প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২২ ১৯:৩৬ পিএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২২ ১৯:৩৮ পিএম
ফাইল ফটো
কভিডের ধাক্কা শেষ না হতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পাল্টে দিয়েছে দেশের অর্থনীতির সব হিসেব-নিকেশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে অর্থাৎ অক্টোবর মাস পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এ মাস পর্যন্ত অর্থ ছাড় হয়েছে ১৯৭ কোটি ডলার। কিন্তু আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৬২ কোটি ৬১ লাখ ডলার। রবিবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।
চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে অর্থাৎ অক্টোবর পর্যন্ত বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবহার কমার পাশাপাশি প্রতিশ্রুতিও কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। এ সময় প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ ৪১ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। অথচ গত বছরের একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছিল ২৭৬ কোটি ১৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় প্রতিশ্রুতি কমেছে ৮৫ শতাংশ। গত বছর এ সময় পর্যন্ত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ৬৫ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিলেও এবার দিয়েছে মাত্র ৫ লাখ ডলারের প্রতিশ্রতি। বিশ্ব ব্যাংক গত বছরের একই সময়ে ঋণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ৫০ কোটি ডলারের, এবার দিয়েছে মাত্র ৩০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি।
ইআরডির হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর ঋণের সুদ পরিশোধের হারও কমেছে। এ বছর অক্টোবর পর্যন্ত সুদসহ ঋণ পরিশোধ হয়েছে ৭২ কোটি ৪২ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ৭৪ কোটি ৯১ লাখ ডলার। কিন্তু ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় টাকার অঙ্কে সুদসহ ঋণ পরিশোধ গত বছরের চেয়ে বেশি। টাকার অঙ্কে এ বছর ঋণ পরিশোধ হয়েছে ৬ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা, গত বছর একই সময় তা ছিল ৬ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।
অক্টোবর পর্যন্ত বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় হয়েছে জাপানের কাছ থেকে ৫৮ কোটি ডলার। এরপরই সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে চীন ৪৫ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এসেছে ৩৬ কোটি ৫২ লাখ ডলার, এডিবি দিয়েছে ২৪ কোটি ডলার। রাশিয়ার কাছ থেকে ছাড় হয়েছে ৮ কোটি ২৮ লাখ ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ছাড় হয়েছে ১২ কোটি ডলার।
এদিকে চলতি অর্থবছরে প্রকল্প সহায়তা ও বাজেট সহায়তায় প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। অর্থবছরের শুরুতে মোট বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ দশমিক ৩৮২ বিলিয়ন ডলার। পরবর্তীতে আইএমএফ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে রাজি হওয়ায় সেখান থেকে ৪৪৮ মিলিয়ন ডলার চলতি অর্থ বছরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে মোট ঋণ পাওয়া যাবে ১২ হাজার ৮৩০ মিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১০৬ টাকা ধরে)।
ইআরডির তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে ৩৩০ টি প্রকল্পের বিপরীতে বৈদেশিক ঋণ থেকে ৯৩ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। আর বাকি ৪৭ হাজার কোটি টাকা বাজেট সহায়তায় খরচ করা হবে। সবচেয়ে বেশি ২৩৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার বৈদেশিক ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক। যার মধ্যে ১৯ কোটি ২১ লাখ ডলার ছাড় হয়েছে। এরপরে ১৭১ কোটি ২০ লাখ ডলার দেবে এডিবি।
সংস্থাটি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৬ কোটি ৭৯ লাখ ডলার ছাড় করেছে। এরপরে ২৮২ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেবে জাইকা ও যুক্তরাষ্ট্রা। সেখান থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া গেছে ৪৫ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। ইউরোপ উইংয়ের দেশগুলো থেকে আসবে ২২৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার। সেখান থেকে ইতিমধ্যেই ১০ কোটি ৯৩ লাখ ডলার পাওয়া গেছে। ২৯৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার দেবে এশিয়া জয়েন্ট ইকোনমিক কমিশন (জেইসি) ও ফেলোশিপ অ্যান্ড ফাউন্ডেশন (এফঅ্যান্ডএফ) উইং সংশ্লিষ্ট দেশ। তারা ইতিমধ্যে ৩৮ কোটি ২৭ লাখ ডলার ছাড় করেছে। এছাড়া অন্যান্য দেশ ও সংস্থা থেকে আসবে ২৭ কোটি ডলার। এখান থেকে ছাড় হয়েছে তিন কোটি ডলার।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশকে ৪৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। যা আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে ছয় মাস অন্তর অন্তর সাত কিস্তিতে পাওয়া যাবে। আইএমএফের সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ঋণের মধ্যে ৪৪৮ মিলিয়ন ডলার পাওয়া যাবে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে।
এদিকে প্রথমবারের মতো গত ২০২১-২২ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। মেগাপ্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের যথাযথ ব্যবহার, উন্নয়ন ঋণদাতাদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা এবং কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের তহবিলের ফলে এটি সম্ভব হয়। এর আগে বৈদেশিক সহায়তা সর্বোচ্চ অর্থ ছাড় হয়েছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। এ হিসেবে গত অর্থবছরে অর্থছাড় বেড়েছে ২৬ শতাংশ। ছাড় হওয়া অর্থের মধ্যে প্রায় ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ছিল বাজেট সহায়তা এবং টিকা কেনার ঋণ। বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে। কোভিড অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ১ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পেয়েছিল দেশ।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে পাইপলাইনে বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ ৪৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এর আগে সেই অর্থবছরের শুরুতে পাইপলাইনে ছিল ৫০ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কামাল মুজেরি বলেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণে যেসব প্রকল্প এখন বাস্তবায়ন হচ্ছে এর মধ্যে অনেক প্রকল্পই বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া কোভিড পরবর্তী সময়ে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজের গতি বেড়েছে। এ কারণে বৈদেশিক ঋণে ছাড়ও বাড়ছে। এছাড়া সরকার বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে বিদেশ থেকে বাজেট সহায়তা নিচ্ছে। এ কারণে বৈদেশিক সহায়তা ছাড় বেড়েছে। নমনীয় সুদে বাজেট সহায়তা ঋণ নেওয়ার কারণে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার চাপ কিছুটা হলেও কম ছিল।
তিনি বলেন, বৈদেশিক ঋণের অনেক মেগা প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে। ফলে এখন থেকে সরকারকে সতর্ক হতে হবে। আগামীতে বৈদেশিক ঋণের চাপ কমাতে রপ্তানি এবং রেমিট্যান্সের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ইআরডির কর্মকর্তরারা জানান, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো সূচকই বাংলাদেশের অনুকূলে নেই। বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া, ডলার মূল্য বৃদ্ধি, জ্বালনি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি- এর সবকিছুই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়নে নেমে এসেছে। এক্ষেত্রে বৈদেশিক অর্থ ছাড় বিশেষ করে বাজেট সহায়তা রিজার্ভকে অনেক সহায়তা দিয়েছে।
এদিকে গত পাঁচ বছরেই সরকার ৩৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার বা ৪ লাখ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে। গড়ে নিয়েছে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। যেখানে স্বাধীনতার পর থেকেই সরকারের মোট ঋণ ১১১ বিলিয়ন ডলার বা ১১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গত ৫ বছরেই মোট বৈদেশিক ঋণের বড় একটি অংশ নিয়েছে সরকার। এছাড়া গত পাঁচ বছরে ৫২ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার বা ৫ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকার নতুন ঋণ চুক্তি করেছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে ১৬৯ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে অর্থ ছাড় হয়েছে ১১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। এখনো পাইপলাইনে পড়ে আছে ৪৮ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। অবশ্য এখন পর্যন্ত স্বল্প সুদের ঋণ বেশি পাচ্ছে বাংলাদেশ। মোট ঋণের ৭৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ হলো ফিক্সড রেটের বা স্বল্প সুদের ঋণ। এ ছাড়া ফ্লটিং রেট বা কিছুটা অনমনীয় ঋণ ২৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। এগুলোর গড় সুদের হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ। গড়ে ২৮ বছরে এসব ঋণ পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশের গ্রহণ করা ঋণের গড় রেয়াতকাল সাড়ে সাত বছর। গড়ে এসব ঋণ পরিশোধের সময়কাল ২৩ বছর ২ মাস।
মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ঋণ ৪০ শতাংশ আর বহুপক্ষীয় ঋণ ৬০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ঋণ পাওয়া গেছে বিশ্বব্যাংক থেকে, ৩২ শতাংশ। এডিবি থেকে ২৪ শতাংশ ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে জাপান। বাংলাদেশের মোট ঋণের ১৮ শতাংশ এসেছে এ দেশটি থেকে। মোট ঋণের ৮ শতাংশ চীন, ৫ শতাংশ রাশিয়ার ও ২ শতাংশ ভারতের। এ ছাড়া আইডিবি ও এআইআইবির ১ শতাংশ এবং অন্যান্য উৎস থেকে নেওয়া হয়েছে ৫ শতাংশ ঋণ।
ইআরডি আরও জানায়, মোট নেওয়া ঋণের মধ্যে এসডিআরে নেওয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি ৪১ শতাংশ ঋণ। এরপরেই রয়েছে ডলারে ৩২ শতাংশ, জাপানি ইয়েনে ১৮ শতাংশ, ইউরোয় ৩ শতাংশ এবং অন্যান্য মুদ্রায় ৬ শতাংশ। বকেয়া বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৬৬ কোটি ডলার।
বৈদেশিক ঋণের বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এখন যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ আছে তাতে দুুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে গত কয়েক বছরে আমাদের বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে। আমরা বেশি ঋণ নিচ্ছি এটি যাতে আমাদের ভালোভাবে কাজে লাগে। এগুলো থেকে আমাদের যে আয় হওয়ার কথা সে আয় যাতে ঠিকমতো হয় সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ নিতে তো আমাদের সমস্যা নেই তবে সেটার সঠিক ব্যবহার হতে হবে। যেহেতু আমাদের বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে সুতরাং ঋণের মাধ্যমে আমরা যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি এগুলো যাতে সময়মতো হয়, সুশাসনের সঙ্গে হয়, সাশ্রয়ীভাবে হয় সেটা নিশ্চিত করতে পারলে এই ঋণ সমস্যা না। বরং এই ঋণ দেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে।