সরেজমিন বগুড়ার মহাস্থান হাট
মোহন আকন্দ, বগুড়া
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৪ ১১:২৮ এএম
আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৪ ১১:৩০ এএম
ফাইল ফটো
সরকার বদলেছে। তাই মালামাল পরিবহনে এখন চাঁদাবাজি বন্ধ রয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো দুর্বৃত্ত চেষ্টা করছে আবারও তা শুরু করার। যদিও সম্মিলিত প্রতিরোধের কারণে তারা কুলিয়ে উঠতে পারছে না। বলছিলেন বগুড়ার মহাস্থান হাটের আড়তদার শফিকুল ইসলাম।
কিন্তু চাঁদাবাজি বন্ধ হওয়ার পরও কেন সবজির দাম বাড়ছে? এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শফিকুল জানালেন, ‘বর্ষার কারণে সবজির আমদানি কমেছে। কিছুদিন আগেও এখান থেকে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামে প্রতিদিন গড়ে সবজিবোঝাই ২০টি ট্রাক যেত। কিন্তু এখন যায় ১০ থেকে ১৫টি।’
বৃষ্টির দিকে আঙুল তুলে মহাস্থান হাটে বেগুন বিক্রি করতে আসা কৃষক লুৎফর রহমানও বললেন, ‘গত বছর এই সময় এত বৃষ্টি আছিল (ছিল) না। এইবার ঘন ঘন বৃষ্টি হচ্ছে। আর তার কারণে ফসল নষ্টও হচ্ছে। যে কারণে হামাকের (আমাদের) তেমন লাভ হচ্ছে না।’
তবে দাম কম হোক আর বেশি হোক, প্রতিদিন সকাল ৮টার মধ্যেই মানুষে ভরে ওঠে বগুড়ার মহাস্থান হাটের সবজিবাজার। পাইকারি ক্রেতা থেকে শুরু করে খুচরা ক্রেতা, সবাই ভিড় জমায় এখানে। হাটে যেতে যেতেই দেখা মিলল বুলু মিয়ার। সূর্যোদয়ের আগেই পুকুরে নেমেছিলেন তিনি। পুকুরের পানিতে ভালো করে ধুয়ে নিয়েছেন ক্ষেতের মাটি লেগে থাকা ছোট ছোট সব মুলা। কারণ ক্ষেত থেকে তোলা আগাম জাতের এই মুলা সকাল-সকাল হাটে তুলতে না পারলে ভালো দাম পাওয়া যাবে না।
সবজি কিনে আড়তে পাঠান ফড়িয়ারা
এ বাজারে ভিড় জমে মূলত আশপাশের গ্রামের কৃষকদের। বস্তা কিংবা বাঁশের ঝুড়িতে ভরে রিকশা-ভ্যানে তুলে নিজেদের উৎপাদিত লাউ, বেগুন, করলা, কাঁকরোল, মিষ্টিকুমড়া, কচুর লতি, বরবটি ও কাঁচা মরিচসহ নানা ধরনের সবজি এ বাজারে নিয়ে আসে তারা। ক্ষুদ্র কৃষকদের অনেকেই বিক্রির জন্য নিয়ে আসে পাঁচ কেজি (স্থানীয় ভাষায় এক ধরা) করে বিভিন্ন ধরনের সবজি। তাদের সেই পণ্য কিনে নিয়ে আড়তে বিক্রি করেন মধ্যস্বত্বভোগীরা (স্থানীয় ভাষায় ফড়িয়া)। কৃষকদের কাছ থেকে যতদূর সম্ভব কম দামে পণ্য কিনতে দামাদামি করতে থাকেন তারা। দাম মিটলেই কৃষকদের কাছ থেকে কেনা সবজি রিকশা-ভ্যানে তুলে হাটের পশ্চিমে আড়তে পাঠিয়ে দেন ফড়িয়ারা।
মরিচের দাম কমছে, বাড়ছে অন্যগুলোর
গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বগুড়া-রংপুর মহাসড়ক সংলগ্ন মহাস্থান হাটের পূর্ব দিক দিয়ে ঢুকতেই কাঁচা মরিচের দোকানগুলোতে দেখা গেল ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। নেটের বস্তায় রাখা মরিচ দেখিয়ে দোকানিরা চিৎকার করে পাইকারি ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন, ‘১৪০.. ১৪০..’।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বাজারে কৃষকদের উৎপাদিত মরিচের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আনা, এমনকি ভারত থেকে আমদানি করা মরিচও বিক্রি হচ্ছে। প্রকার ভেদে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ১৪০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা কেজি পাইকারি দরে কেনাবেচা হচ্ছে। একই হাটে ছোট ছোট ব্যাগে করে (৫-১০ কেজি ওজনের) কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত মরিচ এনে বিক্রি করছে ২০০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি খুচরা দরে। পাইকারি এবং খুচরা ক্রেতা-বিক্রেতারা সবাই বলছে, মরিচের দাম আগের তুলনায় কমতে শুরু করেছে। শুধু এক দিনের ব্যবধানেই কেজিতে দাম কমেছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা।
