রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:১৭ এএম
আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:০৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
অনেক দিন ধরেই তারল্য সংকটে ভুগছে সরকারি ও বেসরকারি খাতের কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক। আস্থাহীনতার কারণে ব্যাংক খাত এমন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও ব্যবসায়ীদের টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা। ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ তুলে নিয়ে তারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকও বিপাকে পড়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে এই ব্যাংকগুলো আমানত হারিয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকা।
যদিও দুর্বল ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা টাকা রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি শক্তিশালী ব্যাংকে জমা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রীয় খাতেও কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক রয়েছে এবং সেগুলো থেকেও বিপুল অর্থ উত্তোলন হয়েছে। তাই সার্বিক হিসাবে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর আমানত স্থিতি কমে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন থেকে আরও জানা গেছে, ব্যাংকগুলো তাদের তারল্য সংকট দূর করতে এখন আমানত সংগ্রহকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের কিছু ব্যাংক তাদের তারল্য সংকট দূর করতে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। এই অভিযানে তারা বেশ সাড়াও পাচ্ছে। কিন্তু আমানত সংগ্রহের এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছে রাষ্ট্র খাতের ব্যাংকগুলো। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে দশমিক ৩৩ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানত কমেছে ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
বিদ্যমান সংকটের বিষয়ে কথা বলতে বিভিন্ন মাধ্যমে চেষ্টা করেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তারা সবাই সম্প্রতি দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ও অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ভাল-খারাপ আছে। সোনালী ও অগ্রণী খুবই ভালো আবার বেসিক ও বিডিবিএলের অবস্থা বেশি একটা ভালো নয়। বর্তমানে জনতা ব্যাংকও দুর্বল অবস্থায় আছে। তাই সার্বিক হিসাব করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতে আস্থার সংকটের পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনধারণের ব্যয় বেড়ে গেছে। খরচ বেশি হওয়ায় মানুষের হাতে রাখা টাকার অঙ্কও বাড়ছে। সার্বিকভাবে ব্যাংকে আমানত কমছে। যদিও সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির কারণে ব্যাংকে টাকা বাড়ার কথা। তবে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উচ্চ সুদ অর্জনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মানুষ সঞ্চয় করতে পারছে না।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছু প্রভাবশালী বিপুল অঙ্কের আমানত উত্তোলন করেছেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকও থাকতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতের আমানতের মোট স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে এটি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ৩ মাসে ব্যাংক খাতে আমানত কমেছে ১৩ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা।
এদিকে জুন শেষে বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানতের স্থিতি ছিল ১২ লাখ ৬২ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে এই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৫৮ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে আমানত কমেছে ৪ হাজার ১২০ কোটি টাকা বা দশমিক ৩৩ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক খাতে সুদহারের সীমা তুলে দেওয়ার পর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংকগুলো সেভাবে সুদ সমন্বয় করেনি। ফলে তারা আমানত সংগ্রহের দৌড়ে পিছিয়ে আছে। এ ছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে অনেকেই সংসারের খরচ মেটাতে ব্যাংক থেকে তাদের আমানত তুলে নিচ্ছেন। আবার আস্থার সংকট থেকেও অনেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন।
অপরদিকে, জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকÑ সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএলের আমানতের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে তাদের আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। সে হিসেবে তিন মাসে এই ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে ১১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহম্মেদ জনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে যারা প্রভাবশালী গ্রাহক তথা বিগত সরকারের সুবিধাভোগী তারা ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের সহায়তায় কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। কেননা তারা ভয়ে ছিলেন তাদের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হতে পারে। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট প্রকট হয়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে কোটি টাকার হিসাব কমে গেছে দেড় হাজারেরও বেশি। এর অর্থ হলো এসব গ্রাহক অবাধে তাদের টাকা তুলতে পেরেছেন। যদিও দুর্বল ব্যাংকগুলোতে গিয়ে প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে পারেননি অনেক গ্রাহক।’
তথ্যানুযায়ী, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমানত বেশি কমেছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর। গত জুন শেষে এই ব্যাংকগুলোর আমানতের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৯২ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। আর সেপ্টেম্বর শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৪২ কোটি টাকায়। সেই হিসাবে তিন মাসে কমেছে ১০ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ। তবে আমানত বেড়েছে বিদেশি ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতের স্থিতি ছিল ৮০ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার ৫৩১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ তিন মাসে বেড়েছে ১ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৪১ শতাংশ। এ ছাড়া চলতি বছরের জুন শেষে বিশেষায়িত খাতের ব্যাংকগুলোর আমানতের স্থিতি ছিল ৫০ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। এটি সেপ্টেম্বর শেষে হয়েছে ৫০ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে আমানত বেড়েছে ২১৮ কোটি টাকা বা দশমিক ৪৩ শতাংশ।
এদিকে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টেম্বর ৩ মাসে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা কমেছে ১ হাজার ৬৫৭টি। আলোচ্য সময়ে ২৬ হাজার ১৮৭ কোটি টাকার আমানত তুলে নিয়েছেন কোটিপতি গ্রাহকরা।