ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৪ ১০:৪৮ এএম
আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৪ ১২:২৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
চালের বাজারে কোনো টোটকাই ঠিকঠাক কাজে আসছে না। কোনো কারণ ছাড়াই যেন তরতরিয়ে বাড়ছে চালের দাম। সম্প্রতি চাল আমদানিতে ৫০ শতাংশ শুল্কের স্থানে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। অপরদিকে গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ চাল উৎপাদন হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এতসব সুখবরের মধ্যেও সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে প্রতি কেজিতে। মহল্লার দোকানগুলোতে ৪ টাকা পর্যন্ত বেশি রাখতে দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের চাহিদা পূরণের উপযোগী মোটা ও মাঝারি মানের চালের দাম। শুধু রাজধানী নয়, দেশের প্রায় সবখানেই চালের দাম বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালী বাজার ও বিভিন্ন এলাকার মুদি দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, মোটা, মাঝারি ও চিকনÑ সব ধরনের চালের দাম পাইকারি পর্যায়ে কেজিতে ২ থেকে ৩ ও খুচরা পর্যায়ে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাঝারি মানের চাল ব্রি-২৮ বিক্রি হয়েছে ৬২ থেকে ৬৩ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ৫৮ থেকে ৫৯ টাকা। ব্রি-২৯ চাল ৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬২ থেকে ৬৪ টাকা কেজিতে।
বাজার ও মহল্লার দোকানের চিত্র
তেজগাঁও অঞ্চলের মুদি দোকানগুলোতে মোটা গুটি চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৩ টাকা কেজিতে। এসব চাল এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ৪৮ থেকে ৪৯ টাকায়। সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চাল ৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তেজগাঁও বনফুল এলাকার দোকানি মো. আরাফাত রহমান বলেন, মোটা চাল কম পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে এই চালের। তা ছাড়া মিনিকেট ও নাজিরশাইলের দামও কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে খুচরায়।
চিকন চালের মধ্যে মিনিকেট ও নাজিরশাইলের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। তবে বাজারভেদে এই দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পার্থক্যও রয়েছে। কারওয়ান বাজারে মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৮ থেকে ৭৩ ও নাজিরশাইল ৭৫ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে। মেসার্স নিউ বরিশাল ট্রেডার্সের চাল ব্যবসায়ী ফজলুল হক বলেন, চালের দাম কেন বাড়ছে আমরা আড়তদারদের কাছ থেকে তার কোনো জবাব পাচ্ছি না। তাদের কেউ কেউ চলছেন, মোটা চাল নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। আবার মাঝারি ও চিকন চালের দাম বাড়ছে কেন, তার জবাব তারা দিতে চান না।
মহাখালীর বাজারে মিনিকেট ২ থেকে ৩ টাকা বেড়ে ৭২ টাকা, কাটারি নাজিরশাইল ৩ টাকা বেড়ে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা, ব্রি-২৮ কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬২ থেকে ৬৪ টাকা। আতপ চাল ৭৫ টাকা এবং পোলাওর চাল বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। চাল বিক্রেতা মানিক হোসেন বলেন, গত এক সপ্তাহে এই বাজারে বিভিন্ন প্রকারের চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
গতকাল কারওয়ান বাজারে কথা হয় ফল ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদের সঙ্গে। তিনি জানান, গত মঙ্গলবার ময়মনসিংহে নিজের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তিনি ২৫ কেজি ওজনের মিনিকেট চালের বস্তা কিনেছেন ১৬০০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও যার দাম ছিলো ১৪৫০ টাকা।
দায় নেই খাদ্য অধিদপ্তরের
চালের দাম বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুল খালেক গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, চালের দাম বাড়ল কি না এটা দেখার দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। আমরা মূলত ওপেন মার্কেট সেল বা ওএমএস কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকি। বাজারে চালের দাম আমরা মনিটরিং করি না। আমরা ওএমএসের মাধ্যমে চাল ও আটা বিক্রি করি, যা মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে কিনতে পারেন। এতে বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত চাল, আটা ও ধান মিলে মোট ১৫ লাখ ২৭ হাজার ১০৩ টন খাদ্য মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে চাল আছে ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৯৯৮ টন। গম ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৫৯০ ও ধান আছে ১১ হাজার ৫৬২ টন।
সর্বোচ্চ চাল উৎপাদনেও মিলছে না সুফল
