প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২২:০৪ পিএম
বাজার ব্যবস্থাপনায় আগের সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছিল, বর্তমান সরকারও একই উদ্যোগ নিয়েছে। এরফলে বাজার তদারকিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এছাড়া বড় ব্যবসায়ি ও ছোট ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বাজারে পণ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছেন, আগের মতোই পথে-ঘাটে চাঁদাবাজি হচ্ছে। এতে নিত্যপণ্যের দাম মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
রবিবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত ‘খাদ্যপণ্যের যৌক্তিক দাম: বাজার তত্ত্বাবধানের কৌশল অনুসন্ধান’ শীর্ষক নীতিসংলাপে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন বক্তারা। সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
তিনি বলেন, ‘সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার বড় কারণ হলো, বাজারের পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছে নেই। বার্ষিক উৎপাদন ও সরবরাহের তথ্য সরকারের কাছে থাকলেও দৈনন্দিন চাহিদা ও জোগানের তথ্য নেই। অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশক ও সরবরাহের তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে না থাকলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাওয়া যায়। ব্যবসায়ীদের কাছেও এ তথ্য থাকে। এ রকম একটা পরিস্থিতি দিয়ে সরকারের পক্ষে কখনো বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘খাদ্যপণ্যের বাজার বড় হচ্ছে। কারণ, মানুষের আয় বাড়ছে। এতে বাজার তদারকি দুর্বল হচ্ছে। একই সঙ্গে বাজারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
বাজার তদারকিতে আগের সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, বর্তমান সরকারও একই উদ্যোগ নিচ্ছে। এতে আমি মর্মাহত। আসলে আমরা নীতির দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়েছি। এটা ভাঙতে হবে, অন্তত নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে।’
অনুষ্ঠানে নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের বাজারব্যবস্থা অনেকটা সমঝোতা ও সহযোগিতাপূর্ণ। বড় বড় প্রতিষ্ঠান যেখানে একে অপরের প্রতিযোগী হওয়ার কথা, সেটি না হয়ে তারা নিজেদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে টেরিটোরি বা সীমানা নির্ধারণ করে নিয়েছে। বড় বড় কিছু প্রতিষ্ঠানই আমদানি বাণিজ্যের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।’
তিনি বলেন, ‘মাঝারি বা ছোট আমদানিকারকেরা কোথা থেকে কী পরিমাণ আমদানি করবেন, সেটিও ঠিক করে দেন বড়রা। ফলে বাজারব্যবস্থায় প্রতিযোগিতার বদলে সমঝোতা বা সহযোগিতাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে কিছু সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে। এই ব্যবস্থার বদলে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।’
এ ছাড়া বাজারে আগের মতোই চাঁদাবাজি চলছে, সিন্ডিকেটও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন সারজিস আলম। তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ করতে গিয়ে নিজেদের অল্প কিছুদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, রাজধানীর বড় বড় পাইকারি বাজারগুলোতে এসে পণ্যের দাম শুধু কয়েক গুণ বেড়ে যায় চাঁদাবাজির কারণে। এসব চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট আবার নিয়ন্ত্রণ করে রাজনৈতিক দলগুলো। তাই বাজারব্যবস্থায় সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা দরকার।’
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের যে দাম দেখছি, তাতে তো দেশে দাম কমার কথা। বাড়ার কোনও কারণ তো দেখি না। আমি আশা করি, এ কাজটা করতে পারবো।’
আমাদের নীতিগুলো ধনিক শ্রেণিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য হয়েছে উল্লেখ করে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘ভোক্তা বা সাধারণ মানুষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এসব নীতি গ্রহণ করা হয় না। বিগত ১৫ বছর দেশে উল্লেখযোগ্য কোনও বিনিয়োগ হয়নি- তাহলে কর্মসংস্থান কীভাবে হবে? আমরা কার কাছ থেকে কর আদায় করবো?’
টিসিবির তালিকা নিয়ে অনিয়ম হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উপকারভোগীদের সংখ্যা এক কোটি, শুনতে ভালোই লাগছে। কিন্তু আমরা যখন প্রাথমিকভাবে যাচাই করেছি, দেখলাম ৪৩ লাখ ভুয়া। আমার ধারণা, এটি এক্সট্রা লেভেলে যাচাই করলে আরো ২০-২৫ লাখ ভুয়া পাওয়া যাবে। অন্যদিকে, ব্যবসায়ীরা টিসিবির টেন্ডারে অংশ নেন না। আমি অনুরোধ করছি আপনারা অংশ নিন।’
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) থাকার পরও যারা দীর্ঘদিন ধরে রিটার্ন দাখিল করছেন না, তারা শিগগির নোটিশ পাবেন।’
তিনি বলেন, ‘অনেক ব্যবসায়ীই ভ্যাট চালান দিতে চান না। আমাদের নাগরিকরা বিদেশে গিয়ে আইন ভঙ্গ করছেন না। কিন্তু, দেশে আমরা আইন মানি না। তার মানে, এ সমস্যার সমাধান করতে আইনের প্রয়োগ করা হয় না, এটাই সমস্যা।’
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বাজারে ৩১টা পণ্যের শুল্ক কমালেও তার প্রভাব পড়েনি। অন্যদিকে কদিন আগে যখন ভ্যাট বাড়ানো হলো, ওইদিন রাতেই পণ্যের মূল্য বেড়ে গেল। বিশ্ববাজারে গমের দাম দীর্ঘদিন ধরেই কম কিন্তু আমাদের এইখানে এক পয়সাও কমেনি।’