সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৫ ২২:২৬ পিএম
কোরিয়া, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৬০ জন ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সোমবার (৭ এপ্রিল) বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আনোয়ারার কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (কেইপিজেড) এবং মিরসরাইয়ে অবস্থিত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘুরে দেখেন।
তারা কেইপিজেডের বিল্ডিং ১ গার্মেন্টস কোরিয়ান, কেপিপি ২, কেপিপি ১, বিল্ডিং ২১ কেএসআই গার্মেন্টস, গার্মেন্টস ২, টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটি, মেডিকেল, আর্ট গ্যালারিসহ বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করেন। পাশাপাশি কারখানার সুযোগ-সুবিধা স্বচক্ষে দেখেন।
ইয়াংওয়ান করপোরেশনের পক্ষ থেকে এ সময় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে কেইপিজেড কারখানার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়। পরিদর্শনকালে আগ্রহী বিনিয়োগকারীরা কেইপিজেডে বিনিয়োগ, উৎপাদিত পণ্য, রপ্তানির পরিমাণ, কর্মসংস্থান, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা এবং বিপত্তিসহ নানা বিষয়ে জানতে চান।
এ সময় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও ইয়াংওয়ান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয় ৭০ লাখ বর্গফুটের বেশি আয়তনের কেইপিজেডের এই প্রাকৃতিক পরিবেশে ৪৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার বেশিরভাগ তৈরি পোশাক খাতের। এর বাইরে একাধিক জুতা ও ব্যাগের কারখানা রয়েছে। সবকটি কারখানা মিলিয়ে এখানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
কেইপিজেডে শুধু কারখানা নয়, রয়েছে শ্রমিকদের জন্য ১০০ শয্যার একটি হাসপাতাল। নির্মাণ করা হয়েছে কর্মকর্তাদের জন্য আবাসন, বিনোদন সুবিধা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র। এ ছাড়া ৬০০ শয্যার একটি হাসপাতাল ও টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটও গড়ে তোলা হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা কর্মক্ষেত্র নিয়ে পরিদর্শনে আসা বিনিয়োগকারীদের কাছে সন্তুষ্টির কথা তুলে ধরেন।
এ সময় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন ইয়াংওয়ান করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও সিইও কিহাক সাং। তিনি বলেন, আমরা প্রথমবারের মতো এখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অফিসিয়ালি আমন্ত্রণ করেছি। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশে বিনিয়োগকারী টানতে কাজ করছে। আগের আর বর্তমান সরকারের মধ্যে পার্থক্য হলো, এই সরকার বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে এবং বিনিয়োগ বাড়াতে কাজ করছে। আমি মনে করি, ভবিষ্যতে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ একটি আদর্শ জায়গা। এখানকার মানুষ ও পরিবেশ খুবই উপযোগী। তাই প্রত্যেককে এখানে বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছি।
এ সময় পরিদর্শনে আসা রিক নামে নেদারল্যান্ডসের এক বিনিয়োগকারী বলেন, এখানকার কারখানা পরিদর্শন করে আমার খুব ভালো মনে হচ্ছে। এখানে নানা সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। আমি মনে করছি, এটা বিনিয়োগ উপযোগী।
একইভাবে চীনা এভিপি কোম্পানির ম্যানেজিং পার্টনার কেভিন মুউ নামে আরেক বিনিয়োগকারী বলেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য একটি ভালো জায়গা। এখানকার শ্রমিকদের মজুরিও কম। রয়েছে নানা সুবিধা। চীন আর এখানকার কারখানার মধ্যে অন্যতম পার্থক্য হলো চীনে মেশিনের মাধ্যমে সব কাজ করা হয়। আর বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে বেশিরভাগ কাজ শ্রমিকরা নিজ হাতে করেন। যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকে তাহলে অনেক চীনা বিনিয়োগকারী এখানে বিনিয়োগ করবেন বলে আশাবাদী।
বেজার প্রধান পরামর্শক মো. আবদুল কাদের খান বলেন, বিনিয়োগকারীদের কেইপিজেডের বিভিন্ন কারখানার কর্মকাণ্ড এবং সম্ভাবনাময় চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করা হচ্ছে। সরাসরি এখানে পরিদর্শনে আনার মুখ্য উদ্দেশ্য বিনিয়োগকারীরা যাতে স্বচক্ষে বাস্তব চিত্রটা দেখে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ হয়। এর মাধ্যমে আশা করি ভালো কিছু হবে।
পরিদর্শনে আসা বেজার পিডি আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ফারুক বলেন, কেইপিজেডকে বেজার সঙ্গে একীভূত করার যে-ই মিশন; সে লক্ষ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে বেজা এই আয়োজন করেছে। বিদেশিরা বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক কিছুই শোনেন। এখন সরাসরি পরিদর্শন করতে এসেছেন তারা। পজিটিভ মাইন্ড থেকেই তারা এই পরিদর্শনে এসেছেন। আশা করছি এর ভালো ফিডব্যাক পাব।
কেইপিজেড করপোরেশন (বিডি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান বলেন, বিনিয়োগকারীদের এখানে আনা হয়েছে একটি প্রাইভেট কারখানা দেখার জন্য। আমরা তাদের স্বাগত জানিয়েছি। তারা দেখুক বাংলাদেশের ইপিজেডগুলোর অবস্থা কেমন, বিনিয়োগের কী অবস্থা। বাংলাদেশে অবস্থিত কেইপিজেডগুলোর কোনটা কী অবস্থায় আছে তা সরাসরি দেখে তারা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন- সেটাই প্রত্যাশা। যাচাই-বাছাই এবং বিবেচনা করে কেইপিজেড সব ধরনের বিনিয়োগ নিতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
এদিকে চীনের একজন বিনিয়োগকারী ইয়াংওয়ান করপোরেশনের চেয়ারম্যান কিহাক সাংয়ের কাছে জানতে চান বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাধা কী? জবাবে কিহাক সাং বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা অন্যতম বাধা। তবে এই বাধা সত্ত্বেও বাংলাদেশ লাভজনক বিনিয়োগের জন্য উত্তম গন্তব্য। এ কারণে এই দেশে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন বলে জানান তিনি।
বিডার তথ্যানুযায়ী, আগামী বুধবার থেকে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট-২০২৫’ শীর্ষক বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করেছে বিডা।
সম্মেলনের অনানুষ্ঠানিক যাত্রার প্রথমদিনে গতকাল দেশি-বিদেশি আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের চট্টগ্রামের দুটি বিশেষ শিল্প এলাকা কেইপিজেড ও মিরসরাই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করানো হয়। মূলত সরেজমিন এই পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে সোমবার থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিনিয়োগ সম্মেলনের যাত্রা শুরু।
দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে বিশ্বের ৫০টি দেশের ৫৫০ জনের বেশি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। এজন্য সরাসরি বিনিয়োগ করবেন- এমন উদ্যোক্তার পাশাপাশি বিশ্বের নামিদামি বেশকিছু কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী কিংবা প্রতিনিধিরাও নিবন্ধন করেছেন।