চলতি মাসেই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চাল উৎপাদনের একটি হিসাব দিয়েছে। সেখানে দেখা যায়, এ বছর চালের উৎপাদন হয়েছে বিগত বছরগুলোর তুলনায় সর্বোচ্চ। চার কোটি ছয় লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে এবার, যা গত অর্থবছরের তুলনায় চার দশমিক এক শতাংশ বেশি। বোরোর ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকরা প্রায় দুই কোটি ১০ লাখ টন ধান বেশি পেয়েছেন।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, গত মৌসুমে সর্বাধিক চাল উৎপাদন হয়েছে এটি যেমন সত্যি, তেমনি এ বছরের বন্যাগুলোকেও সামনে দাঁড় করাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, এ বছর ৪টি বন্যা হয়ে গেছে। এতে ধান-চালের উৎপাদন কমছে। এই দুর্যোগকে কাজে লাগিয়ে তারা দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে সরকারের বাজার তদারকি বাড়ানো দরকার।
শুল্ক কমানোর সুফল নেই
চালের শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তও বাজারে কাজ করছে না। গত ২০ অক্টোবর চালের সরবরাহ বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তিন ধরনের শুল্ক কমিয়েছে। পূর্বের ৫০ শতাংশের জায়গায় শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ করেছে। তার মধ্যে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। ২৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্কের মধ্যে ২০ শতাংশ কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। তা ছাড়া ৫ শতাংশ হারে আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে ৫০ শতাংশের শুল্কের মধ্যে ৩০ শতাংশ কমিয়ে মাত্র ২০ শতাংশ শুল্ক রাখা হয়েছে।
এনবিআরের মতে, বাজারে চালের সরবরাহ বৃদ্ধি, ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ও চালের মূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুল্ক হ্রাস ও কর প্রত্যাহারের ফলে চালের আমদানি মূল্য কেজিতে ১৪ টাকা ৪০ পয়সা কমবে। কিন্তু বাস্তবে বাজারে শুল্ক কমানোর এই উদ্যোগের কোনো সুফল দেখা যাচ্ছে না।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা যা বলছেনÑ
বাদামতলী ও বাবুবাজারের মদিনা এজেন্সি চালের আড়তের মালিক আনিছ মিয়া বলেন, বড় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এর জন্য চালের দাম বেড়েছে। আমরাও তাদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনছি। বিক্রিও করছি কিছুটা দাম বাড়িয়ে।
বাংলাদেশ অটো রাইস মিলস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবিএম খোরশেদ আলম খান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চালের দাম এক টাকাও বাড়েনি। এর কারণ ছিল তখন অটো রাইস মিল ও সেমি অটো রাইস মিল বা হাস্কিং মিলগুলো চালু ছিল। ওই সময়ের পর চালের বাজারে করপোরেট কোম্পানিগুলো ঢুকতে শুরু করে। বর্তমানে চালের বাজারের বেশিরভাগটাই তাদের নিয়ন্ত্রণে। অনেক অটো মিল ও সেমি অটো মিল বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। আমাদের হিসেবে ১ হাজার ২০০ অটো মিল ও ১৫ হাজার সেমি অটো মিল ছিল। তার মধ্যে বেশিরভাগই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এসব কারণও তো আছেই, আবার চালের বাজারে তেমন কোনো প্রতিযোগিতাও রাখা হয়নি। ফলে কেউ কেউ একচেটিয়া ব্যবসা করে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাজার স্থিতিশীল করতে হলে প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে হবে। কয়েক মাসের ব্যবধানে মিনিকেট চালের দাম কেজিতে ১৫ টাকা বেড়েছে। এর মূলে রয়েছে করপোরেট সিন্ডিকেট। সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় পুরো বাজার তাদের নিয়ন্ত্রণে। দাম কমাতে হলে এই সিন্ডিকেটকে ধরতে হবে। বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
এ মৌসুমে চালের দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, এখন চালের দাম বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। নোয়াখালী অঞ্চলে বন্যার অজুহাত দাঁড় করানোরও সুযোগ নেই। কেননা ওই অঞ্চলে এ মৌসুমের ধানের ফসলে কোনো প্রভাব পড়েনি। এই সংকট ইচ্ছাকৃত। সরকারকেও চালের সংকট নিরসনে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখিনি। আগে থেকেই এখানে একটি সিন্ডিকেট ছিল। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে সরকারকে কঠোর হতে হবে।
শুল্ক কমানোর ফল বাজারে না মেলার বিষয়ে এই কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেন, শুধু শুল্ক কমালেই হবে না বরং চাল আমদানির পথ করে দিতে হবে। এখন পর্যন্ত চাল আমদানি করার কোনো খবর পাইনি। শুল্ক কমানোর ফল তখনই পাব যখন চাল আমদানি হবে।
৫ লাখ টন চাল আমদানির পরামর্শ
ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য ও ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের পরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম গতকাল বলেন, বর্তমানে সরকারিভাবে চালের মজুদ সাড়ে ১০ লাখ টনের নিচে রয়েছে। মজুদ এমন অবস্থায় চলে এলে বাজারদর এমনিতেই বেড়ে যায়। কোনোভাবেই সরকারি মজুদ সাড়ে ১২ লাখ টনের নিচে রাখা যাবে না। কেননা এরকম অবস্থায় ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরামর্শ হচ্ছে, সরকারি পর্যায়ে কমপক্ষে ৫ লাখ টন চাল আমদানি করা দরকার। চাল আমদানিতে শুল্ক কমানো হলেও কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমদানিতে এগিয়ে না আসার কারণ হচ্ছে, এখন বিশ্ববাজারে চালের দাম বেশি। এ অবস্থায় আমদানি শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে।