেন্স মিল্ক লিমিটেডের ২২টি, মেসার্স প্যাসিফিক মোটরস লিমিটেডের ৩টি, মেসার্স র্যাংগস মোটরস লিমিটেডের ১০টি, মেসার্স জুবিলেন্ট ফুডওয়ার্ক বাংলাদেশ লিমিটেডের ৩টি, মেসার্স আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের ৩টি, মেসার্স গাউছিয়া ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ৩টি এবং মেসার্স বিআরবি কেবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের আপিল আছে ৫টি।
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১০০টির মধ্যে ৯০টি আপিলই হচ্ছে শুল্কায়ন মূল্য নিয়ে। এটি পণ্য আমদানিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। আপিলে গেলে দুই পক্ষেরই ভোগান্তি বাড়ে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানিয়েছেন, আপিলের রায় যদি আমদানিকারকের পক্ষে আসে, তখন কাস্টম হাউস ট্রাইব্যুনালে যায়। সেখানে ব্যর্থ হলে হাইকোর্টে যায়। অন্যদিকে রায় কাস্টম হাউসের পক্ষে গেলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ট্রাইব্যুনালে যায়। সেখানে ব্যর্থ হলে তারাও হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। এতে দীর্ঘ সময় ধরে আপিল নিষ্পত্তি নিয়ে ভুগতে হয়।
তবে আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, রায় যার পক্ষেই যাকÑ দিন শেষে আমদানিকারকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। তারা জানান, যদি পণ্য ছাড় না করে আপিল করা হয়, তখন আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আমদানি পণ্যগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকে। যে কারণে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি ডেমারেজ চার্জ পরিশোধ করতে হয়। এক্ষেত্রে দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হয়। অন্যদিকে পণ্য ছাড় করিয়ে আপিল করতে হলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে কাস্টম হাউসের দাবি করা মূল্যে শুল্কায়ন করে ছাড় করাতে হয়। এক্ষেত্রে আপিলের রায় আমদানিকারকের পক্ষে এলে তখন বেশি পরিশোধ করা শুল্ক ফেরত পান আমদানিকারক। এখানেও লোকসানে পড়েন আমদানিকারক। কারণ আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে শুল্ক বাবদ বেশি পরিশোধ করা টাকা জামানত হিসেবে অলস ফেলে রাখতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেসার্স বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের এক কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, কাস্টমস নির্ধারিত মূল্যের শুল্কায়ন করায় যে পরিমাণ বাড়তি অর্থ খরচ হয়েছে, ওই পণ্যের চালান নিয়ে আপিল করলে তার চেয়ে বেশি টাকা আপিল নিষ্পত্তি করতে খরচ হয়। তারপরও আমাদের আপিল করতে হয়। কারণ আমাদের ঘোষিত মূল্যে শুল্কায়ন না হলে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। কেন ঘোষিত মূল্য বাদ দিয়ে বাড়তি মূল্য নির্ধারণ করে শুল্কায়ন করা হয়েছে? তাহলে কি আমরা সঠিক মূল্য দিই না। আমরা যে সঠিক আমদানি মূল্য ঘোষণা দিই, সেটি প্রমাণ করতেই আমাদের আপিল করতে হয়। কাস্টম হাউস মনগড়া একটি মূল্য নির্ধারণ না করে যদি যাচাই করে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করত, তাহলে আমাদের এই ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।’
আমদানিকারকদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের উপকমিশনার সাইদুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কম শুল্ককর পরিশোধের জন্য আমদানিকারকরা অনেক সময় বিল অব এন্ট্রিতে পণ্যের মূল্য কম ঘোষণা দেন। এ কারণে আন্তর্জাতিক এবং দেশি বাজার দুটোর অ্যাসেসমেন্ট করে আমদানি পণ্যের শুল্কায়ন নির্ধারণ করে কাস্টম হাউস। ওই শুল্কায়ন মূল্য ধরেই শুল্ককর আদায় করা হয়। কাস্টম হাউসের নির্ধারণ করা শুল্কমূল্যের কারণে যদি কোনো আমদানিকারক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মনে হয়Ñ উনারা কাস্টমস কমিশনারের কাছে আবেদন করতে পারেন।’