ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৫ ২৩:৪২ পিএম
আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৫ ০০:৫৮ এএম
ফাইল ফটো
আবহমানকাল থেকে আমনকে খাদ্য উৎপাদনের সুবর্ণ মৌসুম বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এ বছর আমনের ভরা মৌসুমেই বাড়ছে চালের দাম। বিশেষ করে মোটা চালের দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষ চাপে পড়ে গেছে। অথচ সবার আশা ছিল এই সময়ে বুঝি চালের দাম কিছুটা হলেও কমবে! চালের দাম নিয়ে খাদ্য উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা তাদের বক্তব্য দিলেও দাম বাড়ার গতিতে লাগাম টানা যাচ্ছে না।
দাম নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার বাহাস
বুধবার রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোডের মুক্তিযোদ্ধা কেবি কাঁচাবাজারের মুদিদোকানি মো. আলমগীর হোসেন বলেন, চালের দাম বাড়ায় ক্রেতাদের সঙ্গে আমাদের রীতিমতো ঝগড়া লেগে যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো কোনো চালের কেজিতে বেড়েছে ৩ থেকে ৪ টাকা।
আলমগীর বলেন, এক কেজি চাল বিক্রি করলে ১ থেকে ২ টাকা লাভ হয়। কিন্তু ক্রেতাদের যে পরিমাণ কথা শুনতে হয় তাতে অনেক সময় মনে হয় দোকানে চালই রাখব না।
বাজারটিতে দেখা যায়, মিনিকেট ডায়মন্ড ৫ টাকা বেড়ে ৮২ টাকা কেজি, স্বর্ণা ২ টাকা বেড়ে ৫৫, ব্রি২৮ ২ টাকা বেড়ে ৬৩, মিনিকেট মোজাম্মেল ৫ টাকা বেড়ে ৮৫, মিনিকেট রশিদ ৭৬, নাজিরশাইল ৮৩-৮৫, মিনিকেট সেনা ৭৮-৮০, নতুন চাল ডলফিন (ব্রি২৮) ৬২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মহাখালী কাঁচা বাজারের চাল ব্যবসায়ী জাকির হোসেনের সঙ্গে কথা হয় গত মঙ্গলবার। তিনি বলেন, চালের দাম শুনলেই অনেক ক্রেতা রেগে যান। উল্টো প্রশ্ন করেন, এখন চালের দাম এত বেশি কেন হবে?
বাজারটিতে দেখা গেছে, ১ নম্বর মিনিকেট ৭৫ টাকা কেজি, স্পেশাল মিনিকেট ৭৫, সাধারণ মিনিকেট ৬৬, স্পেশাল-২৮ ৬০ টাকা, স্পেশাল নাজির ৮৫ ও সাধারণ নাজিরশাইল ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গত নভেম্বরে খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেছিলেন, ‘আমন ধান বাজারে এলে চালের দাম কমবে। তার ওই বক্তব্য মনে করিয়ে দিয়ে মামুন ফরাজী নামে এক ক্রেতা বলেন, খাদ্য উপদেষ্টার বক্তব্যের ২০ দিন পর বাজারে চালের দাম না কমে বরং বেড়েছে।
সাময়িক মজুদদারিকে দায়ী করলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা
চালের দাম বাড়ার পেছনে সাময়িক মজুদদারি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন। বুধবার টিসিবির জানুয়ারি মাসের পণ্য বিক্রির কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বর্তমানে আমনের ভরা মৌসুম চলছে। বাজারে চালের ঘাটতি নেই। ফলে চালের যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তা অযৌক্তিক। দাম বাড়ার পেছনে সাময়িক মজুদদারি হয়েছে। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যাপকভাবে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, চালের মূল্যবৃদ্ধির সমস্যাটি স্বীকার করে নিতে হবে। ভোক্তাপর্যায়ে বিশেষ করে নাজিরশাইল ও মিনিকেটÑ এ দুটি চালের দাম বেশখানিকটা বেড়েছে। পাইকারি পর্যায়ে যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তার চেয়ে খুচরা পর্যায়ে অনেক বেশি বেড়েছে। এর কারণ খোঁজার চেষ্টা চলছে। সার্বিকভাবে এই মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক মনে হয়েছে।
বাজারে চালের ঘাটতি নেই জানিয়ে সেখ বশির উদ্দিন বলেন, প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী বাজারে চালের ঘাটতি নেই। সরকারের চালের মজুদ, স্থানীয় উৎপাদন ও সংগ্রহে ঘাটতি নেই।
চালের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকার আমদানি উদারীকরণের নীতিতে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমদানি উদার করতে গত দুই দিন আমরা গভর্নর, খাদ্য উপদেষ্টা, টিসিবি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতিতে আপাতত আমদানিকেন্দ্রিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ চাল আমদানির প্রস্তুতি চলছে। আশা করি, এতে চালের দাম কমবে।
শুল্ক ছাড়ের পর বাজারের পরিস্থিতি
গত ২০ অক্টোবর বাজারে সরবরাহ বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চাল আমদানির ওপর তিন ধরনের শুল্ক কমায়। আগের ৫০ শতাংশের জায়গায় শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। ২৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্কের মধ্যে ২০ শতাংশ কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। তা ছাড়া ৫ শতাংশ হারে আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়। ৫০ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে রাখা হয় মাত্র ২০ শতাংশ। এ সময় এনবিআর জানিয়েছিল, শুল্ক কমানোর কারণে চালের আমদানি মূল্য কেজিতে ১৪ টাকা ৪০ পয়সা কমবে।
এদিকে চালের আমদানি বাড়লেও কমছে না দাম। এক মাসের ব্যবধানে গত ডিসেম্বরে ৬৪৫ শতাংশ বেড়েছে চালের আমদানি। আর বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৩১ হাজার ৩২৬ শতাংশ। তার পরও বাজারে চালের দাম চড়া বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ৫৫ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন চাল আমদানি হয়েছে। কিন্তু নভেম্বরে চাল আমদানি হয়েছিল মাত্র ৭ হাজার ৫০৭ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে চালের আমদানি বেড়েছে ৬৪৫ শতাংশ। আর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চাল আমদানি হয়েছিল মাত্র ১৭৮ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চালের আমদানি বেড়েছে ৩১ হাজার ৩২৬ শতাংশ। তার পরও বাজারে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে।
এবার আমনে উৎপাদন কত
আমন মৌসুমে চালের উৎপাদন নিয়ে গত মৌসুমে যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তার প্রায় পূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক সরকার শফি উদ্দীন আহমদ। বুধবার তিনি বলেন, এ বছর বন্যার কারণে ধানক্ষেতের ক্ষতি হলেও উৎপাদন বেশি হওয়ায় তা পুষিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত ৯৭ ভাগ ধান মাড়াই হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ১ কোটি ৬৩ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হয়েছে। পুরোপুরি মাড়াই হয়ে গেলে তা ১ কোটি ৬৭ লাখ মেট্রিক টনে গিয়ে দাঁড়াবে।
আমনের ভরা মৌসুমে কেন দাম বাড়ছেÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, এ বিষয় সম্পূর্ণভাবে মিলারদের ওপর নির্ভর করছে। কেননা কৃষকরা উৎপাদন করেই ধান বিক্রি করে দেন। মিলাররা তা কিনে চালে রূপান্তর করে বাজারে ছাড়েন। তাই দাম বাড়ার বিষয়টি মিলারদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সরকার শফি উদ্দীন আহমদ বলেন, বিগত সময়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় একটি নির্দেশনা দিয়েছিল যে, মিলারদের মিলগেটে প্রতিটি বস্তায় দাম লিখে দিতে হবে। এটি এখন অনেক মিলার মানছেন না। এটি যদি করা হতো তাহলে তাদের কাছ থেকে জবাবদিহি আদায় করা সহজ হতো।
তিনি বলেন, আমাদের দাবি হচ্ছেÑ মিলগেটে প্রতিটি বস্তায় মিলগেট ও খুচরা দাম লিখে দিতে হবে।
অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ ও মজুদ পরিস্থিতি
সরকার কৃষকের কাছ থেকে ধান ও মিলারদের কাছ থেকে সিদ্ধ ও আতপ চাল কিনে থাকে। বাজার থেকে এবার প্রতি কেজি ৩৩ টাকা দরে সাড়ে ৩ লাখ টন ধান, ৪৭ টাকা দরে সাড়ে ৫ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ৪৬ টাকা কেজি দরে ১ লাখ টন আতপ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধ চাল ও ধান কেনা অব্যাহত থাকবে ১৭ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত। গত ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ধান সংগ্রহ হয়েছে ৯ হাজার ১১৭ টন, সিদ্ধ চাল ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৮২ টন এবং আতপ চাল ৩৮ হাজার ২৫১ টন। মোট সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯৯৩ টন।
সরকারের কেনা এসব চাল, গম ও ধান ওপেন মার্কেট সেলের (ওএমএস) মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। ৩০ টাকা কেজি দরে ৫ কেজি চাল বিক্রি করা হয়। বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে খাদ্য অধিদপ্তরে খাদ্যশস্যের মজুদ রয়েছে ১২ লাখ ২৪ হাজার ৮৪৫ টন। তার মধ্যে চাল আছে ৮ লাখ ৩ হাজার ২৫ টন, গম আছে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৮৯৪ টন ও ধান আছে ৮ হাজার ৯১৭ টন।