ব্যাংক খাত
রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৪ ১১:১২ এএম
প্রতীকী ছবি
খেলাপি ঋণের চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের ব্যাংক খাত। বিনিয়োগ করে লাভ তো হচ্ছেই না উল্টো মূল টাকাই পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। ফলে দিন দিন ব্যাংকের স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে। বিপদে পড়ছে গ্রাহকের আমানত। মূলত শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে ঋণ দিয়ে বিপাকে আছে ব্যাংক। পুরো ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ ঋণখেলাপি হয়েছে তার ৬৬ শতাংশই এ দুই খাতে। যদিও খাত দুটি ব্যাংকের ব্যবসার প্রধানতম খাত। এসব খাতে অনিয়ম ও জালিয়াতির ঋণ ব্যাংককে কঠিন পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে ব্যাংক খাতের আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য সম্প্রতি আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-২০২৩ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকের বেশিই তথা ৫৪ দশমিক ৩২ শতাংশই রয়েছে পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া ও জাহাজ নির্মাণসহ উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে। আর ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে রয়েছে আরও ১২ শতাংশ। অর্থাৎ এ দুই খাতের খেলাপি ঋণ মোট খেলাপি ঋণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭২২ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে ৭২ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৫৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। আর ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬০ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে শিল্প খাতের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্প খাতে ঋণ বিতরণে যথাযথ নিয়ম মানা হয় না। ঘুরেফিরে ঋণ পায় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় ব্যাংকের টাকা ফেরত দেন না। আবার কেউ কেউ নামে-বেনামে ব্যাংক থেকে টাকা বের করে বিদেশে পাচার করছেন। সাধারণত এসব টাকা আর ফেরত আসে না। ফলে এ খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এ ছাড়া ব্যাংক খাতে বেনামি ঋণের বেশিরভাগই যায় শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে।
আর শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, করোনার সময় বিশ্বজুড়ে উৎপাদন ব্যাহত হয়। যোগাযোগ ভেঙে পড়ে। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের উৎপাদন খাতেও। এসব কারণে উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়ে সময়মতো ফেরত দিতে পারেননি। এতে তারা খেলাপি হয়ে পড়েন।
আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, উৎপাদনশীল শিল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে তৈরি পোশাক খাতে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। বিতরণকৃত এই ঋণের মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ২২ হাজার ৭০২ কোটি টাকা, যা ১৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আর ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে এ খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহম্মেদ জনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ব্যাংক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও কাঠামোগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারলে এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদেরও জবাদিহিতার আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি ঠিকমতো প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তাও নজরদারির আওতায় থাকা দরকার।’
প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে টেক্সটাইল খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার ২০১ কোটি টাকা। বিতরণকৃত এ ঋণের মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ১৫ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আর ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সেই হিসাবে টেক্সটাইল খাতে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬৬৭ কোটি টাকা।
তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে চামড়া খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ২ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা, বা ২১ দশমিক ২৭ শতাংশ। ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ১ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে চামড়া শিল্পে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।
অপরদিকে, জাহাজ নির্মাণ শিল্পে খেলাপি ঋণ কমেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৯২ কোটি টাকা। ফলে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৩ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। আর ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে এ খাতে খেলাপি ঋণ কমেছে ১ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে কৃষিভিত্তিক শিল্প খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৮ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ।
খেলাপি ঋণ বেড়েছে নির্মাণ খাতেও। গত বছর নির্মাণ খাতে ১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা বেড়েছে খেলাপি ঋণ। এ সময় খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ৬৮ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এক বছর আগে এ খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ।
ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে গত বছর খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এ সময় খাতটিতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। এক বছর আগে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার ৯০২ কোটি টাকা বা ১০ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এ হার নিয়ে খাতটি বর্তমানে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।
এ দুই খাতের বাইরে গৃহঋণ খাতেও খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে খাতটিতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। এক বছর আগে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ। গত বছর ব্যক্তি ঋণে খেলাপি বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩২ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এক বছর আগে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৬৮ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ।