ফারুক আহমাদ আরিফ, রেদওয়ানুল হক, ঢাকা ও হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:০৯ এএম
গ্রাফিক্স প্রবা
অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে ভোজ্য তেলের বাজারে। বেশ কিছুদিন ধরেই নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যের দাম ও সরবরাহ নিয়ে অশুভ তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে আমদানির পরও বাজারে ভোজ্য তেলের সরবরাহ ঘাটতি ও দাম বাড়ানো নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত যে পরিমাণ ভোজ্য তেল আমদানি হয়েছিল, এ বছর একই সময়ে সমপরিমাণ অর্থের তেলই আমদানি হয়েছে। আবার পণ্য খালাসের দিকে গত বছরের চেয়ে বেশি পরিমাণে খালাস হয়েছে। তার ওপর দুই দফায় ১০ শতাংশ শুল্ক কমানো হয়েছে। এত কিছুর পরও বাজারে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে লিটারে ৮ টাকা দাম বৃদ্ধি ও শুল্ক হ্রাসের হিসাব থেকে আরও ১০ টাকাসহ ১৮ টাকাই পকেটে পুরছেন আমদানিকারকরা। এটাকে এক ধরনের জোচ্চুরি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। বাজার বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে ব্যবসায়ীদের দিক থেকে ‘অস্বাভাবিক আচরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
আবারও সরবরাহ সংকট
সরবরাহ কমিয়ে সংকট সৃষ্টি করার পর গত ৯ ডিসেম্বর সয়াবিন ও পাম তেলের দাম লিটারে ৮ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয় পরিশোধনকারীরা। এতে দাম বেড়ে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৭৫ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ও খোলা পাম তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৫৭ টাকা। পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল বিক্রি হচ্ছে ৮৫২ টাকায়। কিন্তু দেখা গেছে, দাম বাড়ানোর পর বাজারে সরবরাহ বাড়লেও, হঠাৎ কী এক অজানা কারণে আবার তেলের সংকট দেখা দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর আজিম স্টোরে সয়াবিন তেল কিনতে এসে ওয়াহিদুর রহমান নামের এক ক্রেতা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, দেশের ৬-৭ জন ব্যবসায়ীর হাতে পুরো খাদ্যদ্রব্যের বাজার জিম্মি হয়ে আছে। তারা যা ইচ্ছা তা-ই করে। বিগত সরকারের আমলেও তারা এটা করেছে। এখনও তাদের ‘খাসলত’ বদলায়নি।
পূর্ব নাখালপাড়া শিল্পাঞ্চল বাজারে নবীনগর জেনারেল স্টোরে গিয়ে দেখা যায়, দোকানটিতে মাত্র তিনটি দুই লিটারের ও একটিমাত্র এক লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল রয়েছে। দোকানি সাইফুল ইসলাম বলেন, ১৫ দিন ধরে তেল নেই। কোনো ডিলার তেল দিচ্ছে না। এমনকি লিটারে ৮ টাকা বাড়ানোর পরও আমরা তেল পাচ্ছি না।
একই বাজারের হক স্টোরের দোকানি মাসুদুর রহমান বলেন, শুধু ফ্রেশ কোম্পানির গাড়ি এসে অল্প কয়েক কার্টন তেল দিয়েছে। বাকি কোনো কোম্পানি আসে না, ডিলাররা তো আসেই না।
শুধু ঢাকা নয়, গত ৫ মাসে চাহিদার বেশি আমদানি হওয়ার পরও বিভাগীয় ও জেলা শহরের বাজারগুলোতে ভোজ্য তেলের সরবরাহ সংকট বিরাজ করছে। চলতি মাসের শুরুতে অনেক মুদি দোকানে গিয়ে সয়াবিন তেল পাননি ক্রেতারা। ১২ ডিসেম্বর তেলের দাম বৃদ্ধির পর বাজারে সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও চাহিদামতো বোতলজাত সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রাম সদরের মুদি দোকানদাররা। জানতে চাইলে নগরীর ঈদগাঁ এলাকার মুদি দোকানি মো. ইস্রাফিল বলেন, গত ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে সয়াবিন তেলের সংকট চলছে। পাঁচ কার্টন তেল চাইলে কোম্পানিগুলো দিচ্ছে এক কার্টন।
আমদানির চিত্র স্বাভাবিক
ভোজ্য তেল আমদানির ঋণপত্র (এলসি) পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-নভেম্বর সময়ে ৬৬ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের ভোজ্য তেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে হয়েছে ১৫ কোটি ৮৩ লাখ, অক্টোবরে ২২ কোটি ৭২ লাখ এবং নভেম্বরে ২৭ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের ভোজ্য তেল। ২০২৩ সালে একই সময়ে (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) ৬৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের ভোজ্য তেল আমদানি হয়। যার মধ্যে সেপ্টেম্বরে ১৯ কোটি ৪২ লাখ এবং অক্টোবর ও নভেম্বরে যথাক্রমে ২২ কোটি ২৫ লাখ ও ২৪ কোটি ১৯ লাখ ডলারের ভোজ্য তেল রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
চাহিদার তুলনায় আমদানি বেশি
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোজ্য তেলের বার্ষিক চাহিদা ২৪ লাখ টন। এর মধ্যে তিন লাখ টন স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়। বাকি ২১ লাখ টনের চাহিদা পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে। এই হিসাবে দেশে ভোজ্য তেলের মাসিক চাহিদা ১ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন। ভোজ্য তেল আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ৫ মাসে চাহিদার চেয়ে আমদানি হয়েছে বেশি। প্রতি মাসে গড়ে আমদানি ২ লাখ ৮৬ হাজার ৫১ টন।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ মাসে ভোজ্য তেল আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৩০ হাজার ১২ টন। এর মধ্যে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম চার মাসে আমদানি হয় ১১ লাখ ৬২ হাজার ৫ টন। যার মধ্যে সয়াবিন তেল ৭ লাখ ৭০ হাজার ২৩০ টন। সর্বশেষ নভেম্বরে সয়াবিনসহ ভোজ্য তেল আমদানি হয়েছে ২ লাখ ৬৮ হাজার ২৫৪ টন।
নভেম্বরে ভোজ্য তেল আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগে যেখানে রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের মালিক বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড, তীর ব্র্যান্ডের সিটি এডিবল অয়েল লিমিটেড, ফ্রেশ ব্র্যান্ডের মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রি, পুষ্টি ব্র্যান্ডের টি কে গ্রুপ এবং এস আলম গ্রুপ সবচেয়ে বেশি ভোজ্য তেল আমদানি করত, সেখানে গত নভেম্বরে এসব প্রতিষ্ঠান খুব একটা আমদানি করেনি। এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিটি এডিবল অয়েল এবং বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড স্বল্প পরিমাণে আমদানি করেছে। এর মধ্যে সিটি আমদানি করেছে ২৫ হাজার ১৩১ টন এবং বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের আমদানি ১৪ হাজার ৯৪৩ টন।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরে যে ১৮টি প্রতিষ্ঠান ২ লাখ ৬৮ হাজার ২৫৪ টন ভোজ্য তেল আমদানি করে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সয়াবিন তেল আমদানি করেছে স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি নভেম্বরে তেল আমদানি করে ৭৮ হাজার টন। ওই মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোজ্য তেল আমদানি করে শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রি। তারা আমদানি করে ৭৩ হাজার ৮৮৭ টন। এরপরই রয়েছে সোনারগাঁও সিডস ক্রাশিং মিলস লিমিটেড, সুপার অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড। তাদের আমদানির পরিমাণ ১৫ হাজার ৪৮৯ মেট্রিক টন।
