প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৪ ২১:০৬ পিএম
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ঋণমান ও অর্থনীতির পূর্বাভাসে আরও নিম্ন রেটিং ঘোষণা করেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঋণমান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান মুডিস। সবশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান আরেক দফা কমিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সরকারের ইস্যুয়ার ও সিনিয়র আনসিকিউরড রেটিংস ‘বি১’ থেকে ‘বি২’ এ নামিয়ে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘ঋণাত্মক’ মানে নামিয়ে পূর্বাভাস দিয়েছে মুডিস।
সোমবার (১৮ নভেম্বর) সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত রেটিংস প্রতিবেদনে মুডিস আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশের স্বল্পমেয়াদি ইস্যুয়ার রেটিংস ‘নট প্রাইম’ বা শ্রেষ্ঠ গুণসম্পন্ন নয় হিসেবে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, বিশ্বের প্রধান তিনটি ঋণমান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের একটি মুডিস। গত ৩১ মে প্রতিষ্ঠানটি সবশেষবার বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়েছিল। সেবার তারা ঋণমান এক ধাপ কমিয়ে বিএ৩ থেকে বি১-এ নামিয়ে আনে। এর কারণ হিসেবে মুডিস জানিয়েছিল, বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে উঁচু মাত্রার দুর্বলতা ও তারল্যের ঝুঁকি রয়েছে।
মুডিস জানিয়েছে, তাদের ঋণমানের সিদ্ধান্ত মূলত বাংলাদেশে রাজনৈতিক ঝুঁকি বৃদ্ধি ও নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়টিকে প্রতিফলিত করছে। এ বিষয়গুলো এসেছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা থেকে। যার মাধ্যমে একটি সরকারের পরিবর্তন ঘটেছে। এসব বিষয় সরকারের নগদ অর্থপ্রবাহের ঝুঁকি, বহিঃস্থ দুর্বলতা ও ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশকে ঘাটতি পূরণে আরও বেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর নির্ভরশীল করে তুলবে বলে মনে করে মুডিস। এছাড়া সম্পদের গুণগত মানের ঝুঁকির কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থার পুঁজি ও তারল্যসংক্রান্ত দুর্বলতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের দায়সংক্রান্ত ঝুঁকিও বেড়েছে।
মুডিস বলছে, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি ও বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীরা আরও বেশি ঋণ দিলেও বহিঃস্থ দুর্বলতাসংক্রান্ত ঝুঁকি আগের মতই রয়েছে। এর কারণ গত কয়েক বছর ধরেই দেশের রিজার্ভ কমছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সামাজিক ঝুঁকি বৃদ্ধি, একটি পরিষ্কার পথনির্দশকের অনুপস্থিতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং জনগোষ্ঠীভিত্তিক উত্তেজনার পুনঃআবির্ভাবের কারণে রাজনৈতিক ঝুঁকি বেড়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক করার কারণ হিসেবে মুডিস জানিয়েছে, তাদের প্রত্যাশার চেয়েও এবার কম প্রবৃদ্ধি হবে। ফলে বাংলাদেশের দুর্বল রাজস্ব পরিস্থিতি ও বহিঃস্থ খাতের চাপ আরও বাড়াতে পারে। এই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও আইনশৃঙ্খলা ঘাটতির কারণে পণ্য সরবরাহের সমস্যার কারণে। এর ফলে রপ্তানি ও তৈরি পোশাক খাতের সম্ভাবনা মেঘাচ্ছন্ন হয়েছে।
মুডিস বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকার একটি বিস্তৃত সংস্থার কর্মসূচি পরিচালনা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তা বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা রয়েছে। যদি অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরা ও উচ্চ বেকারত্ব কমানোসহ দ্রুত ফলাফল না দিতে পারে, তাহলে সংস্কারের পেছনে যে রাজনৈতিক পুঁজি রয়েছে তা দ্রুতই চলে যেতে পারে।
মুডিস আরও জানিয়েছে, ঋণমান কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের স্থানীয় মুদ্রা (এলসি) ও বিদেশি মুদ্রার (এফসি) ঊর্ধ্বসীমা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এলসির জন্য ঊর্ধ্বসীমা বিএ২ থেকে বিএ৩ এবং এফসির ঊর্ধ্বসীমা বি১ থেকে বি২ তে নামানো হয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বিশ্বের প্রধান তিনটি ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি বা ঋণমান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন দেখে কোনো দেশে বিনিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাৎ তাদের রেটিং প্রতিবেদন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। মুডিসের মতো প্রভাবশালী বাকি দুটো প্রতিষ্ঠান হলো ফিচ রেটিংস এবং এসঅ্যান্ডপি।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকেরা মনে করেন, মুডিসের মতো প্রতিষ্ঠান ঋণমান কমালে তা ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ ও বিদেশি ঋণের সুদের হার বাড়তে দিতে পারে। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে, কারণ খরচ বেশি হলে বিদেশিরা এ দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন না। সাধারণত এ ধরনের ঋণমানের প্রভাব বাণিজ্যিক ঋণের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।
