বিআইডিএসের সেমিনার
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ২১:১৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ে গেছে। বর্তমানে এই শ্রেণির দেশগুলোর ৬০০ কোটি মানুষ সময়ের সঙ্গে লড়াই করছে। এই ফাঁদ থেকে বের হতে অন্যান্য দেশ যা-ই করুক না কেন, এখানে বাংলাদেশকে আরও বেশি উন্মুক্ত হতে হবে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন, উৎপাদন ও সেবা অথবা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নীতি সংস্কারের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিলে হবে না।
শনিবার (৭ ডিসেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) উদ্যোগে আয়োজিত এবিসিডি সম্মেলনের প্রথম সেশনে ব্ক্তাদের আলোচনায় এসব কথা উঠে আসে। এ সময় বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান, বিশ্বব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত এস গিল প্রমুখ।
সম্মেলনে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘গত সরকারের সময় জাতীয় সংসদে অনেকে ব্যবসায়ী ছিলেন। ফলে তারা নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করেছেন। এজন্য সংসদ থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত একটি ক্রনিক ক্যাপিটালিজম তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে চামচা পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটায় বিগত সরকারের মধ্যে অগতান্ত্রিক মনোভাব তৈরি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়ে সন্দেহ থাকলেও দারিদ্র্য কমানোর সূচকে বাংলাদেশ ভালো করেছে। এটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এ ছাড়া স্যানিটেশন সুবিধা বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যু কমানো, শিশু মাতৃহার কমানোসহ সামাজিক সূচকগুলোতেও অবস্থার উন্নতি হয়েছে।’
শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনেও দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয়টি নিয়ে কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন উল্লেখযোগ্য। দারিদ্র্যের হার ৫৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নিয়ে আসা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন রেহমান সোবহান।
তিনি বলেন, ‘গবেষকদের কাজ হবে বাংলাদেশ প্যারাডক্সের নতুন রূপের সন্ধান করা। এতদিন সুশাসনের অভাবের মধ্যে কীভাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা নিয়ে ছিল বিস্ময়। এখন দেখতে হবে, এ ধরনের অসম সমাজ ও অপশাসনের মধ্যে কীভাবে দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে এতটা ভালো করল বাংলাদেশ। তার বিশ্বাস, এই গবেষণা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদরা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন।
দেশে বৈষম্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে কাঠামোগত সমস্যা আছে বলে উল্লেখ করেন রেহমান সোবহান। যেভাবে ঋণখেলাপিরা সুবিধা পেয়েছেন, সরকারের এ-জাতীয় নীতি দেশে অসমতা বৃদ্ধি করেছে বলে তার মত।
অর্থনীতিবিদদের সমালোচনা করে রেহমান সোবহান বলেন, ‘অসমতা পরিমাপের ক্ষেত্রে শুধু খানা আয়-ব্যয় জরিপের পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে; এর বাইরে কেউ যাচ্ছে না।’ তার মতে, এ ক্ষেত্রে আয়করের বিবরণী গুরুত্বপূর্ণ আকর। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘খানা আয়-ব্যয় জরিপে শীর্ষ আয়ের মানুষের যে মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, তা হলো ১০ লাখ টাকার সম্পদ ও মাসিক ৩০ হাজার টাকা আয়। এ সম্পদ এবং আয় গুলশান ও বারিধারার বেশিরভাগ গাড়িচালকেরই আছে।’ তার মতে, এই মানদণ্ড বিচার করা হলে আমাদের মতো অনেক মানুষই পরিসংখ্যান থেকে হারিয়ে যাবে। ফলে গবেষকরা যা করছেন, তা মূলত আলংকারিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের বলে মনে করেন তিনি।
রেহমান সোবহান আরও বলেন, ‘সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। কিন্তু সেই বৈষম্যের চরিত্র যথাযথভাবে চিত্রিত করা হচ্ছে না। কোথায় কোথায় কোন খাতে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে, তা নিরূপণ করা গেলে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।’
বৈষম্য প্রসঙ্গে একটি স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমি যখন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলামÑ প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায়, তখন একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় আমার গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারপর গাড়িটি ঠেলে নিতে হয়েছিল। আর এখন যারা পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য তাদের গাড়িতে এসি লাগে। এমনকি কোটি টাকা দামি ব্র্যান্ডের গাড়িও ব্যবহার হয়।’
অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত এস গিল তার গবেষণাপত্রে বলেন, ‘বর্তমানে মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ৬০০ কোটি মানুষ সময়ের সঙ্গে লড়াই করছে। বাইরের পরিবেশ এই চ্যালেঞ্জগুলো আরও কঠিন করে তুলছে। মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে দেশগুলোকে দুটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, একটি নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং উদ্ভাবনের মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে। মধ্যম আয়ের স্তর দ্রুত অতিক্রম করতে হলে বিদ্যমান কাঠামোতে শৃঙ্খলা আনতে হবে, যোগ্যতাকে পুরস্কৃত করতে হবে এবং সংকটকে কাজে লাগাতে হবে।’
গিল বলেন, ‘অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করতে হবে, বিশেষ করে যখন বিনিয়োগ-নির্ভর পর্যায় থেকে উৎপাদন-নির্ভর পর্যায়ে স্থানান্তরিত হয়েছেন। অন্যরা যা-ই করুক না কেন, এখানে বাংলাদেশকে আরও বেশি উন্মুক্ত হতে হবে। এক্ষেত্রে যেন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন, উৎপাদন ও সেবা, অথবা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নীতি সংস্কারের মধ্যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার বিষয় না হয়।’
গিল বলেন, ‘মধ্যম আয়ের আরও অনেক দেশ রয়েছে। কিন্তু তারা তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের দিক থেকে আলাদা। আমরা দেখেছি, বৈষম্য সামান্য বেড়েছে। তবে এটি খুব বেশি গুরুতর নয়, যদি আর্থ-সামাজিক গতিশীলতা বাড়তে থাকে। আবার যদি আর্থ-সামাজিক গতিশীলতা কমে যায়, তবে বৈষম্য বাড়ুক বা কমুক, তা কোনো গুরুত্ব বহন করে না।’
বিশ্বব্যাংকের এই মুখ্য অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ শুধু এটাই দেখছে, জ্বালানি কোথা থেকে আসছেÑ পুনর্নবীকরণযোগ্য খাত থেকে নাকি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। এটি সম্পূর্ণ ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের দেখতে হবে, বাংলাদেশ জ্বালানি থেকে উৎপাদন করতে কতটা দক্ষ। যদি দক্ষ না হয়, তাহলে এটি বোঝায়, মাথাপিছু উৎপাদনের তুলনায় কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ অনেক বেশি।’
ড. বিনায়ক সেন বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বৈষম্যবিরোধী মনোভাব আরও বড় হিসেবে তৈরি হয়েছে। সেই স্পিরিটকে সামনে রেখে বৈষম্য দূর করতে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। চার দিনে বিআইডিএসের এ সেমিনারের বিভিন্ন অধিবেশনে প্রায় ৩০টি গবেষণাপত্র এবং ১২টি পাবলিক লেকচার অনুষ্ঠিত হবে।’