× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সামাজিক দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে ব্যাংক, ব্যয় কমেছে ৪৬ শতাংশ

রেদওয়ানুল হক

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৪ ১৪:১০ পিএম

সামাজিক দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে ব্যাংক, ব্যয় কমেছে ৪৬ শতাংশ

আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মুনাফার একটি অংশ সামাজিক খাতে ব্যয়ে উৎসাহিত করা হয়। তবে ব্যাংক খাতে এর সঠিক চর্চা নিশ্চিত করতে একটি নীতিমালা ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু অনেক ব্যাংকের মুনাফা বাড়ার ঘোষণা এলেও সামাজিক দায়বদ্ধতা খাত বা করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) ব্যয় কমিয়েছে ব্যাংকগুলো। এক বছরের ব্যবধানে অর্ধেকে নেমেছে এ খাতের ব্যয়। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়িত্ব এড়িয়ে চলার চিত্র ফুটে উঠেছে।

চলতি বছরের প্রথমার্ধে দেশের ব্যাংকগুলোর সিএসআর-সংক্রান্ত ব্যয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৬ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের ৬১টি ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৫৭১ কোটি টাকা।

সিএসআর হলো- এক ধরনের ব্যবসায়িক শিষ্টাচার বা রীতি, যা সমাজের প্রতি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনকে নিয়মের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত কার্যক্রমের ফলে উদ্ভূত বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব দূর করা ও সমাজের নানা শ্রেণির মধ্যে বিদ্যমান ক্ষোভ, অসমতা ও দারিদ্র্য কমানোর উদ্দেশ্যেই এর প্রবর্তন করা হয়। বর্তমানে সারা বিশ্বেই এ খাতে ব্যয়কে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো প্রজ্ঞাপন জারি করে সিএসআর খাতে ব্যয়ের জন্য ব্যাংকগুলোকে দিকনির্দেশনা দেয়। এরপর একাধিকবার প্রজ্ঞাপন জারি করে এ খাত-সংক্রান্ত বিধিমালা দেওয়া হয়।

ব্যাংকাররা বলছেন, চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে মুনাফার ধীর প্রবৃদ্ধিই সিএসআর ব্যয় কমার প্রধান কারণ। অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের ৩৫টি তালিকাভুক্ত ব্যাংকের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৪১ দশমিক ২৬ শতাংশ কমেছে। তবে কিছু ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধির চিত্রও রয়েছে।

ব্যাংকারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংকিং খাত বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। যার মধ্যে আছে- উচ্চ খেলাপি ঋণ, তারল্য ঘাটতি ও সুশাসনের অভাব। এসব কারণে সিএসআর কমেছে। আবার গত কয়েক বছর ব্যাংকগুলোর সিএসআর ফান্ড সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তহবিলে যেত। তাই ঠিকভাবে ব্যাংকগুলো সিএসআর কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকার ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, গত ১৬ বছরের মধ্যে বিতরণ করা ঋণ ও খেলাপি ঋণের সর্বোচ্চ অনুপাত এটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বেসরকারি প্রিমিয়ার ব্যাংক চলতি বছরের প্রথমার্ধে সর্বোচ্চ সিএসআর ব্যয় করেছে ৪৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি এ খাতে ব্যয় করেছিল মাত্র ১৯ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এক্সিম ব্যাংক ২৮ কোটি টাকা। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ সিএসআর-সংক্রান্ত ব্যয় করেছে মাত্র ২৬ কোটি টাকা। গত বছর ব্যয় একই সময় করেছিল ৪৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক ২১ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ১৯ কোটি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ১৮ কোটি, যমুনা ব্যাংক ১৭ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ১০ কোটি ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। তবে আর্থিক সংকটের কারণে ৬টি ব্যাংক এখনও এ ধরনের উদ্যোগের জন্য একটি পয়সাও ব্যয় করতে পারেনি।

ব্যাংকাররা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজনে বেশিরভাগ অর্থ ব্যয় করেছেন। নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে তাদের সিএসআর তহবিলের ৩০ শতাংশ শিক্ষা খাতে, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা ও ২০ শতাংশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন খাতে বিনিয়োগ করতে হবে এবং অন্যান্য খাতে বাকি ২০ শতাংশ খরচ করতে হবে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো স্বাস্থ্যসেবা খাতে ৭২ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা মোট সিএসআর ব্যয়ের ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। শিক্ষা খাতে ৬৪ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ২০ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন খাতে ৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা মোট ব্যয়ের ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। বাকি ১৬২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে অন্যান্য খাতে। অন্যান্য খাতের মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপখাতে ১৩৮ কোটি এবং ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে ৯ কোটি ৬ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের সিএসআর বিতরণে আলাদা প্রতিষ্ঠান দরকার। যাতে বিশেষ ব্যবস্থায় গরিবের হক তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। প্রতিবছর ব্যাংকগুলোর সিএসআর খাতে শত শত কোটি টাকা জমা হয়। এতদিন এসব অর্থ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, পরিবেশ ও জলবায়ু এবং অবকাঠামো খাতের নামে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর ফান্ডে দেওয়া হতো। যেসব অর্থের কিছু কিছু দুস্থদের হাতে গেলেও বেশিরভাগ হয়েছে লুটপাট। বিশেষ করে টুর্নামেন্ট, ম্যাগাজিন, বিজ্ঞাপন ও দলের ফান্ড ভাগাভাগিই ছিল সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতের ভাগ্য।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিএসআর অর্থ মূল হকদারদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। সেক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে সঠিক জবাবদিহিতার মাধ্যমে এ খাতের অর্থ বন্যার্ত ও দুস্থদের মাঝে বিতরণ করা যেতে পারে। তাহলে প্রতিবার বন্যা হলেই মানুষের কাছে হাত পাততে হবে না।’

এ ছাড়া যদি নতুন প্রতিষ্ঠান জবাবদিহিতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তাহলে মানুষ ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই গরিবদের মধ্যে তাদের দানের অর্থ পৌঁছে দিতে পারবে। শুধু তা-ই নয়, দেশে কত মানুষ দরিদ্র, তাদের উন্নয়ন ও দ্ররিদ্রতা থেকে বের করে আনার ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা-ও প্রতিবছর প্রকাশ করবে ওই প্রতিষ্ঠান।

তিনি আরও বলেন, ‘এখনও হয়তো অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে মানুষের মাঝে অর্থ বিতরণ করে। সেই অর্থের পরিমাণ ও হয়তো হাজার হাজার কোটি টাকার সমান। কিন্তু ওই অর্থ পরিকল্পিতভাবে বিতরণ না হওয়ায় দরিদ্রদের সংখ্যা কমছে না। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মানুষের মাঝে পরিকল্পিতভাবে এসব অর্থ বিতরণ করা হলে আগামী ১০ বছর পর দেশে সাহায্য নেওয়ার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না বলেই আমার বিশ্বাস।’

তিনি সরকারে প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে ভাগে ভাগে অর্থ ও ত্রাণ বিতরণের চেয়ে জবাবদিহিমূলক আলাদা প্রতিষ্ঠান গড়ে পরিকল্পিতভাবে মানুষের উন্নয়নে কাজ করা উচিত। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দক্ষ কর্মকর্তাদের একটি টিমকে তদারকির দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা