প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৫ ২১:৫৬ পিএম
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ জোগানের পথ সুগম করতে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের শর্ত শিথিল করতে যাচ্ছে সরকার। বিশেষ করে পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে যে আয়কর রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা তুলে নেওয়ার চিন্তা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় যেখানে ব্যাংক থেকে ধার কমিয়ে বিকল্প উৎসের সন্ধান করা হচ্ছে, সেখানে সঞ্চয়পত্রকে আরও সহজলভ্য করার এ উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে অর্থ বিভাগ।
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জোগান দেওয়ার কথা ছিল সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কঠোর শর্ত ও কর জটিলতার কারণে এই খাতে প্রত্যাশিত প্রবাহ পাওয়া যায়নি। ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ দূরে থাক, সরকারের নিট ঋণও হয়ে পড়েছে ঋণাত্মক।
এনবিআরের সাবেক সদস্য (করনীতি) ড. সৈয়দ আমিনুল করিম বলেন, ‘স্বল্প আয়ের মানুষের রিটার্ন জমা দেওয়ার মতো করযোগ্য আয় নেই। কিন্তু তাদের ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র আছে। এখন এই বাধ্যবাধকতা উঠে গেলে রিটার্ন জমায় হয়রানিও কমে যাবে।’
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বিক্রি হয়েছে ৩৬ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকার, আর ভাঙানো হয়েছে ৪৩ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকার। এর মানে, সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার বিপরীতমুখী প্রবাহের মুখে পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার নতুন করে চিন্তা করছে রিটার্ন জমার শর্ত শিথিলের। অর্থাৎ পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে এখন যে পিএসআর (পেমেন্ট স্লিপ অব রিটার্ন) দেখাতে হয়, তা হয়তো সীমিত আকারে তুলে নেওয়া হতে পারে, অথবা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হতে পারে। এতে করে নিম্নমধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত নাগরিকরা সহজে বিনিয়োগ করতে পারবেন।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাজেটে ১০ ধরনের সেবা গ্রহণে আয়কর রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকে ১০ লাখ টাকার বেশি মেয়াদি আমানত খোলা, পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য পদ গ্রহণ এবং সঞ্চয়পত্র কেনা। বর্তমানে ৪৫টি সেবার ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সঞ্চয়পত্রের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং অভ্যন্তরীণ ঋণ উৎস চাঙ্গা রাখতে এই উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। এতে একদিকে স্বল্প ও মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠী বিনিয়োগে আগ্রহী হবে, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে সরকার ঘাটতির একটি অংশ পূরণ করতে পারবে।
তবে এনবিআরের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। আগামী ২ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট পেশ করার আগে ১৯ মে অনুষ্ঠিতব্য এনবিআর ও প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে।
বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর। এগুলো হলো- পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্র। এর মধ্যে পরিবার সঞ্চয়পত্রের চাহিদা সবচেয়ে বেশি আর শুধু নারীরাই এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন।