প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৪ ২১:৪২ পিএম
ব্যাংক একীভূতকরণ (মার্জ) প্রক্রিয়া বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নবগঠিত টাস্কফোর্সের পরামর্শে কোন ব্যাংক একীভূত করা প্রয়োজন তা সিদ্ধান্ত হবে। মালিকদের সমঝোতার ভিত্তিতে ঠিক হবে কে কার সঙ্গে একীভূত হচ্ছে। তবে ইতোমধ্যে সমঝোতা স্বাক্ষর করা ব্যাংকগুলোর কাজ আগের মতোই চলবে। এমন পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এক্সিম ব্যাংকের নতুন পর্ষদ। গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে নিজেদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম স্বপন। অপরদিকে পদ্মা ব্যাংকও চায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে। তাই আপাতত এ দুই ব্যাংক একীভূত হচ্ছে না।
নানা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা ও ঋণ জালিয়াতির কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে পদ্মা ব্যাংক। তাই ব্যাংকটিকে ইসলামি শরীয়াহ ধারার এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় এক্সিম ও পদ্মা ব্যাংকের মধ্যে চুক্তিও সম্পাদিত হয়েছিল। মূলত. এটা হয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে। সরকার পরিবর্তনের পর দুইটি ব্যাংকই এখন আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে চাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বেনামে ঋণ নিয়ে চরম তারল্য সংকটে পড়ে কমপক্ষে এক ডজন ব্যাংক। কোনোভাবেই ব্যাংকগুলোকে ভাল অবস্থায় আনতে না পেরে ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। এর অংশ হিসেবে ব্যাংকের স্বাস্থ্য যাচাইয়ে প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ) ফ্রেমওয়ার্ক ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর স্বাস্থ্য যাচাই করে অপেক্ষাকৃত ভাল ব্যাংকের সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যাচাই ছাড়াই একাধিক ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত হয়। ব্যাংকগুলোর পরস্পরের মধ্যে সমঝোতা স্বাক্ষর হয়। এ সিদ্ধান্তের আলোকেই অপেক্ষাকৃত ভাল মানের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে চরম ঝুঁকিতে থাকা পদ্মা ব্যাংকের একীভূত করার একটি চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সরকার পতন হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক আগের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে। সংবাদ ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ ঘোষণা করেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
জানা গেছে, পদ্মা ব্যাংককে সঙ্গে নিতে চাচ্ছে না এক্সিম ব্যাংক। ব্যাংরেক নতুন পর্ষদ এ বিষয়ে আগ্রহী নয় বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম স্বপন। গত সোমবার গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
নজরুল ইসলাম স্বপন বলেন, ‘এক্সিম ব্যাংকের পরিস্থিতি দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। মানুষ এক্সিম ব্যাংকে প্রচুর আমানত রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও আমরা তারল্য সহায়তা চেয়েছি। ইতোমধ্যে এক হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা পেয়েছি।’
অপরদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাপে ওই সময় চুক্তি স্বাক্ষর করলেও পদ্মা ব্যাংক এখন আর এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে যেতে চাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নিয়ে তারা এখন নিজেরাই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ব্যাংকটির পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আফজাল করিম। বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের এমডি পদও ফাঁকা।
এ বিষয়ে পদ্মা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) কাজী মো. তালহা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরাও এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একত্রিত হতে চাই না। একটু সহায়তা পেলে নিজেরাই ঘুরে দাঁড়াতে পারবো। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু তারল্য সহযোগিতা প্রয়োজন। তাহলে পদ্মা ব্যাংক আবার ঘুরে দাঁড়াবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যাংক অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মার্জ হওয়ার সিদ্ধান্ত আসার পর গ্রাহকরা আবারো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এখন আমরা চাই নিজেরাই নিজেদের মতো ঘুরে দাঁড়াতে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা বলেন, ‘ব্যাংক দুটি একীভূত হবে কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ব্যাংকিং টাস্কফোর্স। তারা ব্যাংকগুলোকে নিরীক্ষা করে দেখবেন এবং কোন সমস্যার কি সমাধান হবে তার সুপারিশ করবেন। এরপরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। তবে ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এক্সিম ব্যাংককে নতুন করে আবার কোন সহায়তা দেওয়া হবে কিনা সেটা নিয়ে ভেবে দেখবে বাংলাদেশ ব্যাংক।’
এদিকে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পরই আত্মগোপনে চলে যান এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। তিনি সবমহলেই বিগত আওয়ামী লীগের সরকারের ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর তার নানা অনিয়ম- দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতিতে নুয়ে পড়া ব্যাংকটিতে এখন তৈরি হয়েছে তারল্য সংকট। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে বসেন এক্সিম ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদদের সদস্যরা। তারা ব্যাংকের নানা সমস্যা তুলে ধরেন গভর্নরের কাছে। চান তারল্য সহায়তাও।
উল্লেখ্য, গত ২৯ আগস্ট এক্সিম ব্যাংকের নতুন পর্ষদ গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতোমধ্যে দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তারা সাবেক পর্ষদের আগ্রাসি ঋণ বিতরণের তথ্য ও ঋণ আদায়ের তথ্য উদঘাটন করতে পারেনি। জুলাই মাসের শেষ দিকে নামে বেনামে এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা তুলে নেন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতা করায় দায়ে যাত্রাবাড়ী থানায় এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়। সেই মামলায় তাকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।