সাক্ষাৎকারে মুহাম্মদ ফোরকানুল্লাহ
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৪ ২১:৩৭ পিএম
মুহাম্মদ ফোরকানুল্লাহ
এস আলম গ্রুপ ও তাদের সহযোগীর সীমাহীন দুর্নীতির কারণে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল)। এ ব্যাংকে স্থিতিশীলতা আনা, সুশাসন এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সম্প্রতি সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই পর্ষদের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ ফোরকানুল্লাহ। নতুন পর্ষদ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যাংকটিকে পুরোদমে ঘুরে দাঁড়াতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশে এমনটিই জানালেন মুহাম্মদ ফোরকানুল্লাহ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জোনায়েদ মানসুর
প্রবা : এস আলম গ্রুপের নামে-বেনামে ঋণের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেবেন?
মুহাম্মদ ফোরকানুল্লাহ : আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যত শক্তিশালী ব্যক্তি হোক, ব্যাংকের টাকা ব্যাংককে, জনগণের টাকা জনগণকে ফেরত দিতে হবে। এই মোটিভ নিয়ে আমরা নেমেছি। এস আলম গ্রুপ নামে-বেনামে এসআইবিএল থেকে যে ঋণ নিয়েছে, তার মধ্যে চলমান কিছু প্রকল্প থেকে টাকা আদায় সম্ভব এবং সেগুলো আদায়ের ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত সচেষ্ট। এই গ্রুপের প্রায় ২৫০ কোটি টাকার এমটিডিআর (মেয়াদি আমানত) হিসাব আমরা এরই মধ্যে যাচাইয়ের মাধ্যমে স্থগিত করে রেখেছি। এলসি খোলাসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং কার্যক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের ওপর কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল, যা পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া হচ্ছে। এতে করে আমাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে চলেছে।
প্রবা : ব্যাংকটির নতুন পর্ষদে কারা রয়েছেন? কীভাবে সহযোগিতা করছে আপনাকে?
মুহাম্মদ ফোরকানুল্লাহ : আমানতকারীর টাকার সুরক্ষা, সাধারণ শেয়ার হোল্ডারদের বিনিয়োগ সুরক্ষাসহ সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে স্থিতিশীলতা আনা ও আইনের সুশাসন এবং ব্যাংকিং সেক্টরে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সম্প্রতি সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের আগের ১১ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২৫ আগস্ট ব্যাংকটির স্পন্সর-ডিরেক্টর রেজাউল হককে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের বোর্ড গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে এ ব্যাংকের ভালো ও নির্ভরযোগ্য বোর্ড অব ডিরেক্টরস প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্থানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য প্রশংসিত। বিজ্ঞ পর্ষদ তাদের সুচিন্তিত পলিসি ও দক্ষ পরিচালনার মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সর্বাত্মক সহায়তা দিচ্ছে। পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে শতভাগ স্বচ্ছতা রয়েছে। এ রকম বোর্ড আর্থিক খাতে সব জায়গায় দরকার। আমরা আশা করছি, সবাই মিলে শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমরা একটি অন্যতম সেরা ব্যাংক হবো। একটি ভালো ব্যাংক তৈরি করতে যা যা পরিকল্পনা দরকার সব ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রবা : ব্যাংকটিতে সুশাসন ফেরাতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
মুহাম্মদ ফোরকানুল্লাহ : ব্যাংকটিতে সুশাসন ফেরাতে সকল ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সকল গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ভালো ও মন্দ কাউকে বাদ দেওয়া হচ্ছে না। ভালো ও মন্দ সবাই আমাদের গ্রাহক। সবাইকে বলছি নিয়মিত বিনিয়োগ পরিশোধ করতে। যারা নিয়মিত দেয় না, তাদের অনেকেই আশ্বাস দিয়েছেÑ বিনিয়োগ পরিশোধ করবে। তবে যারা টাকা দেবে না তাদের ব্যাপারে আমরা কঠোর। তাদের ব্যাপারে সকল ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নিতেও আমরা পিছু হটব না।
প্রবা : সংকট কাটিয়ে উঠতে কী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন?
মুহাম্মদ ফোরকানুল্লাহ : নগদ জমা বাড়ানোর পাশাপাশি রিকভারি অর্থাৎ মেয়াদোত্তীর্ণ ও খেলাপি বিনিয়োগ থেকে আদায় বাড়ানোর প্রতি বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়া বিভিন্ন বিল সংগ্রহের হিসাব যেমনÑ ডেসকো, তিতাস, পল্লী বিদ্যুৎ, ওয়াসা, বিটিসিএল, বিআরটিএ, ডিপিডিসি, বাখরাবাদ, কর্ণফুলীসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের সেবা প্রদানের মাধ্যমে নগদ আয় বৃদ্ধি করা হচ্ছে। যা আমাদের তারল্য সংকট কাটাতে সহায়তা করবে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টির মাধ্যমে তারল্য সহায়তা পেয়ে গতি ফিরেছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে। গ্রাহকদের পুরো টাকা না দিতে পারলেও বেসরকারি খাতের এ ব্যাংকটি এখন স্বল্প অঙ্কের চাহিদা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে পারছে। এরই মধ্যে গ্রাহকদের বিভিন্ন হিসাবে (এ/সিএস) নগদ গ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ৭৯৪ কোটি টাকা মেয়াদোত্তীর্ণ এবং খেলাপি বিনিয়োগ আদায় করেছে এসআইবিএল। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছি, যার মাধ্যমে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পুরোদমে ঘুরে দাঁড়াবে ইনশাআল্লাহ।
প্রবা : ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মুহাম্মদ ফোরকানুল্লাহ : ব্যাংকটির আমানতের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়াতে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। বর্তমানে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ সাড়ে ৩২ হাজার ৭১৩ কোটি টাকার মতো। যা বিগত দুমাসে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে গত বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে। বর্তমানে ফরেন ট্রেডের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। আমদানি-রপ্তানি মিলে ১৬ হাজার কোটি টাকার মতো। এটা বাড়ানোর চেষ্টা থাকবে। সবচেয়ে বেশি জোর দেব মেয়াদোত্তীর্ণ ও খেলাপি বিনিয়োগ কমিয়ে আনতে। এ ছাড়া আগের মতো গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নানাবিধ কার্যক্রম অব্যাহত রাখব। তারল্য সংকট থাকলেও এই ব্যাংকে গ্রাহকদের আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত। রেমিট্যান্স গ্রাহকদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর আগে যেসব রেমিট্যান্স গ্রাহক তাদের কষ্টার্জিত অর্থ আমাদের মাধ্যমে পাঠাতেন তাদের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করছি, যাতে তারা আগের মতোই রেমিট্যান্স পাঠানো অব্যাহত রাখেন। আমাদের পরিকল্পনা হলোÑ ওভারডিও, ক্লাসিফায়েড ও অবলোপনকৃত বিনিয়োগ থেকে আদায়ের কার্যক্রমকে আরও জোরদার করা, চলমান মামলাগুলো গতিশীল করা, স্থগিত হয়ে থাকা মামলাগুলোকে পুনরায় সচল করা। এ ছাড়া ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং ক্ষেত্রভেদে তাদের নামে নতুন মামলা দেওয়া।
প্রবা : বর্তমানে ব্যাংকে কী ধরনের সেবা দিচ্ছেন?
মুহাম্মদ ফোরকানুল্লাহ : শরিয়াহ মোতাবেক সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছি। চালু রয়েছে ১৮০টি শাখা, ২৩৬টি উপশাখা, ৩৭৪টি এজেন্ট ব্যাংকিং ও ২২৪টি এটিএম বুথ। ২৪ ঘণ্টা এটিএম সার্ভিস ও রিয়েল টাইম অন-লাইন ব্যাংকিং চালু রয়েছে। বৈদেশিক রেমিটেন্স সেবার জন্য বিশ্বের বিখ্যাত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রেমিট্যান্স কোম্পানির সাথে আমাদের চুক্তি রয়েছে। তা ছাড়া আমাদের সকল শাখায় রয়েছে অন-লাইনভিত্তিক ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট করার সুবিধা। এসআইবিএলে অনেক ডিপোজিট প্রোডাক্ট ও ইনভেস্টমেন্ট প্রোডাক্ট রয়েছে। আমাদের কিছু একেবারেই ব্যতিক্রম এবং জনবান্ধব ডিপোজিট প্রডাক্ট রয়েছে। জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে ছাদ বাগানের জন্য বিনা জামানতে আমাদের তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ইনভেস্ট (ঋণ) প্রকল্প রয়েছে। এটার ভালো ফল পেয়েছি।