প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৯:৫৮ পিএম
আয়কর রিটার্নে করমুক্ত আয় সঠিকভাবে উল্লেখ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। করদাতার করমুক্ত আয়ের খাতগুলো আইনসম্মতভাবে রিটার্নে লিপিবদ্ধ করলে তা বৈধ উৎস হিসেবে গণ্য হয়। এসব আয়ের ওপর কোনো কর প্রযোজ্য না হলেও সঠিকভাবে ঘোষণা না করলে সুবিধা পাওয়া যাবে না। আয়কর রিটার্নে করমুক্ত আয় দেখানো মানে হলো আয়টি বৈধ ও সাদা টাকার মর্যাদা পাচ্ছে।
বর্তমান আইনে বেশ কিছু আয়ের খাতকে করমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সরকারি পেনশন তহবিল থেকে প্রাপ্ত বকেয়া পেনশন। এ ছাড়া সরকারি আনুতোষিক তহবিল থেকে অনধিক আড়াই কোটি টাকা পর্যন্ত প্রাপ্ত অর্থ করমুক্ত। সরকারি সংস্থা, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা স্বেচ্ছায় অবসরে গেলে প্রাপ্ত অর্থও এই সুবিধার আওতাভুক্ত।
বিদেশে উপার্জিত আয়, যা বৈধভাবে দেশে আনা হয়, তা করমুক্ত হিসেবে গণ্য হবে। প্রবাসীরা তাদের বৈদেশিক আয়ের একটি অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পাঠালে সেই অর্থের ওপর কোনো কর দিতে হবে না। বিশেষত ওয়েজ আর্নারস ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড, ইউরো ইনভেস্টমেন্ট বন্ডসহ বিভিন্ন বৈদেশিক বন্ড থেকে অর্জিত সুদ বা মুনাফা করমুক্ত রাখা হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য সরকার বেশ কিছু করমুক্ত সুবিধা রেখেছে। বিশেষ করে সফটওয়্যার তৈরিসহ এআই বেজড সলিউশন ডেভেলপমেন্ট, ব্লকচেইন প্রযুক্তি, রোবোটিকস প্রসেসিং, সাইবার সিকিউরিটি, সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস, ডিজিটাল ডেটা অ্যানালিটিকস, কল সেন্টার সেবা এবং আইটি ফ্রিল্যান্সিং খাতের আয়ের ওপর কর আরোপ করা হয় না। তবে শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, সব ধরনের লেনদেন এবং বিনিয়োগ শতভাগ ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাÑ রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর আয়ও করমুক্ত রাখা হয়েছে, যদি তা স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত হয়। কৃষি খাতেও আয়ের সীমিত অংশে করমুক্ত সুবিধা রয়েছে। একজন কৃষকের কৃষিজমি চাষাবাদ থেকে অনধিক দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর কর দিতে হবে না।
সরকারের পদক বা পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত অর্থ এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে পাওয়া সম্মানী ভাতা সম্পূর্ণ করমুক্ত। পাশাপাশি বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা থেকে প্রাপ্ত আয়ের ক্ষেত্রেও করমুক্তির সুবিধা রয়েছে।
শিল্প খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বার্ষিক লেনদেনের ভিত্তিতে করমুক্ত সুবিধা নির্ধারণ করা হয়েছে। নারী মালিকানাধীন ক্ষুদ্র শিল্পের বার্ষিক লেনদেন ৭০ লাখ টাকার নিচে থাকলে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকার মধ্যে থাকলে সেই আয়ের ওপর কোনো কর আরোপ হবে না। হস্তশিল্প রপ্তানির মাধ্যমে অর্জিত আয়ও করমুক্ত রাখা হয়েছে, যা স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য একটি বড় সুবিধা।
অন্যান্য করমুক্ত আয়ের মধ্যে রয়েছে পেনশনার সেভিংস সার্টিফিকেট থেকে সুদের আয়, যা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। এ ছাড়া স্বীকৃত ভবিষ্যৎ তহবিল ও অনুমোদিত বার্ধক্য তহবিল থেকেও করমুক্ত আয় পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কোনো অংশীদারি ফার্মের অংশীদার হিসেবে প্রাপ্ত মূলধনি আয়ও করমুক্ত, যদি ওই ফার্ম কর পরিশোধ করে থাকে।
শিক্ষা, সামাজিক সেবা ও কল্যাণমূলক খাতেও করমুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ আইসিবির ইউনিট ফান্ড থেকে প্রাপ্ত আয় এবং চলতি অর্থবছর পর্যন্ত সমুদ্রগামী জাহাজ পরিচালনার মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা করমুক্ত।
করমুক্ত আয়ের সুবিধা পেতে হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। রিটার্নে করমুক্ত আয়ের উৎস ও পরিমাণ সঠিকভাবে উল্লেখ করা জরুরি। করদাতারা এসব আয় সঠিকভাবে রিটার্নে ঘোষণা করলে তা বৈধ হিসেবে গণ্য হবে এবং সাদা টাকার মর্যাদা পাবে। তবে সময়মতো রিটার্ন জমা না দিলে করমুক্ত সুবিধা আর পাওয়া যাবে না।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, করমুক্ত আয় রিটার্নে আলাদা কলামে প্রদর্শন করতে হয়। করদাতারা এই সুবিধা কাজে লাগালে বৈধ উৎসের অর্থ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন এবং ভবিষ্যতে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই সাদা টাকার পরিমাণ বাড়াতে পারবেন।
জরিমানা ছাড়া ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রিটার্ন দাখিল
এদিকে বিভিন্ন পেশাজীবী মহলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করেছে। এ সময়ের মধ্যে করদাতারা কোনো প্রকার জরিমানা ছাড়াই তাদের আয় ও সম্পদের বিবরণী অনলাইনে অথবা সশরীরে জমা দিতে পারবেন।
এনবিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলতি করবর্ষে করদাতাদের অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় পৌনে চার লাখ করদাতা অনলাইনে তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। করদাতাদের এ প্রক্রিয়ায় আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে এনবিআর নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে এবং সহজ পদ্ধতি অনুসরণে সহযোগিতা করছে।
এনবিআর ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করেছিল। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কর অঞ্চলের অধীনে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। এবার ব্যাংকার ও মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্যও একই ধরনের নির্দেশনা জারি করেছে এনবিআর।
করদাতারা এনবিআরের অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করে সহজেই তাদের রিটার্ন দাখিল করতে পারেন। সশরীরে রিটার্ন জমা দেওয়ার পাশাপাশি অনলাইন পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিলের ফলে ভোগান্তি কমবে এবং করদাতাদের সময়ও সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।