সূর্যমুখী ও ক্যানোলা তেল আমদানিতে শুল্ক ও কর প্রত্যাহার
সয়াবিন ও পাম তেলের পর অপরিশোধিত সূর্যমুখী ও ক্যানোলা তেল আমদানিতেও সব ধরনের শুল্ক ও কর প্রত্যাহার করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। গত ১৭ ডিসেম্বর থেকে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত এ সুবিধা বহাল থাকবে। এনবিআর জানায়, তেল আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কমিয়ে শূন্য করা হয়েছে। অপরিশোধিত এবং অপরিশোধিত নয়Ñ এমন সূর্যমুখী ও ক্যানোলা তেল আমদানির ক্ষেত্রে সব আমদানি শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণ শুল্ক (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব তেলে ভিন্ন মান অনুযায়ী ৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক ছিল।
এদিকে কয়েক দফায় আমদানি শুল্ক কমানো ও লিটারপ্রতি ৮ টাকা বাড়ানোর পর প্রতি কেজিতে তেলের দাম ১৮ থেকে ১৯ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন শওকত আলী পলাশ নামের এক ক্রেতা। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে যেভাবে দাম বেড়েছে, আমাদের এখানে তার তুলনায় বেশি বাড়ানো হয়েছে। এতে দেখা গেছে, কেজিতে ১৮ থেকে ১৯ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এটি ব্যবসায়ীদের এক ধরনের জোচ্চুরি। তারা সরকারকে ফাঁদে ফেলে এই টাকা আদায় করে নিলেও বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে রেখেছে। আমার মনে হয় না রমজানের আগে এ সমস্যার সমাধান হবে।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
মাসে চাহিদা ১ লাখ ৭৫ হাজার টন অথচ গত ৫ মাসের হিসাবে গড়ে ২ লাখ ৮৬ হাজার টন তেল আমদানির পরও বাজারে কেন সংকটÑ এমন প্রশ্ন করা হলে ভোজ্য তেলের অন্যতম বড় আমদানি ও সরবরাহকারী কোম্পানি টি কে গ্রুপের পরিচালক (ব্র্যান্ড) শফিউল আতাহার তসলিম বলেন, কোম্পানিগুলোতে তেলের সরবরাহ ভালোই আছে। তারপরও বাজারে কেন সংকট তা বলা যাচ্ছে না। আমরা আগে প্রতিদিন ৪০০ মেট্রিক টন তেল বিক্রি করতাম। এখন ৮০০ টন বিক্রি করছি।
তিনি দাবি করেন, ভোজ্য তেল নিয়ে কাস্টমের দেওয়া তথ্য সঠিক নয়। কেননা আমদানির ক্ষেত্রে দুটি দিক থাকে। তার মধ্যে একটি বন্ড সুবিধাসহ, অপরটি বন্ড সুবিধাবিহীন। তারা তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে হয়তো সব একসঙ্গেই দিয়ে দিয়েছে। যে কারণে পরিমাণটা বেশি দেখা যাচ্ছে।
তবে শফিউল আতাহার তসলিমের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, বন্ড সুবিধার বিষয়টি তেলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে খুব বড় ব্যবসায়ী, মাঝারি, আমদানিকারক, সরবরাহকারী ও এজেন্ট আছে। এটা এমন একটা কমপ্লেক্স, যা ভাঙা সহজ নয়। গত বুধবার সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা যদি সবাইকে একসঙ্গে ধরি, তাহলে দেখবেন বাজারে এর থেকে আরও বেশি প্রভাব পড়বে। আমরা চাই সবাই ব্যবসা করুক।
বাজারে এখনও সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না, পাওয়া গেলেও লিটারে ২০০ টাকার বেশি দাম নিচ্ছে কেনÑ এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বাজারের বিষয়ে আমাদের একটু গ্যাপ আছে। যেদিন দাম ৮ টাকা বাড়ানো হলো, তার পরদিন সরবরাহ অনেক কমে যায়। ব্যবসায়ীদের একটা প্রত্যাশা আছে ৮ টাকা বাড়ানো হয়েছে, আরও হয়তো বাড়বে। নতুন করে সয়াবিন তেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই সরবরাহটা স্বাভাবিক থাকুক।