প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ২১:৫০ পিএম
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে। এসব দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি পাকিস্তানে এবং সর্বনিম্ন হচ্ছে চীনে বলে জানিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো পাউল দোরোশ।
রবিবার (৮ ডিসেম্বর) রাজধানীর হোটেল লেকশোরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) আয়োজিত চার দিনের সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘এগ্রিকালচার এন্ড ফুড সিকিউরিটি’ শীর্ষক সেশনে এসব কথা বলেন তিনি । আইএফপিআরআইর দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক সাজ্জাদ জহিরের সভাপতিত্বে সেশনে আরও বক্তব্য রাখেন প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো বেঞ্জিন বেল্টন ও নিক মিনোট।
এশিয়ার দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে পাউল দোরোশ জানান, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হারে প্রথম স্থানে রয়েছে পাকিস্তান ও দ্বিতীয় স্থানে আছে শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। অপরদিকে পাকিস্তানে এ হার সর্বোচ্চ ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ, নেপালে ৭ দশমিক ১ শতাংশ, ভারতে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং সবচেয়ে কম চীনে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ।
গত ১৭ বছরে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য হারে দারিদ্রতা কমায় তার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ২০০৫ সালে দেশে দারিদ্রতার হার ছিল ৪০ শতাংশ, সেটি ২০২২ সালে ২১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যতা ২৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। তাছাড়া ২০১৫-১৬ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে গড়ে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে বার্ষিক মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি পেয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
স্বাধীনতার পর থেকে খাদ্যখাতে বাংলাদেশের সাফল্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭০-৭১ সালে ধানের উৎপাদন ১১ মিলিয়ন টন। সেটি বেড়ে ২০২২-২৩ সালে উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ১ মিলিয়ন টনে। এসব উন্নতি সম্ভব হয়েছে আধুনিক সেচ সুবিধা, উন্নত জাতের বীজ এবং সার ব্যবহারের কারণে।
সম্মেলনে ‘সাপ্লাই চেইন ডায়নামিকস ফর সাস্টেইনেবল আরএমজি গ্রোথ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেশনে তৈরি পোশাকখাত নিয়ে একটি গবেষণাপত্রের ফল নিয়ে আলোচনা করা হয়। এতে বক্তারা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে এলডিসি পর যেসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে সে ব্যাপারে আলোচনা করেন। এতে বিআইডিএসের রিসার্চ ডিরেক্টর মঞ্জুর হোসাইন, রিসার্চ ফেলো তাহরিন তাহমিনা চৌধুরী ও এসোসিয়েট রিসার্চার মো. নাদিম উদ্দীনের করা গবেষণার ফল তুলে ধরা হয়।
গবেষণার ফল উপস্থাপনকালে মনজুর হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জন্য এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ডিউটি-ফ্রি, কোটাহীন সুবিধা হারানো। ২০২৬ সালের পর বাংলাদেশ আর বড় বড় উন্নত দেশগুলোর বাজারে ডিউটি-ফ্রি সুবিধা পাবে না। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইউই) বাজারে যেখানে পোশাক, কাপড় এবং আধা প্রস্তুত পণ্যের উপর ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপিত হতে পারে। এই সুবিধাগুলোর অবসান এবং এলডিসির জন্য বরাদ্দ বিশেষ নিয়মাবলী হারানোর কারণে আরএমজি খাতের রপ্তানি আয় প্রায় ১০ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পাবে। এটির বাস্তবায়ন ২০৩১ সাল নাগাদ হতে পারে।
তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলো শুল্ক আরোপ করলে বাংলাদেশের জিডিপিতে শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ হ্রাস হতে পারে। আরএমজি খাতের রপ্তানি প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গবেষণায় কিছু পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। সেসবের মধ্যে রয়েছে- আরএমজি কোম্পানিগুলিকে খরচ কমানোর কৌশলের দিকে নজর দিতে হবে। প্রধানত খরচ কমানোর ক্ষেত্রগুলো হলো কাঁচামাল ব্যবস্থাপনা (১১ দশমিক ৯৫ শতাংশ কমানো), মজুরি (৯ দশমিক ১৪ শতাংশ কমানো) এবং পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষার খরচ (৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমানো সম্ভব)। এই খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি করা বিশ্বের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করা হয়।
কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমাতে গবেষণায় মঞ্জুর হোসেন বলেন, বাংলাদেশের কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমাতে ২১ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেশীয় বাজার থেকে সস্তা এবং ভালো মানের কাঁচামাল সংগ্রহ করেছে। এ ছাড়াও তারা তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই ট্রেড ফেয়ার এবং সরাসরি অর্ডারের মাধ্যমে তাদের বাজারের প্রসার ঘটানোর চেষ্টা করছে।
গবেষণায় পোস্ট-প্রোডাকশন পর্যায়েও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষত, শিপমেন্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাস্তার অবকাঠামো সমস্যা, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে অদক্ষতা এবং বন্দরের কার্যক্রমে দেরি হওয়া বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তা ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর এশিয়ার সবচেয়ে অকার্যকর কনটেইনার হ্যান্ডলিং বন্দর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করছে বলেও গবেষণায় বলা হয়।
গবেষণায় সরবরাহ চেইন দ্রুত সমাধান করতে নীতি পরিবর্তন প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী উন্নত বাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরএমজি খাতের সকল অংশীজন; তথা সরকার, উৎপাদনকারী এবং অন্যান্য সংস্থাগুলোকে একত্রে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে অবকাঠামো উন্নয়ন, কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা বলে উল্লেখ করা হয়।
সম্মেলনে করপোরেট এগ্রিকালচার শীর্ষক একক বক্তৃতা রাখেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার মন্ডল, এছাড়াও সম্মেলনে আরও কয়েকটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়।