হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২৪ ১১:৫৮ এএম
আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৪ ১৩:৫২ পিএম
২০১৯ সালে ‘মেঘনা প্রাইড’ নামে জ্বালানি তেল পরিবহনকারী একটি অয়েল ট্যাংকার দিয়ে সামুদ্রিক জাহাজ পরিবহনের ব্যবসা শুরু করে মেঘনা গ্রুপ। এরপর গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের বহরে একের পর এক যুক্ত করেছে আরও ২৩টি জাহাজ। অন্যদিকে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ছিল সাতটি জাহাজ। কিন্তু সম্প্রতি সেগুলোর দুটি অয়েল ট্যাংকার জাহাজকে অনেক পুরোনো বলে পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হয়েছে কোম্পানিটিকে। পাঁচ বছরে মেঘনা গ্রুপের জাহাজ যেখানে ২৪টিতে উন্নীত হয়েছে, সেখানে বিএসসি নতুন কোনো জাহাজ যুক্ত করা দূরে থাক, উল্টো জাহাজ ব্যবসায় পিছিয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কর্মকর্তাদের সদিচ্ছার অভাব ও নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতার কারণেই পিছিয়ে পড়ছে সামুদ্রিক বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনাকারী দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিএসসি। জাহাজ ব্যবসা লাভজনক হলেও শুধু অদক্ষ কর্মকর্তাদের কারণে পিছিয়ে পড়ছে বিএসসি। যে কারণে একসময় ৩৮টি জাহাজ থাকলেও বিএসসির বহরে এখন রয়েছে মাত্র ৫টি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘করোনা মহামারির পর এখন সামুদ্রিক বাণিজ্য জাহাজের সুদিন যাচ্ছে। যাদের কাছে জাহাজ আছে, তারাই লাভ করছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই সুবর্ণ সময়েও বিএসসি পিছিয়ে পড়ছে। কারণ সেখানে দক্ষ জনবল নেই। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তেমন কোনো টেকনিক্যাল লোক নেই। দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সেখানে অনেক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়। ডিজি শিপিংয়ের সংশ্লিষ্টতা থাকে। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেটির প্রয়োজন হয় না। মালিক নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।’
তিনি বলেন, ‘বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিজ্ঞ নাবিকরা অফিস পরিচালনা করে থাকেন। ক্যাপ্টেন, চিফ ইঞ্জিনিয়ার, চিফ অফিসারÑ এরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু বিএসসির ক্ষেত্রে উল্টো। ইন্টারন্যাশনাল শিপিং পরিচালিত হয় রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনসের মাধ্যমে। এসব রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনসের মধ্যে বলা আছে, শিপিং প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পরিচালিত হবে। ওসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পদে কার কী যোগ্যতা থাকা উচিত, সেটিও বলা আছে। কিন্তু বিএসসি পরিচালনায় সেগুলো প্রতিপালন করা হয় না। এখানে প্রেষণে কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। এরপর উনি যখন প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ হয়ে ওঠেন, তখন বদলি হয়ে তাকে আরেক জায়গায় চলে যেতে দেখা যায়। এসব কারণে বিএসসি দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। ফলে বিএসসির বহর ৩৮টি থেকে ৫টিতে নেমে এসেছে।’
বহর ছোট হয়ে এলেও এখনও লাভজনক বিএসসি
অবশ্য বিএসসির জাহাজের বহর ছোট হয়ে এলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনও লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আয়-ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত সাত বছর ধরেই লাভে রয়েছে বিএসসি। ২০১৮ সালে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ এবং ‘বাংলার অর্জন’, ২০১৯ সালে ‘বাংলার অগ্রযাত্রা’, ‘বাংলার অগ্রদূত’ এবং ‘বাংলার অগ্রগতি’ বিএসসির বহরে যুক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির লাভের অঙ্ক বছর বছর বাড়ছে।
প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে লাভ হয় ১২ কোটি ৫২ লাখ টাকা, সেখানে পরের অর্থবছরে ২০১৮-১৯ প্রতিষ্ঠানটির নিট লাভ হয়েছে ৫৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা। করোনার কারণে পরের অর্থবছরে লাভ কিছুটা কমে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিএসসির ৪১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা নিট লাভ হয়। এরপর ২০২০-২১ অর্থবছরে নিট লাভ করে ৭২ কোটি ৩ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে নিট লাভ ২২৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে লাভ করেছে ২৪৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থ বছরেও বিএসসি লাভে রয়েছে। তবে বার্ষিক সাধারণ সভা না হওয়ায় প্রকৃত লাভের অঙ্ক জানা যায়নি।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও থেমে আছে জাহাজ কেনা
টানা লাভে থাকার পরও গত ৫ বছরে নিজেদের বহরে নতুন কোনো জাহাজ যুক্ত করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এই পাঁচ বছরে চীন থেকে চারটি জাহাজ কেনার জন্য প্রক্রিয়া শুরু করলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
এ সম্পর্কে জানতে বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (প্রযুক্তি) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফের সঙ্গে মোবাইলে কল করার পরও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরে প্রতিষ্ঠানটির সচিব আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহেদুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনিও মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নতুন জাহাজ কেনার বিষয়ে বিএসসি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশে বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে সরকার। এতে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বেড়েছে কয়লা আমদানি। জ্বালানি তেলের আমদানিও বেড়েছে। ২০২২ সালে দেশের আমদানি করা তেল পরিবহনে ১ লাখ ১৪ হাজার ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতার দুটি মাদার ট্যাংকার এবং কয়লাসহ কার্গোপণ্য পরিবহনে ৮০ হাজার ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতার দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার কেনার প্রকল্প নেয় বিএসসি। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, চীনা এক্সিম ব্যাংকের ঋণসহায়তায় ২ হাজার ৬২০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে এই চারটি জাহাজ সংগ্রহ করার কথা। কিন্তু ঋণচুক্তি না হওয়ায় একনেক সভা এবং সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও থমকে আছে প্রকল্পটি।
ঋণচুক্তি নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা
বিএসসি সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বিএসসি থেকে ঋণের আবেদন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে মন্ত্রণালয় থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর সেটি সরকারের অর্থনেতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো হয়। এরপর দুই দফায় ইআরডিতে রিমাইন্ডার পাঠানো হলেও কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে প্রথম দফায় গত ১৪ ফেব্রুয়ারি, দ্বিতীয় দফায় গত ২৮ এপ্রিল রিমাইন্ডার দিয়ে ইআরডিতে চিঠি পাঠায় মন্ত্রণালয়। এর আগে ইআরডি থেকে চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কিছু তথ্যের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। সেসব তথ্যের ব্যাখ্যাও দিয়েছে বিএসসি। কিন্তু এরপরও ঋণচুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
সম্প্রসারিত হয়েছে বেসরকারি জাহাজ ব্যবসা
এদিকে একই সময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে দেশের পতাকাবাহী সামুদ্রিক বাণিজ্যিক জাহাজের বহর বেড়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে গত ৫ বছরে দেশের পতাকাবাহী জাহাজের বহরে অন্তত ৫০টি জাহাজ যুক্ত হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে জাহাজ ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে দেশের অন্তত ১৩টি প্রতিষ্ঠান।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যায় শীর্ষস্থানে রয়েছে চট্টগ্রামের কেএসআরএম গ্রুপ। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির বহরে যেখানে ছিল ১২টি জাহাজ, সেখানে ২০২৪ সালে এসে গ্রুপটির বহরে জাহাজ রয়েছে ২৪টি। অন্যদিকে একই সময়ে একের পর এক বিনিয়োগ করে এ তালিকায় দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)। গ্রুপটির বহরে বর্তমানে বাণিজ্যিক জাহাজ রয়েছে ২৪টি। একই সময়ে নিজেদের বহরে ৮টি সামুদ্রিক বাণিজ্যিক জাহাজ যুক্ত করেছে আকিজ গ্রুপ। ২০১৯ সালে যেখানে প্রতিষ্ঠানটির বহরে মাত্র একটি জাহাজ ছিল, সেখানে এখন রয়েছে ৯টি। অন্যদিকে ২০২০ সালে সামুদ্রিক বাণিজ্যিক জাহাজের ব্যবসায় আসা কর্ণফুলী লিমিটেডের বহরে রয়েছে ৮টি জাহাজ।