তবে অন্য সবজিগুলোর দাম বেড়েই চলেছে। প্রায় সব সবজিই এক দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়েছে। মহাস্থান হাটে আসা কৃষকরা গতকাল মঙ্গলবার পাইকারি বাজারে প্রতি মণ পটল দুই হাজার টাকা থেকে দুই হাজার দুইশ টাকায় (প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা) বিক্রি করেছে। অন্যান্য সবজির মধ্যে বেগুন দুই হাজার টাকা থেকে দুই হাজার ১০০ টাকা (প্রতি কেজি ৫০ টাকা থেকে ৫২ টাকা ৫০ পয়সা), করলা মান ভেদে প্রতি মণ দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা (প্রতি কেজি ৫৫ টাকা থেকে ৬২ টাকা ৫০ পয়সা), বরবটি প্রতি মণ দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার টাকা (প্রতি কেজি ৭০ টাকা থেকে ৭৫ টাকা), কচু এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা মণ (প্রতি কেজি ৩০ টাকা থেকে ৩৭ টাকা ৫০ পয়সা), পেঁপে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা মণ (প্রতি কেজি ১৫ টাকা থেকে ১৬ টাকা ২৫ পয়সা), কচুর লতি প্রতি মণ এক হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার টাকা (প্রতি কেজি ৪২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৫০ টাকা), প্রতি মণ কাঁকরোল মান ভেদে এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা (প্রতি কেজি ৪৫ টাকা থেকে ৫৫ টাকা), প্রতি মণ মুলা এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ (প্রতি কেজি ৩০ টাকা থেকে ৩৭ টাকা ৫০ পয়সা), আগাম জাতের ফুলকপি প্রতি মণ তিন হাজার থেকে তিন হাজার ২০০ টাকা (প্রতি কেজি ৭৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা), মিষ্টিকুমড়া প্রতি মণ এক হাজার ৬৮০ থেকে এক হাজার ৭৫০ টাকা (প্রতি কেজি ৪২ টাকা থেকে ৪৩ টাকা ৭৫ পয়সা) ও প্রতি মণ ঢেঁড়স দুই হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকা (প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা) দামে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি পিস জালি কুমড়া ৩৫ থেকে ৪০, লাউ ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আড়তে সবজির মূল্য
হাট থেকে বের হয়ে আড়তগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে কেনা সবজিগুলো প্রতি কেজিতে তিন থেকে সর্বোচ্চ ১৭ টাকা বেশি দামে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামে পাঠানো হচ্ছে। সবজির মূল্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবধান চোখে পড়েছে মুলা ও করলায়।
সফুরা ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম জানান, গত মঙ্গলবার তারা পটল দুই হাজার ৫০০ টাকা (প্রতি কেজি ৬২ টাকা ৫০ পয়সা), বেগুন দুই হাজার ২০০ টাকা (প্রতি কেজি ৫৫ টাকা), করলা প্রতি মণ তিন হাজার টাকা (প্রতি কেজি ৭৫ টাকা), বরবটি তিন হাজার ২০০ টাকা (প্রতি কেজি ৮০ টাকা), কচু প্রতি মণ দুই হাজার টাকা (প্রতি কেজি ৫০ টাকা), পেঁপে মণপ্রতি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা (প্রতি কেজি ২০ টাকা থেকে ২২ টাকা ৫০ পয়সা), কচুর লতি প্রতি মণ এক হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা (প্রতি কেজি ৪২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৫৫ টাকা), প্রতি মণ কাঁকরোল দুই হাজার ৫০০ টাকা (প্রতি কেজি ৬২ টাকা ৫০ পয়সা), প্রতি মণ মুলা দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা (প্রতি কেজি ৫৫ টাকা), ফুলকপি প্রতি মণ তিন হাজার থেকে ৬০০ টাকা (প্রতি কেজি ৯০ টাকা), মিষ্টিকুমড়া প্রতি মণ এক হাজার ৮০০ টাকা (প্রতি কেজি ৪৫ টাকা) ও প্রতি মণ ঢেঁড়স দুই হাজার ৮০০ টাকা (প্রতি কেজি ৭০) দরে কিনেছেন। এ ছাড়া প্রতি পিস জালি কুমড়া ও লাউ ৫০ টাকা করে কিনেছেন তারা। তার দাবি, কাঁচা মরিচের দাম কিছুটা কমলেও অন্য সব সবজির দাম বেড়েই চলেছে।
‘পণ্য পরিবহনে বাড়ে প্রতি কেজি সবজিতে দুই টাকা’
আড়তদার শফিকুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য স্থানে পণ্য বিক্রির সময় ট্রাক ভাড়ার ব্যয় হিসাব করলে প্রতি কেজিতে প্রায় দুই টাকা খরচ যুক্ত হয়। আর যেসব পণ্য পিস হিসেবে বিক্রি হয় তার প্রতিটিতে যুক্ত হয় এক টাকা করে। এর বাইরে যেসব ক্রেতা নিজেরা উপস্থিত থাকেন না, তাদের জন্য স্থানীয় আড়তদাররা প্রতিমণে ১০ শতাংশ হারে কমিশন নিয়ে থাকেন। যেসব ক্রেতা নিজেরা উপস্থিত থেকে পণ্য কিনে ট্রাকে তোলার জন্য আড়তদারদের জায়গা ব্যবহার করে থাকেন, তাদের কাছ থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য জায়গার ভাড়া হিসেবে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা নেওয়া হয়।
শফিকুল ইসলাম জানান, মহাস্থান থেকে ঢাকাতেই সবচেয়ে বেশি পণ্য যায়। এরপর চট্টগ্রাম এবং সিলেটেও যায়। তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বড় ট্রাকে মুলা ১৬ মেট্রিক টন এবং অন্যান্য সবজি ১২ মেট্রিক টন পরিবহন করা হয়। ঢাকায় প্রতি বড় ট্রাকের ভাড়া ১৫ হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকা। আর সিলেট এবং চট্টগ্রামে ট্রাকের ভাড়া পড়ে ২২ হাজার টাকা।