প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৫৪ এএম
আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:৩১ পিএম
চাহিদামতো মুরগি না পেয়ে ফাঁকা রয়েছে দোকান। বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালী কাঁচাবাজার থেকে তোলা। প্রবা ফটো
ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম হঠাৎ করেই কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে গেছে। চাহিদামতো মুরগি না পেয়ে ফাঁকা দোকানে বসে আছেন অনেক ব্যবসায়ী। অন্যদিকে বাজারে দুই দিনের ব্যবধানে চালের দামও কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। নতুন আলু ও পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়ায় দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরছে। তা ছাড়া সবজির দামও কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা কমেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর পূর্ব নাখালপাড়ার শিল্পাঞ্চল ও মহাখালী কাঁচাবাজার ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।
মুরগির দোকান ফাঁকা
পূর্ব নাখালপাড়ার শিল্পাঞ্চল ও মহাখালী কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ দোকানে মুরগি নেই। ব্যবসায়ীরা ফাঁকা দোকানে বসে আছেন। দুয়েকটি দোকানে অল্প কিছু মুরগি রয়েছে, যেখানে ব্রয়লার বিক্রি হচ্ছে ২১০-২২০ টাকা ও সোনালি ৩৩০-৩৪০ টাকা কেজিতে। গতকাল সকালে পূর্ব নাখালপাড়ার শিল্পাঞ্চল কাঁচাবাজারে দেখা যায়, বেশিরভাগ মুরগির দোকানে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির পরিমাণ খুবই কম বা ধরতে গেলে ফাঁকা। অলস সময় কাটাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কথা হয় মো. রুবেল হোসেন নামে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তিনি বলেন, বুধবার রাতে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, কারওয়ান বাজার ঘুরে কোনো মুরগি পাইনি। পরে কাপ্তান বাজারে গিয়ে চাহিদার তিন ভাগের এক ভাগ মুরগি পেয়েছি। প্রতিদিন ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি করি। বুধবার কিনেছি একশ কেজির মতো। অনেক দোকানদার মাল না পেয়ে ফিরে গেছেন।
মহাখালী কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিম বলেন, বুধবার রাতে কাপ্তান বাজারে মুরগির কোনো গাড়ি দাঁড়াতে পারেনি। সেনাবাহিনীর লোকজন গাড়ি দাঁড় করাতে দেয়নি। আমরা গিয়ে মুরগি পাইনি। আগের কয়েকটি সোনালি মুরগি ছিল, সেগুলো ২০-৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারের আরেক ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, ২০-২৫ পিস মুরগি রয়েছে খাঁচায়। তিনি বলেন, বাজারে মুরগি নেই। বেশি দাম দিয়েও মুরগি কিনতে পারছি না। মহাখালী বাজারে ওয়ালিউল্লাহ নামের এক দোকানিকে দেখা যায়, চারটি খালি খাঁচা নিয়ে বসে আছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে মাল কেনা যাচ্ছে না। বাজারে মুরগি আসে না। কী করব, শুধু বসে বসে দোকান পাহারা দিচ্ছি।
বাজারের জন্য নির্দিষ্ট স্থান দিতে হবে
মুরগির বাজারের পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে কাপ্তান বাজারের মুরগি ব্যবসায়ী মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, গত মঙ্গলবার নিরাপদ সড়কের দাবিতে এ এলাকায় কোনো গাড়ি দাঁড়াতে দেয়নি শিক্ষার্থীরা। পরে সেনাবাহিনীও উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে। মঙ্গল ও বুধবার রাতে কোনো গাড়ি রাস্তায় দাঁড়াতে পারেনি। এতে বাজারে বিশাল প্রভাব পড়ছে। কেননা, সোমবার যে ব্রয়লার মুরগি পাইকারিতে প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ১৫৮-১৬০ টাকায়, সেটি বুধবার রাতে বিক্রি হয়েছে ২১০ টাকায়। সারা দেশের মুরগি কাপ্তানবাজার আর ঠাটারীবাজারে আসার পর এখান থেকে অন্যান্য বাজারে যায়। কিন্তু এই বাজারেই কোনো ট্রাক ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, বুধবার কয়েকটি গাড়ি এলেও সেগুলোকে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। পাইকারি বাজারে মাল না এলে বিক্রি হবে কীভাবে? এখানে ট্রাক দাঁড়াতে না দিলে একটি নির্দিষ্ট জায়গা তো দিতে হবে। তা না হলে ব্যবসা করা যাবে না। অপর ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসানও একই দাবি জানান।
কাপ্তান বাজার পোল্ট্রি মালিক ক্ষুদ্র সমবায় সমিতির সভাপতি মো. শাহাজুদ্দিন সাজু বলেন, আমাদের কাপ্তানবাজার ও ঠাটারীবাজারে ২ শতাধিক মুরগির দোকান আছে। আমরা সেখানে হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে তিনটি স্থানে গাড়ি রেখে মুরগি বেচাকেনা করি। এর জন্য প্রতিদিন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা করে দেই। গত ৫০-৫৫ বছর যাবত বাজারটি চলছে। এখানে রাত সাড়ে ১২টা থেকে ভোর সাড়ে ৬টা পর্যন্ত বেচাকেনা চলে। এখন সেখানে গাড়ি থামাতে দেওয়া হচ্ছে না। এতে মঙ্গলবার থেকে বাজার বন্ধ রয়েছে। আমাদের বিকল্প স্থান করে দিতে হবে। আগামীকাল শনিবার সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসকের কাছে আমরা এ বিষয়ে স্মারকলিপি দেব।
প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিদের কর্মসূচি প্রত্যাহার
এদিকে সরকার আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিদের ১০ দফা দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়ায় ১ জানুয়ারি থেকে ডিম ও মুরগির উৎপাদন বন্ধের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) সভাপতি। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিপিএ সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার জানান, আগামী ২ মাসের মধ্যে সরকার বিপিএর ১০ দফা দাবি পূরণ করবে বলে আশ্বস্ত করায় কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সুমন হাওলাদার আরও জানান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ১০ দফা দাবির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকার প্রান্তিক খামারি এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থে দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়েছে। পাশাপাশি বিপিএকে এ খাতের সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে যুক্ত করা হবে বলেও জানানো হয়েছে। পোল্ট্রি শিল্পের টেকসই উন্নয়ন, খামারিদের সুরক্ষা এবং ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পোল্ট্রি পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে উপস্থাপিত ১০ দফা দাবি পূরণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আশ্বাস পাওয়া গেছে।
এর আগে প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিদের স্বার্থ রক্ষা, করপোরেট কোম্পানির সিন্ডিকেট বন্ধ করাসহ ১০ দফা দাবি জানিয়ে ১ জানুয়ারি থেকে সারা দেশের প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারে ডিম ও মুরগি উৎপাদন বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
চাল আমদানির পরামর্শ
ভরা মৌসুমেও বাজারে খুচরা পর্যায়ে চিকন চালের দাম কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা এবং মোটা ও মাঝারি মানের চালের দাম ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। ব্রি২৮ চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮-৬০ টাকা কেজিতে, নাজিরশাইল ৭৫-৮৫ ও মিনিকেট ৭২-৭৫ টাকায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন গত দুই দিনের ব্যবধানে চালের বস্তায় ২০-৩০ টাকা করে বেড়েছে।
এদিকে নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার গতকাল বলেন, দেশে বর্তমানে ৮-১০ লাখ টন চালের ঘাটতি আছে। সরকারের উচিত শুধু ভারতের দিকে তাকিয়ে না থেকে বিকল্প দেশগুলো হতে চাল আমদানি করার উদ্যোগ নেওয়া। কেননা ভারত চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে আমাদের চালের বাজারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব চাল আমদানি করা দরকার।
কমেছে আলু ও পেঁয়াজের দাম
এদিকে বাজারে নতুন আলু ও পেঁয়াজের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। গতকাল রাজধানীর বাজারগুলোতে নতুন আলু বিক্রি হয়েছে ৭০ টাকা ও পুরোনো আলু ৬০ টাকা কেজিতে। তবে কোনো কোনো দোকানে নতুন ও পুরোনো আলু একই (৭০ টাকা কেজি) দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। পূর্ব নাখালপাড়ার শিল্পাঞ্চল কাঁচাবাজারের হক স্টোরের ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমান বলেন, পুরোনো ও নতুন আলু ৬৫-৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে নতুন পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়ায় দাম কিছুটা কমেছে। বর্তমানে দেশি পেঁয়াজ ৭০-৮০ ও আমদানি করা পেঁয়াজ ৬০-৭০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তবে আমদানি করা রসুনের দাম বেড়েছে। আমদানি করা রসুনের দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ২৪০ টাকা ও দেশি রসুন ২০ টাকা কমে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কমছে সবজির দামও
সব ধরনের সবজির দামই এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। গতকাল গোল বেগুন বিক্রি হয়েছে ৭০-৮০ টাকা কেজি, লম্বা ও সাদা বেগুন ৬০-৭০ টাকা কেজি। পটোল ৬০, করলা ৮০ ও উচ্ছে ১০০, কাঁচা টমেটো ৬০, পুরোনো আলু ৮০ ও নতুন আলু ৯০-১০০, পাতাসহ পেঁয়াজ ৫০, চিচিঙ্গা ৬০-৭০, শসা ৬০-৭০, পেঁপে ৪০, গাজর ৭০ টাকা কেজি। এ ছাড়া মুলা ৩০-৪০, বরবটি ৮০, শিম ৪০-৬৫, বিচিসহ শিম ৮০-৯০, আদা ১২০ টাকা কেজি, প্রতি পিস লাউ ৬০, ফুলকপি ও বাঁধাকপি ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।