প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২১:০৩ পিএম
বাংলাদেশ বিমান একটি অথর্ব প্রতিষ্ঠান বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘লোকসান কমাতে বিমানকে দুইভাগ করে একভাগ বিদেশি সংস্থাকে দিয়ে পরিচালনা করা হবে এবং অন্যভাগ বিমানের মাধ্যমে পরিচালনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে টাস্কফোর্স কমিটির প্রতিবেদনে। সমান সুযোগ সুবিধা পাবে দুই সংস্থাই। এরপর দেখব কোন সংস্থা ভালো করেছে।’
সোমবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে টাস্কফোর্স কমিটির সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘এটিকে কিভাবে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান এবং আধুনিকায়ন করা যায় সেটা নিয়ে কাজ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে বিদেশ থেকে কোনো এক্সপার্টকে এনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) করতে হবে।’
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বিমান পুনর্গঠন নিয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একটি নতুন এয়ারলাইন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিযোগিতা তৈরি করতে হবে। নতুন এই এয়ারলাইনটির সম্ভাব্য নাম হতে পারে ‘বাংলাদেশ এয়ারওয়েজ’। এটির পরিচালনা করা হবে একটি স্বাধীন, বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এটি বিমানের বিদ্যমান সম্পদের একটি অংশ ব্যবহার করবে এবং উভয় সংস্থা আলাদা বাজার ও রুট টার্গেট করবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবার মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানটি বাজার থেকে অপসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, এখন থেকে জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিটি সভাতেই প্রকল্প রাখা হচ্ছে। এতদিন বলা হতো বাপেক্সের সক্ষমতা নেই। আমরা এটার সক্ষমতা বাড়াব। প্রয়োজনে মালয়েশিয়ার মতো অন্য দেশের সংস্থার সহায়তা নিব। তবে আমদানিতে না গিয়ে বাপেক্সে সক্ষম করব।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নতুন নীতিমালা ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত নীতির অস্পষ্টতার কারণে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশে আসতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বর্তমানে চারটি পৃথক সংস্থা কাজ করছে, যা সময়ক্ষেপণ ও জটিলতা তৈরি করছে। এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অধীনে বিনিয়োগ অনুমোদনের সব কার্যক্রম আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা সহজেই অনুমোদন পেতে পারবেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিনিয়োগ সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত হবে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এক জায়গায় করতে পারলে ভালো হতো। আমাদের এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর শিক্ষায় মনোযোগ দিতে হবে। ভারত স্বাধীনতা পরপর প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্ববিদ্যালয় করেকরা হয়, তখন কি কারণে করা হয় জানিনা। তবে এটিকে বিশ্বমানের করতে পেরেছে। কিন্তু এখন তাকে বিশ্বমানের বলা যায় না। এখন এআই যুগ, একারণে নতুন টেকনোলজি করা যায় সেটা নিয়ে কাজ করা দরকার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা হলেও অনেক জায়গায় তা এখনো কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। এই সমস্যা দূর করতে কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলকে বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালার আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কারিগরি শিক্ষাখাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে, যাতে দেশে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায়।
এছাড়া, ঢাকা শহরতলীতে একটি গ্লোবাল এক্সেলেন্স সেন্টার স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত (এসটিইএম) বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার জন্য কাজ করবে। পাশাপাশি পরিবেশবিজ্ঞান, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং জৈবপ্রযুক্তি বিষয়েও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করবে। ভারতের আইআইটিসহ আন্তর্জাতিক মডেলের ওপর ভিত্তি করে এটি গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে।
সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তন নিয়ে গবেষণার জন্য ‘সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড বিহেভিয়ারাল চেঞ্জ কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ’ (সিএসবিসিসিএন্ডআর) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি সমাজের বিভিন্ন স্তরে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য গবেষণায় মনোযোগ দেবে। এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের গবেষণা, শিক্ষা এবং পরিবহন খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে দক্ষ শ্রমিক রপ্তানি এবং দেশে কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, প্রথমবারের মতো জাপান খুব বড় ভাবে তিন ক্যাটাগরিতে বৃদ্ধদের কেয়ার করার জন্য লোকবল নিচ্ছে। নার্সিংয়েও নিচ্ছে কিন্তু আমরা পারব না। হোটেলের জন্যও জনবল নিচ্ছে আমরা এটাকে কাজে লাগাতে পারি। এজন্য জাপানের মানুষ এসে প্রশিক্ষণ দিবে এরপর নিয়োগ দিবে। আমরা জাপানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, এটি একটি ভালো সুযোগ।
টাস্কফোর্সের প্রধান কে এ এস মুর্শিদ বলেন, আমরা বছরের পর বছর চাদাবাজি দেখে আসছি কেন বন্ধ করতে পারছি না। এটাকে দূর করার জন্য আমরা এন্টি গুন্ড স্কোয়াড করা পরামর্শ দিয়েছি। এটি কাজ করবে কিনা জানি না তবে শুরু করে দেখি। আপনি বলবেন অন্য দেশে হয়েছে তাহলে এখানে কেন হবে না।
তিনি বলেন, স্টুডেন্ট পলিটিক্স দিয়ে আমরা বেশি উপকৃত হয়নি। ছাত্রদের কাছে এবং নেতাদের কাছে এটার সুবিধা চলে যায়। বিশ্বে কোন দেশে এ ধরনের সংগঠন আছে কি?
কোন খাতকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, কোনটাকেই এখনো আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। সব মন্ত্রণালয়ের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। আমার মন্ত্রণালয়ের যে সুপারিশ এসেছে সেটা গুরুত্ব দিচ্ছি। কে কোনটা দিবে সেটা তারাই ভালো বলতে পারবে।
উল্লেখ্য, গণআন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে গত ১০ সেপ্টেম্বর এই টাস্কফোর্স গঠন করে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুর্শিদকে ১২ সদস্যের এই টাস্কফোর্সে সভাপতি করা হয়। সদস্য সচিব হন পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য (সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগ) মো. কাউসার আহাম্মদ।