প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৪ ১১:১৩ এএম
আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৪ ১১:১৮ এএম
পায়রা সমুদ্রবন্দর। ছবি : সংগৃহীত
ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ ও ডলারের দর বৃদ্ধিকে অযুহাত হিসেব দাঁড় করিয়ে পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যয় বারবার বাড়িয়ে নেয়া হচ্ছে। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কাজের মেয়াদও। সম্প্রতি প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এতে প্রকল্পটির ব্যয় এক হাজার ৫৫৫ কোটি ১১ লাখ টাকা বাড়ানোর আবদার জানানো হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির চুক্তিতে প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্টের সুযোগ দেয়া হয়েছে। যার ফলে ঠিকাদার নানা অযুহাতে ব্যয় বাড়িয়ে নিতে পারছেন। এক্ষেত্রে পায়রাবন্দর কর্তৃপক্ষ কিছুই করতে পারছে না। নাম প্রকাশ না করে কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, চুক্তি মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বিশ্লেষণ ও যাচাই করতে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) একটি টিম গঠন করে দিতে পারেন। কারণ দেড় হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি তো একবারেই সাধারণ কোনো বিষয় নয়। এক্ষেত্রে ব্যয়বৃদ্ধির বিষয়টি বিশ্লেষণ ও যাচাই করতে সব পক্ষের সিরিয়াসনেস দরকার।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৯৮২ কোটি ১০ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় ৫৩৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বৃদ্ধি করে প্রকল্পের ব্যয় ৪ হাজার ৫১৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা করা হয়। বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় এক হাজার ৫৫৫ কোটি ১১ লাখ টাকা বা মোট ব্যয়ের ৩৪ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে। এতে দ্বিতীয় সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ৬ হাজার ৭১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। এখন আবার নতুন করে দেড় বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। এটি বাস্তবায়ন করছে নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পটি হচ্ছে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায়।
যেসব খাতে বাড়ছে ব্যয়
সংশোধিত ডিপিপিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় জেটি নির্মাণের জন্য ঠিকাদার সিআরসিসি হারবার-সিসিইসিসি (জেভি) এর সঙ্গে ২০২০ সালের ২৭ জুলাই চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এতে চুক্তি মূল্য ছিল ৯১৬ কোটি ৯৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এ সময় করোনা মহামারি এবং লকডাউন ছিল। পরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ ১৮ মাসের বেশি হলে নিয়ম অনুযায়ী চুক্তিতে প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্টের সংস্থান রাখা হয়। ঠিকাদার প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্টের বিল বাবদ ১৫৫ কোটি ৪৩ লাখ ১২ হাজার এবং ডলারের মূল্য বাড়ায় ১৬১ কোটি ২১ লাখ ৭৫ হাজার টাকাসহ মোট দিয়েছে ৩১৬ কোটি ৬৪ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। এসব মিলিয়ে আগের এবং নতুন বিল মিলে ঠিকাদারের মোট চুক্তি মূল্য দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ২৩৩ কোটি ৫৯ লাখ ২৩ হাজার টাকা। ঠিকাদারের দেওয়া বিল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দিয়ে যাচাই করা হয়েছে।
এছাড়া ইয়ার্ড নির্মাণ অংশের ২০২০ সালের ২৯ জুন চুক্তি করা হয় সিএসআইসি ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির সঙ্গে। চুক্তি মূল্য ছিল ১ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এখানেও চুক্তির মেয়াদ ১৮ মাসের বেশি হলে প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্টের সুযোগ রাখা হয়। দ্রব্যমূল্য বাড়ায় ঠিকাদার প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট বাবদ বিল দিয়েছে ১৭১ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ডলারের দাম বাড়ায় ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করতে অতিরিক্ত ৩৭ কোটি ৪৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা প্রয়োজন। এই দুটি মিলে ২০৮ কোটি ৫৫ লাখ ৯১ হাজার টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব মিলিয়ে ঠিকাদারের মোট চুক্তি মূল্য দাঁড়াবে ১ হাজার ২৪২ কোটি ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।
আরও জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় আন্ধারমানিক নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণ কাজ ডিপোজিটরি ওয়ার্ক হিসাবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মাধ্যমে করার পরিকল্পনা ছিল। সড়ক ও জনপথ বিভাগ দুই বছরের বেশি সময়েও ঠিকাদার নিয়োগে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে দরপত্র আহ্বান করলে কাজটি পায় সিআরবিজি-সিসিইসিসি (জেভি)। মোট চুক্তি মূল্য ছিল ৯৪৩ কোটি ৬৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। চুক্তি মেয়াদ ১৮ মাসের বেশি হলে প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্টের বিধান রাখা হয়। ফলে এখন প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট বাবদ বাড়বে ৯৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং ডলারের মূল্য বৃদ্ধির জন্য ১১৯ কোটি ৮৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। দুটি মিলে মোট বাড়বে ২১৪ কোটি ২০ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ আগের চুক্তি মূল্য ও নতুন অতিরিক্ত অর্থ মিলে ঠিকাদারের মোট চুক্তি মূল্য হবে ১ হজার ১৫৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
ইকুইপমেন্ট কেনাকাটায় দরপত্রদাতাদের দর প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি হয়। সেই সঙ্গে মামলাজনিত কারণে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করা যায়নি। পরে করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য অনেক বেড়ে যায়। এছাড়া ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প প্রস্তাবে যে দাম ধরা হয়েছিল তা বেড়ে এই খাতে ব্যয় দাঁড়াবে ৫৪৪ কোটি ৩৯ লাখ ৩১ হাজার ১৪৭ টাকা। পাশাপাশি পরামর্শকের মেয়াদ বৃদ্ধির কারণে ব্যয় বাড়বে ৩০ কোটি ৭৯ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এছাড়া প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ার কারণে বেশ কিছু খাতে ব্যয় বেড়ে যাবে। সব মিলে ব্যয় বৃদ্ধির পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে।