প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:৫২ এএম
ফাইল ফটো
দেশে মোবাইলে কথা বলা ও ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ আবারও বাড়ানো হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে মোবাইল সেবার ওপর ৩ শতাংশ সম্পূরক কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে অতিরিক্ত এক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, এ প্রস্তাব ইতোমধ্যে অনুমোদন পেয়েছে এবং শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
মোবাইল ফোন অপারেটর ও এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, নতুন কর ব্যবস্থায় মোবাইল রিচার্জে খরচ আরও বেড়ে যাবে। ১০০ টাকা রিচার্জ করলে বর্তমানে কর বাবদ ৫৪ দশমিক ৬ টাকা কাটা হয়। কিন্তু কর বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে করের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ৫৬ দশমিক ৩ টাকা। এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।
শুল্ক বাড়ানোর উদ্যোগ এমন সময় নেওয়া হচ্ছে যখন দেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কমছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে মোবাইল ফোনের গ্রাহক ছিল ১৮ কোটি ৮৭ লাখ, যা গত জুনের চেয়ে ৭৩ লাখ কম। অন্যদিকে জুনের চেয়ে মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯৭ লাখ কমে ১৩ কোটি ২৮ লাখে নেমেছে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে মোবাইল ফোন সেবায় সম্পূরক শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী, বর্তমানে মোবাইলে ১০০ টাকার রিচার্জ করলে সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ও সারচার্জ দিতে হয় ২৮ দশমিক ১ টাকা, রেভেনিউ শেয়ার ও মিনিমাম ট্যাক্স দিতে হয় ৬ দশমিক ১ টাকা, পরোক্ষ কর দিতে হয় ২০ দশমিক ৪ টাকা। মানে গ্রাহক ১০০ টাকা রিচার্জ করলে সব মিলিয়ে কর দেন ৫৪ দশমিক ৬ টাকা।
তবে এখন সম্পূরক শুল্ক যদি আরও ৩ শতাংশ বাড়ানো হয় তাহলে কর দিতে হবে ৫৬ দশমিক ৩ টাকা। এর মধ্যে সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ও সারচার্জ কাটবে ২৯ দশমিক ৮ টাকা। রেভেনিউ শেয়ার ও মিনিমাম ট্যাক্স কাটবে ৬ দশমিক ১ টাকা, পরোক্ষ কর কাটবে ২০ দশমিক ৪ টাকা। ফলে গ্রাহক ১০০ টাকা রিচার্জ করলে সবমিলিয়ে কর দিতে হবে ৫৬ দশমিক ৩ টাকা। এতে করে গ্রাহক ১০০ টাকায় ব্যবহার করতে পারবেন মাত্র ৪৪-৪৫ টাকা।
বেশ কয়েকজন গ্রাহক এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে জানিয়েছেন, সেবার মান বাড়ানোর উদ্যোগ না নিয়ে কর বাড়ানো অযৌক্তিক। সাজিদ নামে এক গ্রাহক বলেন, ‘দেশে এখনও কলড্রপ ও নেটওয়ার্ক সমস্যার সমাধান হয়নি। এমনকি অনেক সময় কথা বুঝতেও অসুবিধা হয়। এসব সমস্যার সমাধান না করে কর বাড়ানো সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।’
একই মত প্রকাশ করেছেন সোহেল আলম নামের আরেক গ্রাহক। তিনি বলেন, ‘বর্তমান কলরেটই গ্রাহকদের জন্য কষ্টদায়ক। তার ওপর নতুন করে কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়াবে। আমরা সরকারকে অনুরোধ করব, এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সেবার মান বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে।’
বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, ‘শুল্ক বাড়ানোর উদ্যোগে মানুষ মোবাইলে কথা বলা কমাতে পারে। এতে রাজস্ব আরও কমে যেতে পারে।’
রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার সাহেদ আলম বলেন, ‘বাজেটের এত আগেই এ সিদ্ধান্ত ব্যতিক্রম। এটি বাড়ানো উচিত নয়।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত মোবাইল সেবার ওপর সাধারণ মানুষের নির্ভরশীলতা কমিয়ে দিতে পারে। বর্তমানে মোবাইল ফোন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ই-কমার্স, শিক্ষা এবং পেশাগত কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু খরচ বৃদ্ধির কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে কম কথা বলবেন বা সেবা ব্যবহার সীমিত করবেন।
বাংলাদেশ মোবাইল ফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ইন্টারনেট সেবার ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় তলানিতে থাকলেও করের ক্ষেত্রে শীর্ষে। যেখানে দেশের ৪৮ শতাংশ জনগণ এখনও ইন্টারনেট সেবার বাইরে, সেখানে নতুন করে এই উচ্চ কর আরোপ তাদের আরও পিছিয়ে দেবে। এটি বৈষম্যমূলক এবং সমাজে নতুন ধরনের বিভাজন সৃষ্টি করবে।’
এ ধরনের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘জনগণের পকেট কেটে রাষ্ট্রের অর্থ জোগানোর এ উদ্যোগ অগ্রহণযোগ্য। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা প্রাণ দিয়েছিল একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ও সেবামূলক রাষ্ট্র গঠনের জন্য। কিন্তু বর্তমান সরকার ও এনবিআর সামাজিক দায়বদ্ধতা ভুলে গিয়ে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি হঠকারী, অযৌক্তিক এবং ফ্যাসিবাদী আচরণের প্রতিফলন। সরকারকে অবশ্যই এ ধরনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে।’
সেবার মান উন্নত না করে কর বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করবে। বিশেষ করে যখন দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি চলছে, তখন মোবাইল সেবার খরচ বৃদ্ধির প্রভাব আরও নেতিবাচক হবে। সরকারের উচিত কর বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা এবং জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া।