প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৪ ১০:৪১ এএম
আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৪ ১১:১৫ এএম
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বারবার ওঠানামা করছে। কয়েকটি পণ্যের দাম কমছে তো বাড়ছে অন্য কয়েকটির। কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণে আসছে না নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দর। গত তিন দিনের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম বাজারভেদে কেজিতে ১৫-২০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ১৫০-১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলু ও খোলা আটায় কেজিতে বেড়েছে ৫ টাকা। তেমনি খোলা ও বোতলজাত তেলের দামও বেড়েছে। পেঁয়াজ আমদানিতে শুল্ক কমানোর পরও পণ্যটির দাম কেজিতে ৪০ টাকার মতো বেড়েছে।
সোমবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর মহাখালী ও বিশ্বরোডের মুক্তিযোদ্ধা কে বি কাঁচাবাজার ঘুরে এসব চিত্র দেখা যায়। তা ছাড়া ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন স্থানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে বলে প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদকদের পাঠানো খবরে জানা গেছে।
এদিন মহাখালী বাজারে সবজি কিনতে আসা স্বপ্না বিশ্বাস কলির সঙ্গে কথা হয় বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে। তিনি জানান, তার পরিবারে পাঁচজন সদস্য। বড় ছেলে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি ও মেজো ছেলে সিভিল এভিয়েশন স্কুলে পড়ে। স্বামী আসবাবপত্রের দোকানে কাজ করেন। তার যে আয়, তা দিয়ে এখন সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে টিউশনি করে নিজের খরচ বহন করার পরও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘৮০ টাকা দিয়ে লাউ কিনেছি, কিন্তু সেটি খেতে ১০০ টাকার চিংড়িমাছ কিনতে হচ্ছে। সবজির দাম সপ্তাহখানেক ধরে কিছুটা কমেছে। কিন্তু পেঁয়াজ ও আলুর দাম অনেক বেড়েছে।’
একই বাজার থেকে ৫ কেজি খোলা আটা কিনেছেন মুখলেছুর রহমান। তিনি বলেন, ‘খোলা আটা কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একসঙ্গে খোলা আটায় ৫ টাকা বাড়লে সেটা অনেক বেশিই বলতে হয়।’ বাজারটিতে কথা হয় দোকানদার রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা তিন দিন ধরে আটা কম পাচ্ছি। খোলা আটায় কেজিতে ৫ টাকা ও দুই কেজির প্যাকেট আটায় ৫-৭ টাকা বেড়েছে।’
সরেজমিনে দেখা যায়, বাজার দুটিতে করলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০ টাকা, উচ্ছে ১০০ টাকা, গোল বেগুন ১৪০, সাদা ১০০ এবং লম্বা বেগুন ১০০ টাকা। পটলের কেজি ৭০ টাকা, শিম ১৬০ টাকা, কাঁকরোল ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ও ধুন্দল ৭০ টাকা, ঝিঙা ৮০ ও মুলা ৮০ টাকা। কচুর লতি ও মুখি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। টমেটো বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ১৮০-২০০ টাকায়, কাঁচা মরিচ কিছুটা কমে ১৮০-২০০ টাকায়, বরবটি ১০০ টাকায়, প্রতিটি লাউ ৭০-৮০ টাকায়।
সবজি বিক্রেতা আবদুর রহিম বলেন, ‘পালংশাকের দাম অনেক বেড়ে গেছে। বর্তমানে প্রতি আটি পালংশাক বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকায়। লালশাকের আটি ২৫ টাকা। বাজারে পেঁপের আমদানিও কমে গেছে।’
মুদি দোকানদার ফয়সাল হোসেন বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম গত তিন দিন ধরে বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। তা ছাড়া দেশি রসুন ২৪০ ও আমদানি করা রসুন ২২০। সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে তেল ১৬৭ টাকা লিটার।’
কুড়িল বিশ্বরোডের কাঁচা বাজারের বিক্রেতা আব্দুল হালিম বলেন, ‘পেঁপে কেজিতে ২০ টাকার মতো বেড়েছে গত পাঁচ দিনে। বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫০ টাকায়।’ তিনি বলেন, ‘শীতের সময় গাছে পেঁপের ফলন কমে। কিন্তু এখনও শীত না এলেও সবজিটির দাম কেজিপ্রতি ১৫-২০ টাকা বেড়ে গেছে।’
এদিকে বাজারগুলোতে খোলা সয়াবিন তেল ৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা ও পাম তেল ২-৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৫৩ লিটার।
শুল্ক কমালেও তার সুফল নেই বাজারে
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে গত সেপ্টেম্বর ও চলতি অক্টোবর মাসে অন্তর্বর্তী সরকার চাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজ ও আলু আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিয়েছে। তবে শুল্ক ছাড় দিলেও বাজারে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। যেমনÑ ভোজ্য পরিশোধিত সয়াবিন তেল ও পরিশোধিত পাম তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে আরোপিত ১৫ শতাংশ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৫ শতাংশ মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, অপরিশোধিত পাম তেল ও পরিশোধিত পাম তেলসহ অন্যান্য পরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ের মূসক ১৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। তাতে ভোজ্য তেলের দাম কমার কথা। কিন্তু উল্টো সেখানে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ৪ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। প্রতি লিটার খোলা পাম তেল ৪ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা। পাম তেল সুপার প্রতি লিটার ১৪৭-১৫১ টাকা থেকে ২-৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৫৩ টাকায়।
পেঁয়াজ এবং আলুর দামও কমেনি
সেপ্টেম্বরে পেঁয়াজের কেজি ছিল ১২০ টাকা। পণ্যটির দাম সহনীয় করতে গত ৫ সেপ্টেম্বর এক প্রজ্ঞাপনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করে। এই আদেশ ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। কিন্তু শুল্ক কমানোর পরও কয়েক দফা দাম বেড়ে বর্তমানে ১৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ। গত ৫ সেপ্টেম্বর আলু আমদানিতেও ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে আলু আমদানিতে ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু শুল্ক কমানোর পরও ঢাকায় আলুর দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে।
পেঁয়াজ, আলু, আটা ও তেলের দাম কেন বাড়ছে, জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য (আইআইটি) অনুবিভাগের দুজন যুগ্ম সচিব কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নওগাঁয় দুই হাত বদলেই আলুর দাম বাড়ছে কেজিতে ২৫ টাকা
নওগাঁ প্রতিবেদক জানান, নওগাঁয় হিমাগারের গেট থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মাত্র দুই হাত বদলেই প্রতি কেজি আলুর দাম বাড়ছে ২৫ টাকা। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। কৃষকরা গত মৌসুমে জেলায় ২০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। এতে ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৫১০ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। চাহিদার তুলনায় দুই গুণ বেশি উৎপাদন হলেও আলুর মূল্য নিম্নমুখী না হয়ে ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
পাইকারি আলু ব্যবসায়ী আলম মোল্লা ও খয়বর আলী বলেন, এসব হিমাগার থেকে প্রতি কেজি আলু ৪৫ থেকে ৪৬ টাকায় কৃষক বা মজুদদারদের থেকে কিনে খুচরা দোকানিদের কাছে ৫৫ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। আবার সেই আলু খুচরা ব্যবসায়ীরা সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রকারভেদে কেজিতে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি করছেন। এতে দুই হাত বদলেই আলুর দাম বাড়ছে কেজিতে ২৫ টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, দুই এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন আলু বাজারে উঠতে শুরু করবে। তখন দাম কমবে।
খুলনায় সবজির দাম সহনীয় করতে ওএমএসের র্কাযক্রম চালু
খুলনা অফিস জানায়, খুলনায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উদ্যোগে নগরীর নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ডিম, আলু, পেঁয়াজ, পটল ও পেঁপেসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজিসহ কৃষিপণ্য ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। নগরীর পাঁচটি স্থানেÑ শিববাড়ি মোড়, বাংলাদেশ ব্যাংক মোড়, খুলনা মেডিকেল কলেজের সামনে রাস্তা সংলগ্ন স্থান, দৌলতপুর বাসস্ট্যান্ড ও খালিশপুর ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কের সামনে- কৃষিপণ্য ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) চালু করা হয়েছে।
কালীগঞ্জে ন্যায্যমূল্যে সবজি পেয়ে আনন্দিত ক্রেতাসাধারণ
কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিবেদক জানান, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ন্যায্যমূল্যের দোকানে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। এই দোকান থেকে পণ্য কিনে খুশি ক্রেতারাও। গতকাল শহরের পুরাতন গোহাটা মসজিদ সংলগ্ন দোকানে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। এ দোকানে আমদানিকৃত পেঁয়াজ ১২০ টাকা, দেশি রসুন ২২০ টাকা, পটল ৩৫ টাকা কেজি, প্রতি পিস লাউ ৪০ টাকা, কাঁচা ঝাল ১১৫ টাকা, কলা ৪০ টাকা, আমড়া ২৫ টাকা, ভেন্ডি (ঢেঁড়স) ৪৫ টাকা, বেগুন ৬৫ টাকা, পুঁইশাক প্রতি আটি ২০ টাকা, আলু ৬০ টাকা, মিট পুল্লা ৩৫ টাকা, পেয়ারা ৩৫ টাকা, করলা ৮০ টাকা ও প্রতি কেজি শিম ১২০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। খুচরা বাজারের চেয়ে অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে এখানে এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।