ব্যাংকে তারল্য ঘাটতি
রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৪ ১০:২৯ এএম
বাংলাদেশ ব্যাংক। ছবি: সংগৃহীত
তীব্র তারল্য সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে বিশেষ ব্যবস্থায় তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্যারান্টি সহায়তার আওতায় অপেক্ষাকৃত সবল ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তার প্রক্রিয়া যথেষ্ট না হওয়ায় বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে। ইস্যুকৃত বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের মাধ্যমে বাজার থেকে টাকা তুলে সেই টাকা দুর্বল ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে অপর একটি সূত্রের বরাত দিয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে যে টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে আজ বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও ঋণ জালিয়াতির কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে দেশের ব্যাংক খাত। এমনকি চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে কমপক্ষে এক ডজন ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট এতটাই প্রকট হয়েছে যে গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় টাকাও দিতে পারছে না। কিন্তু ব্যাংকগুলোর এসব সমস্যা ঢাকতে টাকা ছাপানোসহ নানা অবৈধ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছিলেন পলাতক সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। তবে ৫ আগস্টের পর গভর্নর হিসেবে ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর অনৈতিক ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর এ প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এতে চরম তারল্য সংকটে পড়ে ব্যবসায়ী এস আলমের লুট করা ব্যাংকগুলো। হঠাৎ সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ায় বিপদে পড়েন সাধারণ গ্রাহকরা।
ব্যাংকাররা তখন জানান, যেহেতু লুট বন্ধ হয়েছে তাই অল্প কিছুদিন সহায়তা চালু রাখলেই সংকট কেটে যাবে। তবে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে টাকা ছাপানোর প্রস্তাব নাকচ করে দেন গভর্নর। এতে সংকট আরও তীব্র হয়। গ্যারান্টি সহায়তা যথেষ্ট না হওয়ায় তিন মাস ধরে আমানত উত্তোলনে চরম ভোগান্তির মুখোমুখি হন গ্রাহকরা। তবে দেরিতে হলেও বিশেষ সহায়তা চালু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। টাকা ছাপিয়ে হোক আর বাজার থেকে টাকা তুলে হোক নতুন এ সিদ্ধান্ত ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট কাটাতে সহায়ক হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংকাররা জানান, এ সিদ্ধান্ত আরও আগে নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না।
জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি তারল্য সংকটে আছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকগুলোর শাখা ও বুথে গিয়ে চাহিদামতো টাকা পাচ্ছেন না আমানতকারীরা। তবে ইসলামী ব্যাংক সংকট অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে।
এতদিন সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংক থেকে ধার দেওয়া হচ্ছিল। আর এটি দেওয়া হচ্ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে। এ প্রক্রিয়ায় এ পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার মতো ধার দেওয়া হয়েছে। তবে আমানতকারীদের চাহিদার বিপরীতে যা খুবই কম। যে কারণে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।
অপরদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টি সত্ত্বেও উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো টাকা ধার দিতে গড়িমসি করছে। তা ছাড়া এ প্রক্রিয়া ধীরগতির। ফলে এটি দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংকট কাটাতে খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাদের অবস্থারও উন্নতি ঘটছে না। তাই তারল্য সংকটে থাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের মাধ্যমে সহায়তার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ৭, ১৪, ৩০, ৯০ ও ১৮০ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে এই অর্থ তোলা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে চারটি ব্যাংকে বিশেষ সহায়তার আওতায় সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ৭ হাজার ৯০০ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা নিয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ন্যাশনাল ব্যাংক নিয়েছে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার সহায়তা। অন্যান্য ২টি ব্যাংক নিয়েছে বাকি টাকা। এর বাইরে আরও দুটি ব্যাংককে অন্তত আড়াই হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে।
তবে কোন পদ্ধতিতে চার ব্যাংকে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছেÑ এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যেও নানা রকম আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা বলেন, ‘এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবেন গভর্নর নিজেই। আগামীকাল (আজ) বিকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হবেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।’
জানা গেছে, আমানতকারীরা অর্থ তুলতে না পারায় ব্যাংক খাতে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। এজন্য আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সে ক্ষেত্রে এসব অর্থ ফেরতে ব্যাংকগুলোকে দিতে হবে সুন্দর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা। ওই পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলেই গ্যারান্টির বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সহায়তা পাবে এসব ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত রবিবার ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে বৈঠক করে ব্যাংকগুলো কত টাকা জোগান পেলে সংকট থেকে বের হতে পারবে, সেই তথ্য নিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। পরে প্রতিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডিদের সঙ্গে পৃথকভাবে সভা করেছেন গভর্নর। তখন কোন ব্যাংককে কী পরিমাণ অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে ধারণা দিয়েছেন গভর্নর। সব মিলে ৭০ হাজার কোটি টাকার চাহিদা দিয়েছে দুর্বল ব্যাংকগুলো। জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকে সহায়তার মাধ্যমে বাজারে টাকা ছাড়ছে। আবার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিল এবং বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে টাকা তুলে নেবে।
ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ব্যাংকগুলোর তারল্য সহায়তা নিয়ে গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে তারল্য সহায়তা ফের চালু করা হয়েছে।’
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে বিভিন্ন মহলের চাপে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তা বাস্তবায়ন করছেন গভর্নর। তবে পুরো টাকা না ছাপিয়ে বাজার থেকে টাকা তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া জোরেশোরে চালু করা হয়েছে। গতকাল বুধবার অন্তত ৪৫০ কোটি টাকা বাজার থেকে তোলা হয়েছে। এদিন বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের ৯০ ও ১৮০ দিনের বিড যুক্ত করা হয়েছে।