ই-কমার্স
আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৫ ১২:২৭ পিএম
প্রবা গ্রাফিক্স
ডিজিটাল যুগে কেনাকাটা এখন হাতের মুঠোয়। কয়েক ক্লিকেই পাওয়া যায় নিজের পছন্দমতো পণ্য। মার্কেট বা দোকানে ভিড় করতে হয় না। তা ছাড়া অনলাইন কেনাকাটায় সময়ও অপচয় কম হয়। যে কারণে প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে মানুষ এখন ভার্চুয়াল ঈদ কেনাকাটায় ঝুঁকছেন। মানুষের আগ্রহ বাড়ায় এ খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগে যেখানে ঈদের কেনাকাটা ঘুরে ঘুরে করা হতো, এখন তা ঘরে বসেই অর্ডার করা যায়। এতে পরিশ্রম ও সময়Ñ দুটোই সেভ হচ্ছে। জামাকাপড় থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিস এখন এক ক্লিকেই ঘরের দরজায় চলে আসে। এই সুবিধার কারণে অনেক ক্রেতাই এবার ঈদের কেনাকাটা অনলাইনে সেরে নিচ্ছেন।
২০২১ সালে দেশের ই-কমার্সের বাজার ছিল ৫৬ হাজার ৮৭০ কোটি টাকার। বছর ঘুরতেই ২০২২ সালে তা ৬৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। তবে পরবর্তী সময়ে তা কিছুটা নিম্নমুখী ধারায় চলে যায়।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ই-কমার্সের বাজার প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেট ডটকমের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালে দেশের ই-কমার্সের বাজার হবে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। দেশে ৫০ হাজারের বেশি ফেসবুক পেজভিত্তিক ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। যা এফ-কমার্স বা ফেসবুকভিত্তিক অনলাইন ব্যবসা নামে পরিচিত। এদের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা। বর্তমানে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির মতো। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ ই-কমার্স থেকে পণ্য কেনেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সম্প্রতি প্রকাশিত অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ অনুসারে, দেশের ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৭৮টি প্রতিষ্ঠান অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিজেদের পণ্য ও সেবা দিয়ে থাকে।
কাজের চাপে ঈদ শপিংয়ে যেতে পারেননি চাকরিজীবী সিরাজুল ইসলাম। তিনি ঈদের কেনাকাটা ইতোমধ্যে অনলাইনের মাধ্যমেই সেরে ফেলেছেন। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আগের যেকোনো সময় থেকে এবার অফিসে কাজের চাপ বেশি। ফলে মার্কেটে যাওয়ার সময় পাইনি। একবার মার্কেটে গিয়ে দোকানে দেখলাম অনেক ভিড়। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম কেনাকাটা অনলাইনেই করব। ঈদের সব কেনাকাটা এবার অনলাইনেই করে ফেলেছি।
তিনি বলেন, অনলাইন মাধ্যমগুলো এখন অনেকটা বিশ্বস্ততা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ক্যাশঅন ডেলিভারি সিস্টেমটা অনেক আধুনিক। পণ্য পছন্দ না হলে ফেরত দেওয়া যায়। ফলে ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা বাড়ছে।
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের ঈদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে প্রচুর বেচাবিক্রি হচ্ছে। পোশাক, শাড়ি, গহনা, কসমেটিকস, জুতা, ব্যাগ, ইলেকট্রনিক্সসহ নানা পণ্য বিক্রি হচ্ছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, দেশে ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৭৮টি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে পণ্য ও সেবা বিক্রি করছে। অনলাইন শপ বা ফেসবুক পেজ ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটের দোকানগুলোও অনলাইনে পণ্য বিক্রি করছে।
বাড্ডার ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমান যুগে অনলাইন শপিং অপরিহার্য। আমি অনলাইন এবং অফলাইনÑ দুটো মাধ্যমেই পণ্য বিক্রি করি। আমি অনলাইনে ভালো সাড়া পাচ্ছি। ক্রেতারা পছন্দের পণ্য দেখে ইনবক্সে অর্ডার দেন এবং ই-কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্য পৌঁছে দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থায় ক্রেতাদের আর দোকানে আসতে হয় না।
তিনি বলেন, ভিড়, বিড়ম্বনা, দরদাম এই সব ঝামেলা এড়াতে ক্রেতারা এখন অনলাইনে কেনাকাটা করছেন। এতে ক্রেতারা পছন্দের পণ্য সহজেই পেয়ে যাচ্ছেন। প্রতিযোগিতার কারণে অনলাইনে দামও কম থাকে, তাই ক্রেতারা আকৃষ্ট হচ্ছেন।
আরেক ব্যবসায়ী মাসুম বিল্লাহও একই কথা বললেন। তার মতে, ঈদের বাজারে অনলাইনে পণ্য কেনার ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে। সব মিলিয়ে ভালো সাড়া পাচ্ছি। ঈদের অনলাইন কেনাকাটায় সাড়া অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে চাকরিজীবীরা বোনাস পাওয়ার পর কেনাকাটা বাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিযোগিতা বেশি।
অনলাইনে কেনাকাটার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে খন্দকার শাহাদাত হোসেন নয়ন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এবার অনলাইনে ঈদের কেনাকাটা করেছি। অনলাইনে কেনাকাটা করা অনেক সহজ এবং সময়ও বাঁচে। এই খাতে কিছুটা সমস্যা আছে। কিছু প্রতারক হয়তো প্রতারণা করছে। এদের সংখ্যা খুবই কম। সরকারের উচিত অনলাইনের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং ক্রেতাবান্ধব নীতিমালা তৈরি করা। তাহলে এই খাত আরও বড় হবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি।
ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ইক্যাব বলছে, দিনে ৭ লাখের বেশি ক্রয়াদেশ আসে অনলাইন শপিংয়ে। ঈদ এলে তা দাঁড়ায় ৮ থেকে ১০ লাখে। আর এর পেছনে মূলত কাজ করে নানাপ্রকার ছাড়।
দারাজের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার এএইচএম হাসিনুল কুদ্দুস রুশো বলেন, ‘আমাদের যদি কোনো অভিযোগ আসে সেটা যদি সঠিক হয় তাহলে আমরা সাথে সাথে তাদেরকে রিফান্ড করে দিই। তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা সেলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অনলাইনে কেনাকাটা একটি ক্রমবর্ধমান খাত। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এই খাতে নজর দেওয়া উচিত। কারণ এই খাতে সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগই তরুণ। নতুন প্রজন্ম যাদের আমরা জেন-জি নামে চিনি, তারাই অনলাইনের সবচেয়ে বড় ক্রেতা-বিক্রেতা। তারা অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর এবং ঝামেলা ছাড়াই ঘরে বসে শপিং করতে পারছেন। ফলে আগ্রহ বাড়ছে অনলাইন বাজারের।’