ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৫ ১৪:২৭ পিএম
বাংলাদেশের পাদুকা বা জুতা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এ কথা পুরোনো। তবে জুতা তৈরিতে দেশের সবচেয়ে প্রষিদ্ধ অঞ্চল কিশোরগঞ্জের ভৈরবের জুতা পেরোতে পারছে না দেশের গণ্ডি। অঞ্চলটিতে উন্নতমানের জুতা তৈরি হলেও এসব কারখানায় নেই সরকারি বিনিয়োগ। মিলছে না ব্যাংক ঋণ। বেসরকারি বা অতি সুদে ঋণ নিয়ে চলছে কারখানাগুলো। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে সরকারি আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা, নীতি সহায়তা, বিদেশি বায়ার ধরাসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা চায় শিল্পে জড়িত ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে শিল্পটিকে ‘ভৈরব ব্র্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করার প্রত্যাশা তাদের।
সম্প্রতি ‘ভৈরবে পাদুকা শিল্পের শ্রম ও পরিবেশগত মান বিষয়ক মাল্টি স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন’ শীর্ষক একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে বক্তারা বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার বিষয়ে আলোকপাত করেন। তারা শিল্পটির বিকাশে সরকারি সহযোগিতা কামনা করেন।
ভৈরবে পাদুকা শিল্পের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা
ভৈরব পাদুকা কারখানা মালিক সমিতির সভাপতি মো. আল আমিন মিয়া বলেন, ভৈরবে ৫-৬ হাজার ছোট-বড় জুতা বা পাদুকা কারখানা রয়েছে। ২০ হাজার নারীসহ লক্ষাধিক শ্রমিক এ শিল্পে জড়িত। কিন্তু এখানে দক্ষ শ্রমিক গড়ে তুলতে কোনো ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নেই। ফলে চাহিদা থাকলেও দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক মিলছে না। এজন্য এ অঞ্চলে উন্নত মানের প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা দরকার।
তিনি বলেন, ১৯৩০ সাল থেকে কলকাতা থেকে ঢাকায় জুতার কারখানা স্থানান্তরিত হয়। পরে ১৯৮০ সালে ভৈরবে জুতার কারখানা গড়ে উঠতে থাকে। এখানকার বেশকিছু জুতার কারখানা রয়েছে যেখান থেকে বিদেশে রপ্তানি করার মতো উন্নতমানের জুতা তৈরি হচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ায় বিদেশে রপ্তানি করার কোনো সুযোগ মিলছে না। ভৈরবের জুতাকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রস্তুত করে বিদেশে রপ্তানিতে সরকারি সকল ধরনের সহযোগিতা দরকার।
তিনি বলেন, সরকার তৈরি পোশাক খাতে যেমন ঋণ দেয় আমাদেরকেও সেভাবে এক দেড় হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা দিলে সবাই উপকৃত হতো। ইউরোপ বা বিশ্বের অন্যান্য দেশে জুতা রপ্তানির জন্য যাবতীয় কার্যক্রমের ব্যবস্থা করে দিলে এখানকার কর্মসংস্থান বাড়বে। সঙ্গে সঙ্গে দেশের আর্থিক অবস্থাও ভালো হবে। চীন ও ভারতের মতো দক্ষ কারিগর তৈরি করতে হলে আমাদের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের কোনো বিকল্প নেই।
উপজেলাটির নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শবনম শারমিনও আল আমিন মিয়ার কথার সঙ্গে একমত পোষণ করে জানান, এ অঞ্চলে প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বিদেশে রপ্তানিতে সরকারি সহায়তা দরকার। এখানকার এই কুটিরশিল্পকে বৃহৎশিল্পে পরিণত করতে হলে আর্থিক সহায়তা দরকার।
বিদেশে পণ্য রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন পাঞ্জেরি ফুটওয়্যারের কর্ণধার তাজুল ইসলামও। তিনি বলেন, আমরা অনেক উন্নত মানের জুতা তৈরি করলেও সেগুলো বিদেশে রপ্তানি করতে পারি না। সরকারকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
ভৈরবের জুতার কারখানাগুলোকে উন্নত করতে রাজনৈতিকভাবে যত ধরনের সহযোগিতা দরকার তা করতে প্রস্তুত বলে জানান, উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, যেকোনো শিল্পকারখানা স্থাপন ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ভৈরবের রাজনৈতিক পরিবেশ শিল্পের জন্য অনুকূলে। কেননা এখানে অভ্যন্তরীণ কোনো দ্বন্দ্ব কাজ করে না। সবার মধ্যে সহাবস্থান রয়েছে। শিল্পটির বিকাশে সরকারি নীতি-সহায়তার কোনো বিকল্প নেই।
শ্রমিক অধিকার নিশ্চিতে গুরুত্বারোপ করেন বিলসের পরিচালক নাজমা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, ভৈরবে পাদুকা শিল্পের বিকাশ ঘটলেও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হয়নি। এখানকার শ্রমিকরা কারখানা থেকে আইডি কার্ড পায় না। শ্রমের কর্মপরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। নেই পর্যাপ্ত নারী কর্মীও। শ্রমিকদের ছুটিছাটা নেই।
নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রত্যয়
তৈরি পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকের আধিক্য থাকলেও জুতা শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ কম। কোনো কোনো কারখানায় নারী শ্রমিক নেই। বিশেষ করে ছোট কারখানাগুলোতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা নগণ্য। তবে মাঝারি বা বড় কারখানাগুলোতে ৫ থেকে ১০ শতাংশ, কোথাও তার চেয়ে বেশি সংখ্যক নারী শ্রমিক রয়েছে।
পাদুকা শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি সম্পর্কে সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা বেগম বলেন, দেশের অর্ধেক জনশক্তি নারী। তৈরি পোশাক শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ বেশি হলেও পাদুকা শিল্পে খুব কম। এখানে মূলত নারীদের জন্য কাজের পরিবেশ ভালো না। আর যেহেতু দিনরাত ২৪ ঘণ্টায় এসব কারখানায় কাজ হয় তাই নারীদের কাজের সুযোগ খুবই সীমিত। এ শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তা ছাড়া বেতন কাঠামোতেও অনেক পার্থক্য রয়েছে। এটিও দূর করা প্রয়োজন।
পাঞ্জেরি ফুটওয়্যারে গিয়ে দেখা যায় নারী শ্রমিকদের সংখ্যা উল্লেখ করার মতো। তাদের মধ্যে কেউ কেউ জুতা সেলাই করছেন। কেউ ফিতা লাগাচ্ছেন। কেউ জুতা রঙ করছেন। তাদের মধ্যে হাফছা বেগম জানান, তারা চাকরির শুরুতে ৫ হাজার টাকা মাসিক বেতনে যুক্ত হোন। বেতন বেড়ে কারও কারও ক্ষেত্রে ১০-১২ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। তা ছাড়া কাজের পরিবেশও ভালো। সপ্তাহে এক দিন ছুটি কাটাতে পারেন। পাঞ্জেরি ফুটওয়্যারের মালিক তাজুল ইসলাম বলেন, তার কারখানা থেকে এপেক্স, অরিয়ন ও লোটোসহ কয়েকটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে জুতা সরবরাহ করা হয়। তার কারখানায় অর্ধেক নারী ও অর্ধেক পুরুষ শ্রমিক রয়েছে। এখানে নারীদের জন্য কাজের পরিবেশ খুবই উন্নত।
পরিবেশসম্মত কারখানা স্থাপন
পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, দেশে প্রায় ৫৪ বছর যাবৎ ট্যানারি শিল্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতি সহায়তা না পেয়ে এই শিল্প বিকশিত হওয়ার পরিবর্তে সংকুচিত হয়ে পড়েছে । শিল্পটি যেখানে বৃহদাকারে রূপ নেওয়ার কথা ছিল সেখানে রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হচ্ছে। অথচ ১৯৮০ সালে চালু হওয়া তৈরি পোশাকশিল্প দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়েছে। সেখানে লাখো লাখো শ্রমিক কাজ করছে। বছরে রপ্তানি হচ্ছে ৪২-৪৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
তিনি বলেন, শিল্পকারখানা স্থাপনে পরিবেশের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করে এমনভাবে তৈরি করা দরকার। তা ছাড়া নদী, খাল-বিলের পানি, মাটি ও পরিবেশ ধ্বংস না হয় সে ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের পাদুকা শিল্পকে উন্নত মানের শিল্পে পরিণত করতে ৩ বছরের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এখানে শিল্পকারখানার মালিক, শ্রমিক ও সরকারি সহযোগিতা পেলে শিল্পটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পে পরিণত হতে বেশি সময় লাগবে না। তিনি বলেন, ভৈরবের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে পাদুকার কারিগর। তাদেরকে উন্নত প্রশিক্ষণ দিতে পারলে তারা উন্নতমানের জুতা তৈরিতে পারদর্শী হয়ে উঠবে। তাই ভৈরবকে পাদুকা শিল্পের ব্র্যান্ডে পরিণত করা যাবে।
ভৈরবে দীর্ঘ ২০ বছর যাবৎ পাদুকা শিল্পে কাজ করছেন মোহাম্মদ নয়ন মিয়া। তিনি প্রথমে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করলেও বিগত ১৫ বছর যাবৎ নিজেই উদ্যোক্তা হিসেবে একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। হান্টার নামের কারখানাটির কর্ণধার ও সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশনের স্থানীয় এক্টিভিস্ট হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় পাদুকা শিল্পের উন্নয়নে মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছেন।
মোহাম্মদ নয়ন মিয়া বলেন, এ শিল্পে জড়িতের ৮০ ভাগই শ্রমিক থেকে মালিক হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা কম। শ্রমিক অধিকার বলতে তারা আগে তেমন কোনো বিষয়কে প্রাধান্য দিতেন না। বর্তমানে অনেক সচেতন হয়েছেন। আমরা ২০টি কারখানায় সচেতনতা বিষয়ক কাজ করছি। সেখানে এখন পর্যন্ত ১৩টি ছোট-বড় কারখানা শ্রমিকদের আইডি কার্ড দিচ্ছে। সাপ্তাহিক ছুটি, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করছে। যদিও এখানে এখনও কোনো শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে ওঠেনি। তবে ইউনিয়ন করার মতো এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মতি রয়েছে।
কমপ্লায়েন্স তৈরির পথ কতটা পূরণ হলো
শ্রমিকদের আইডি কার্ড, কর্মপরিবেশ উন্নত, চিকিৎসাসেবা ও ছুটিসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা বা কমপ্লায়েন্স পূরণ সাপেক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা অন্যান্য দেশে পণ্য রপ্তানির অন্যতম শর্ত। এদিকে বাংলাদেশে একটি টেকসই চামড়া খাত বিনির্মাণে ১ মার্চ ২০২৩ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ৩ বছর মেয়াদি ‘বিল্ডিং এ সাসটেইনেবল লেদার সেক্টর ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে দি ইউরোপীয় ইউনিয়ন। প্রকল্পটিতে সহযোগিতা করছে সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশন, ওশি ফাউন্ডেশন, সলিডার সুইস, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, বিলস ও প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনসহ দেশের ৬টি প্রতিষ্ঠানের কাজের ফলে এসব শর্ত পূরণে ভৈরবের জুতা শিল্প অনেকটা অগ্রসর হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে ভৈরবের বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় কাজ করা ২০টি কারখানার মালিকরা তাদের শ্রমিকদের আইডি কার্ড দিচ্ছেন। সাপ্তাহিক ছুটি, ঈদ বোনাসসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাড়াচ্ছেন। এ ব্যাপারে ভৈরব পিউ সুজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আক্তারুজ্জামান লিটন জানান, অনেক কারখানা শ্রমিকদের আইডি কার্ড দিচ্ছে। সাপ্তাহিক ছুটি ও কর্মপরিবেশও উন্নত করছে।
নেই সরকারি আর্থিক সহায়তা
ভৈরবের পাদুকা শিল্পে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সরকারি কোনো ঋণ নেই। দীর্ঘদিন ব্যাংকের পেছনে ঘুরেও কোনো অর্থ না পেয়ে আত্মীয়-স্বজন বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছে কারখানাগুলো। এ ব্যাপারে আক্তারুজ্জামান লিটন বলেন, আমরা ৬ মাস ব্যাংকের পেছনে ঘুরেও কোনো ঋণ পাই না। সবশেষে আমাদের ঠিকানা হয় উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়া। সরকারকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন। আমরা আগে থেকেই উদ্যোক্তা হয়ে আছি। আমাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
ভৈররের জুতা শিল্পের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছে ওশি ফাউন্ডেশন। তাতে দেখা গেছে, ভৈরবে ছোট, মাঝারি ও বড়সহ ১০ হাজারের অধিক জুতার কারখানা রয়েছে। সেখানে আড়াই লাখ শ্রমিক কাজ করছে। ছোট কারখানায় ৮-১০, মাঝারিগুলোতে ২০-৫০ ও বড়গুলোতে ৫০-২০০ শ্রমিক কাজ করে। সেখানে গড়ে ৩০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। দৈনিক ১৫-২০ কোটি টাকার অর্থ আদান-প্রদান হয়। এসব কারখানায় ৯৮ শতাংশ শ্রমিক ট্রেনিং না নিয়ে যুক্ত হয়। ৫০-৬০ শতাংশ বর্জ্য যত্রতত্র ডাম্পিং করা হয়।