চতুর্থ অর্থনৈতিক শুমারি
আরমান হেকিম
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৯:৫১ এএম
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৪৯ এএম
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কার্যালয়। ছবি : সংগৃহীত
দেশব্যাপী চলমান চতুর্থ অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য সংগ্রহে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। আয় ও মূলধনের সঠিক তথ্য দিতে অনেক অর্থনৈতিক ইউনিট গড়িমসি করছে, বিশেষ করে পোশাক কারখানাগুলো। কর জালে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে এমন আচরণ করা হচ্ছে বলে ধারণা করছেন বিবিএস কর্মকর্তারা। সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলে জরিপের মাধ্যমে অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সম্প্রতি গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলা ও ঢাকা জেলার সাভারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র। শুমারি ২০২৪ শুরু হয়েছে ১০ ডিসেম্বর এবং চলবে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই শুমারির মাধ্যমে সরকার দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করছে, যা ভবিষ্যতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পরিকল্পনায় কাজে লাগবে।
এ বিষয়ে গবেষণা ও নীতির উন্নয়ন সংস্থা র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যদি সঠিক তথ্য সংগ্রহ না করা যায়, তাহলে এই তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা যাবে না। বিগত সময়ে বিবিএসের অনেক তথ্য নিয়ে সন্দেহ ছিল। সুতরাং, তারা তাদের পূর্ববর্তী কাজ থেকে শিক্ষা নিতে পারছে না। সরকারের উচিত একটি স্বাধীন তথ্য কমিশন তৈরি করা, যাতে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়।
বিবিএস জানিয়েছে, ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে এ তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম। দেশের ৪ কোটি পরিবারের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এখন পর্যন্ত ৭৩ শতাংশ তথ্য সংগ্রহ শেষ হয়েছে।
পোশাক কারখানার অনীহা
সাভারের আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় অবস্থিত একটি পোশাক কারখানার উদাহরণ দিয়ে বিবিএস জানিয়েছে, সেখানে গণনাকারীরা বারবার গেলেও সঠিক তথ্য দিতে দেরি করা হচ্ছে। গণনাকারীদের সকাল-বিকাল সময় পরিবর্তন করে বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পোশাক শিল্প মালিক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) থেকে সহযোগিতার অনুরোধ জানানো হলেও অনেক কারখানা সহযোগিতা করছে না।
বিবিএস জোনাল অফিসার আনোয়ার হোসেন বলেন, অনেক অর্থনৈতিক ইউনিট আয়ের সঠিক তথ্য দিচ্ছে না। তারা মূলধন বা ব্যয়ের তথ্য দিলেও আয়ের প্রশ্নে নানা অজুহাত দিচ্ছে। অনেকে বলছে, ‘ডাল-ভাত খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে আছি।’
আয়ের তথ্য নিয়ে অসংগতি
সাভারের কাঠগড়া এলাকার একটি পাইকারি দোকানের মালিক জানান, তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকা। অথচ তার দোকানে ১০-১২ লাখ টাকা ব্যয় হয়। এই আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অমিল নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ চালিয়ে নিচ্ছেন।’ এমন পরিস্থিতি মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
প্রথমবারের মতো নতুন পদ্ধতির ব্যবহার
এবারের শুমারিতে প্রথমবারের মতো ট্যাবের মাধ্যমে ক্যাপি পদ্ধতি (কম্পিউটার অ্যাসিস্টেড পার্সোনাল ইন্টারভিউ) ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এতে তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের কাজ সহজ হচ্ছে। একই সঙ্গে জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) ও জিওকোডের সমন্বয়ে তৈরি ডিজিটাল ম্যাপ ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বিশেষ তথ্য অন্তর্ভুক্তি
এবারের শুমারিতে প্রথমবারের মতো দেশে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের তথ্য সংগ্রহ হচ্ছে। তারা কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, তাদের পদের ধরন এবং লিঙ্গভিত্তিক সংখ্যা এই শুমারির অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অনলাইন ব্যবসা ও ফ্রিল্যান্সিং কার্যক্রমকেও শুমারির আওতায় আনা হয়েছে।
তথ্য সংগ্রহে প্রচেষ্টা অব্যাহত
গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার সুপারভাইজার সেলিনা আক্তার জানান, তার দল মাঠপর্যায়ে জনগণের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। যদিও প্রথম দিকে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়, তবে তা দ্রুত সমাধান করা হয়েছে।
বিবিএস প্রকল্প পরিচালক এসএম শাকিল আখতার বলেন, তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই কাজ একসঙ্গে চলছে। কোনো ভুল তথ্য পাওয়া গেলে তা পুনরায় যাচাই করা হচ্ছে। প্রযুক্তির সহায়তায় আমরা একটি নির্ভুল অর্থনৈতিক শুমারি উপহার দিতে চাই।
তিনি বলেন, দেশের আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি সঠিক ও নির্ভুল চিত্র তুলে ধরার জন্য শুমারির কাজ অব্যাহত রয়েছে। তবে আয়ের সঠিক তথ্য পেতে তথ্য সংগ্রহকারীদের একাধিকবার ইউনিটগুলোতে যেতে হচ্ছে। এরপরও এ কাজে যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিবিএস।