প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২০:০০ পিএম
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ইতিবাচক ধারা ফিরলেও অক্টোবর থেকে বিক্রি কমেই চলেছে। এ সময়ে বিক্রির পরিবর্তে ভাঙানোর প্রবণতা বেড়েছে। এতে নিট বিক্রি (বিনিয়োগ) ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়েছে ২ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। এ সময়ে সার্বিকভাবে সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে ভাঙানো হয়েছে বেশি।
এদিকে চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকার ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি সরকারের ঋণ হিসেবে গণ্য হয়, যা বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যবহার হয়ে থাকে। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছে। তা ছাড়া নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের সঞ্চয়প্রবণতাও কমেছে। আবার আমানত ও সরকারের বিল-বন্ডের সুদের হার বেড়েছে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যাংক ও বিল-বন্ডে স্থানান্তর হয়েছে। এসব কারণে সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ কমেছে। তবে নতুন বছরের জানুয়ারি থেকে সুদহার বাড়ানোর ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৩০ হাজার ১০৯ কোটি টাকার। বিপরীতে ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। এর ফলে অর্থবছরের ৬ মাসে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক প্রায় ২ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে ভাঙানোর প্রবণতা কম থাকায় নিট বিনিয়োগ ইতিবাচক ধারায় ছিল। তবে পরের টানা ৩ মাসে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতা বেড়ে যায়, এতে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, সর্বশেষ ডিসেম্বর মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ৫৪০ কোটি টাকার। একই মাসে (ডিসেম্বর) ভাঙানো হয়েছে ৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকার। এতে নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়েছে ৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকার। এর আগের মাস নভেম্বরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার। একই মাসে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ১৫০ কোটি টাকার। অর্থাৎ নভেম্বরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয় ৩ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। অক্টোবর মাসে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ৫ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা এবং ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৮৩ কোটি টাকার। সে হিসেবে অক্টোবরে নিট বিক্রি ঋণাত্মক ছিল ৩ হাজার ২২৪ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাস ব্যতিক্রম ছিল। প্রথম মাস জুলাইয়ে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি ছিল ৪ হাজার ৯১১ কোটি টাকার। একই মাসে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭২৪ কোটি টাকার। সে হিসাবে জুলাইতে নিট বিনিয়োগ আসে ২ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। আগস্ট মাসে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ৪ হাজার ১১২ কোটি টাকা। একই মাসে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ মাস থেকে নিট বিনিয়োগ ২ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ৫ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। আর একই মাসে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ ১ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে নিট বিনিয়োগ ৪ হাজার ১০৯ কোটি টাকা ছিল, যা একক মাস হিসেবে সেপ্টেম্বর শীর্ষে ছিল।
কোন সঞ্চয়পত্রে কী পরিমাণ মুনাফা
এতদিনে সঞ্চয়পত্র কেনায় নানা শর্তারোপ করা হলে সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার মুনাফা বাড়িয়েছে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে, যা চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। এতে আশার আলো খুঁজে পেয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। খাত-সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, মুনাফার হার বাড়ানোর ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে গতি আসবে।
সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড ও আমানতের সুদ বাড়ার কারণে গত জানুয়ারি থেকে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাড়ানো হয়েছে। পরিবার সঞ্চয়পত্রে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ থাকলেও এখন এই সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মুনাফা মিলবে সাড়ে ১২ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা আসবে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফা মিলবে ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা মিলবে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এই সঞ্চয়পত্র কিনলে এতদিনে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে মেয়াদপূর্তির আগে মুনাফা ছিল ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। জানুয়ারি থেকে এই সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফা মিলবে ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা মিলবে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
আর ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে মেয়াদপূর্তির বছরে মুনাফা ছিল ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। জানুয়ারি থেকে এই সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মুনাফা মিলবে ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা হবে ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে মেয়াদি হিসাবে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মুনাফা আসবে ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা মিলবে ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ।