আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০২৫ ১৪:১৬ পিএম
ফাইল ফটো
দেশের ব্যাংক খাতের আর্থিক অবস্থা শক্তিশালী করতে এবং আমানতকারীদের সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কয়েকটি বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে ১০ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি হলে লভ্যাংশ দিতে পারবে না সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। আর তাতেই বেকায়দায় পড়েছে ২৩টি ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি। যার মধ্যে ৮টির খেলাপিই ৬০ শতাংশের বেশি। এগুলো হলোÑ পাকিস্তান ন্যাশনাল ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক।
ব্যাংকাররা বলেছেন, এ সিদ্ধান্ত অনেক ব্যাংককে লভ্যাংশ ঘোষণা করা থেকে বিরত রাখতে পারে, যা এ খাতের দুর্দশার মাত্রাকে তুলে ধরে। নীতিনির্ধারকরা আশা করছেন, কঠোর নিয়মকানুন ব্যাংকগুলোকে তাদের ব্যালেন্স শিট শক্তিশালী করতে এবং শেয়ারহোল্ডারদের রিটার্নের চেয়ে আমানতকারীদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে উৎসাহিত করবে। বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা মনে করেন, উদ্যোক্তা-পরিচালকরা পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে বেনামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন এবং তা পরিশোধ করছেন না। ফলে অনেক ঋণদাতার আর্থিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে।
১০ শতাংশের ওপরে ঋণ আছে আরও ১৫ ব্যাংক। যে ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ দেওয়াও এখন অনিশ্চিত। সে ব্যাংকগুলো হলোÑ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, আইএফইসি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, সোনালী ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণা-সংক্রান্ত নতুন একটি নীতিমালা করেছে। ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংক কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে না। যদিও এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ২০২৫ সমাপ্ত বছরের জন্য। তবে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থ যেসব ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিলম্ব সুবিধা নিয়েছে, তারা ২০২৪ সালের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে না। ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক ব্যাংক এবার লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হবে। গত বছর সমাপ্ত আর্থিক বছরের জন্য ব্যাংকগুলো লভ্যাংশ ঘোষণা শুরু করেছে। চলতি মার্চ ও এপ্রিল জুড়ে পুঁজিবাজারের ব্যাংকগুলোর বড় অংশই গত বছরের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণার কথা রয়েছে।
জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর জন্য লভ্যাংশ নীতি কিছুটা কঠোর করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে উন্নত সুশাসন নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। আগে অনেক ব্যাংক ডিফারাল সুবিধা গ্রহণ করেও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিত। এখন এটি বন্ধ করা হবে। ফলস্বরূপ ব্যাংকগুলোর শেয়ারের দাম প্রভাবিত হতে পারে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৬টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যেভাবে বেড়েছে, তাতে এসব ব্যাংকের পক্ষে এ বছর লভ্যাংশ ঘোষণা করা কঠিন হয়ে পড়বে। একই শঙ্কা রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রণে থাকা আইএফআইসি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও। এসব ব্যাংকের পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, গত বছর শেষে নিট মুনাফা করতে হলে ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে বিশেষ ছাড় দিতে হবে। এদিকে চলতি বছরের মার্চ থেকে ঋণ শ্রেণীকরণের নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ চলতি বছরে আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২৩টির খেলাপি ঋণ ছিল ১০ শতাংশের বেশি এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো অত্যধিক শ্রেণিবদ্ধ ঋণের কারণে গত বছর এ খাতের গড় খেলাপি ঋণ অনুপাত ২০ শতাংশের ওপরে ছিল। আগামী ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত আর্থিক বছরের জন্য কার্যকর হওয়া এই বিধিনিষেধগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লভ্যাংশ বিতরণ কাঠামোর বৃহত্তর কঠোরীকরণের অংশ।
এ ছাড়া ব্যাংকগুলোকে আর ধরে রাখা আয় থেকে নগদ লভ্যাংশ প্রদানের অনুমতি দেওয়া হবে না এবং যাদের বিধিবদ্ধ নগদ রিজার্ভ অনুপাত (সিআরআর) বা বিধিবদ্ধ তরলতা অনুপাত (এএলআর) বজায় রাখতে ব্যর্থতার জন্য জরিমানা বা জরিমানা বকেয়া রয়েছে, তারা সম্পূর্ণরূপে লভ্যাংশ প্রদানের অযোগ্য হবে। যেসব ব্যাংকের প্রয়োজনীয় বিধানের ঘাটতি রয়েছে, অথবা যারা এ ধরনের ঘাটতি পূরণের জন্য স্থগিতকরণ পেয়েছে, তাদেরও সংশোধিত নিয়মের অধীনে লভ্যাংশ প্রদান থেকে বিরত রাখা হবে। এমনকি অনুগত ঋণদাতাদের জন্যও লভ্যাংশ এখন তাদের পরিশোধিত মূলধনের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।
তবে যেসব ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) কমপক্ষে ১৫ শতাংশ বজায় থাকবেÑ যার মধ্যে ২ দশমিক ৫ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ বাফার অন্তর্ভুক্ত থাকবেÑ তাদেরকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ প্রদানের অনুমতি দেওয়া হবে; তবে শর্ত থাকে যে, অর্থ প্রদানের ফলে তাদের সিএআর ১৩ শতাংশের নিচে নেমে না যায়।
যাদের সিএআর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, যার মধ্যে সংরক্ষণ বাফার অন্তর্ভুক্ত, তারা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ বিতরণ করতে পারবে। ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সিএআর রয়েছে, তারা কেবল স্টক লভ্যাংশ প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশ দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, যা ক্রমাগত উচ্চ মাত্রার খারাপ ঋণ এবং মূলধন ঘাটতির জন্য তদন্তের আওতায় রয়েছে।
জানা গেছে, যখন এই উদ্যোক্তা-পরিচালকরা ব্যাংকের বোর্ডে বসেন, তখন ব্যাংকগুলোর দুর্বল আর্থিক অবস্থা সত্ত্বেও তারা লভ্যাংশ অনুমোদন করেন। যেহেতু উদ্যোক্তা-পরিচালকরা ব্যাংকগুলোর শেয়ারের একটি বড় অংশের মালিক, তাই তারা লভ্যাংশের প্রাথমিক সুবিধাভোগীও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নিয়ম এই অনিয়মগুলোকে কিছুটা রোধ করতে সাহায্য করতে পারে।
জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘যদি কোনো ব্যাংকের স্বাস্থ্য ভালো না থাকে, তাহলে তারা কেন লভ্যাংশ দেবে? বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ব্যাংকগুলোর স্বাস্থ্যের উন্নতির দিকে ব্যবস্থাপনার মনোযোগ নিশ্চিত করার জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। এটি শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতকেই লাভবান করবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করেছে, তার ২০ দশমিক ২০ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বরÑ ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বরে বেড়ে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা হয়েছে। ফলে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬০ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে সব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণ ছিল ১৭ লাখ ১১ হাজার ৪০১ কোটি টাকা।
ব্যাংকগুলোর গত ডিসেম্বরভিত্তিক সাময়িক আর্থিক প্রতিবেদন থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী পাকিস্তান ন্যাশনাল ব্যাংকে ৯৮ দশমিক ৭০, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ৯০ দশমিক ৭২, ইউনিয়ন ব্যাংক ৮৭ দশমিক ৯৮, পদ্মা ব্যাংক ৮৬ দশমিক ৫৩, জনতা ৭২, বেসিক ব্যাংক ৬৮ দশমিক ৫৭, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৬২ দশমিক ৪৯, ন্যাশনাল ব্যাংক ৬০ দশমিক ৫০, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ৪৩ দশমিক ৮৬, আইএফইসি ব্যাংক ৩৮ দশমিক ৪৯, অগ্রণী ব্যাংক ৩৮ দশমিক ৪৬, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ৩৪ দশমিক ৭৯, রূপালী ৩১ দশমিক ৭৩, গ্লোবাল ইসলামী ৩০ দশমিক ৮৬, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ২৯ দশমিক ৩৩, এবি ব্যাংক ২৫ দশমিক ৯৯, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ২১ দশমিক ০৮, সোনালী ১৮ দশমিক ৬১, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ১৭ দশমিক ২৬, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ১৪ দশমিক ১১, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ১২ দশমিক ১১, ওয়ান ব্যাংক ১০ দশমিক ৫৮ এবং ব্যাংক এশিয়ায় ১০ শতাংশ খেলাপি।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ব্যাংক খাত এখনও ঠিক হয়নি। বিগত সরকার এ খাতে লুটপাট করেছে। ফলে অনেক ব্যাংক মুনাফা করতে পারবে কি না সন্দেহ আছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার কারণে অনেক ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারবে না। ফলে ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক লেনদেন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। লভ্যাংশ বিতরণে বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতিমালা করেছে, সেটি ভালো উদ্যোগ। তবে এটির পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন।’