খেলাপি ঋণের হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ
এদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিস্থিতিও নাজুক। ব্যাংক খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ দেশের সাবির্ক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের যে হার দাঁড়িয়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের মোট ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশই এখন খেলাপি। ভারত, পাকিস্তান ও এমনকি শ্রীলঙ্কার খেলাপি ঋণের হার এত বেশি নয়।
দেশের ব্যাংকগুলোতে গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। তিন মাসেই ব্যাংক ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। অভিযোগ আছে, এসব ঋণের একটি অংশ বেনামে নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর খেলাপি ঋণের আসল চিত্র বেরিয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতে আরও অনেক ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণ সবচেয়ে কম ভারতের। জুলাই প্রান্তিক শেষে দেশটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে মোট ঋণের ২ দশমিক ৮ শতাংশ। দেশটির খেলাপি ঋণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০১০ সালে ভারতের খেলাপি ঋণ ছিল ১০ শতাংশ, এরপর তা কমতে কমতে এখন ৩ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতির মধ্যেও ভারতের অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী অবস্থানে আছে, তেমনি তাদের আর্থিক খাতও শক্তিশালী।
এরপর খেলাপি ঋণের অনুপাত সবচেয়ে কম নেপালের। জুলাই প্রান্তিক শেষে দেশটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট ঋণের ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এই হারই আবার এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত দুটি দেশ হলো পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পর শ্রীলঙ্কা এখন ঋণ পুনর্গঠন করছে। পাকিস্তানও একাধিকবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বেইলআউট নিয়েছে। কিন্তু এই দুটি দেশের খেলাপি ঋণের হারও বাংলাদেশের চেয়ে কম।
পাকিস্তান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুসারে, চলতি বছরের দ্বিতীয় অর্থাৎ এপ্রিল-জুন প্রান্তিক শেষে দেশটির খেলাপি ঋণের হার আগের প্রান্তিকের তুলনায় কমেছে। এ সময় দেশটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ৭ দশমিক ৬ শতাংশ; আগের প্রান্তিক অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিক শেষে যা ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানের খেলাপি ঋণ এযাবৎকালের সর্বোচ্চ ১৬ দশমিক ৭ শতাংশে ওঠে। এরপর ধারাবাহিকভাবে তাদের খেলাপি ঋণ কমেছে। একই সময়ে পাকিস্তানের অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অক্টোবরে দেশটির মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০২৩ সালের মে মাসে ছিল ৪০ শতাংশ।
বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক শেষে শ্রীলঙ্কার খেলাপি ঋণের হার ১২ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৩ সালের একই সময়ে দেশটির খেলাপি ঋণ ছিল ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে দেশটির খেলাপি ঋণ কমেছে। ২০২২ সাল শেষে দেশটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ১২ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এতে দেশের উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, এরা নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়। তবে পরিচালনাসংক্রান্ত দুর্বলতার কারণে তারা বেসরকারি খাতে দক্ষতার সঙ্গে ঋণ দিতে পারছে না।
মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগের হারের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ১ শতাংশীয় বিন্দু বাড়লে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশীয় বিন্দু বাড়ে। বিনিয়োগ বাড়লে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হয়। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে দেশে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের কাতারে উঠতে চায়, তাহলে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
২০১১ সালে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার ছিল মোট ঋণের ১ দশমিক ৯ শতাংশ। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশে। ২০১৮ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৯ শতাংশে।
দক্ষিণ এশিয়ার মালদ্বীপ, ভুটান ও আফগানিস্তানের খেলাপি ঋণের হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৩ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মালদ্বীপের খেলাপি ঋণ ছিল ৬ শতাংশের কিছু বেশি। ভুটানের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৮ শতাংশের কিছুটা কম। আফগানিস্তানের সর্বশেষ হিসাব পাওয়া যায় ২০১৮ সালের। তখন তাদের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ।